রাজনীতি থেকে দূরে বিএনপির সঙ্গে বেঈমানী করোনা হিরোর


শাহরিয়ার অর্ক | প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, মঙ্গলবার
রাজনীতি থেকে দূরে বিএনপির সঙ্গে বেঈমানী করোনা হিরোর

নারায়ণগঞ্জে বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে অপরিহার্য নেতাদের নেতাদের একজন মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। হরতাল, অবরোধ সহ সরকার বিরোধী প্রত্যেক আন্দোলনের কাকডাকা ভোর থেকেই রাজপথ কাঁপাতেন এ নেতা। আর এসব আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন বহুবার। প্রত্যেক বছরই একটি বড় সময় কেটেছে কারাগারে। খোদ বিরোধী পক্ষও অকপটে স্বীকার করেন, খোরশেদ আন্দোলন সংগ্রাম ছিলেন।

কিন্তু যে রাজনীতিতে খোরশেদের উত্থান সেই বিএনপির সঙ্গেই কিছুটা বৈরিতা দেখাচ্ছেন খোরশেদ। করোনার সময়ে নানাবিধ কর্মকান্ড করে দেশের গন্ডি ছেড়ে যখন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও আলোচিত খোরশেদ তখন রাজনীতির মোহে আর তিনি আচ্ছন্ন না। স্বপ্ন দেখছেন ব্যক্তি হিসেবেই মানুষের মধ্যে থাকা!

তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রীতিমত ভুল পথেই হাঁটছেন খোরশেদ। কারণ বিএনপি তাকে মূল্যায়ন করুক না করুক এ দলের কল্যাণেই আজ রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত খোরশেদ। রাজনীতি করতে গিয়েই বাধা বিপত্তি এড়িয়ে তিনি এখন মহানগর যুবদলের সভাপতি। যদিও কয়েক মাস ধরে এ সভাপতি পদে থেকেও নিস্ত্রিয়। আর এতে সুযোগ নিচ্ছে দলের ভেতরেই থাকা প্রতিপক্ষরা। কিন্তু আবার সেই ভাবনাকেও অনেকে আটকে দিচ্ছে সম্প্রতি তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণের পরে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ঘাঁটলে বেরিয়ে আসে আরো অনেক তথ্য। সেখানে অনেকের স্পষ্ট মন্তব্য, আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র পদের জন্যই ঘুরিয়ে তাঁকিয়ে আছেন খোরশেদ। যদিও তিনি বার বার ফেসবুক লাইভে এসে অস্বীকার করছেন। বলছেন, নির্বাচন নিয়ে কোন মাথাব্যথা না।

তবে বাস্তবিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। খোরশেদ একটি প্রভাবশালী মহলের ‘পুতুল’ হয়ে রাজনীতি থেকে দূরে থেকে নিজ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আগানোর চেষ্টা করছেন। মহলটির টার্গেট যে কোন মূল্যে আগামীতে বর্তমান মেয়রকে হটিয়ে যে কাউকেই ওই কাংখিত চেয়ারে পদায়িত করতে। সে হিসেবে এক সময়ের তুখোড় রাজনীতিক এখন ‘সামাজিক হিরো’ খোরশেদ হলে পরিকল্পনার ১৬ ধাপের ১০ ভাগই সম্পন্ন হয়ে যায়।

তাছাড়া করোনার সময়ে খোরশেদের মত কাজ যেহেতু কেউ করতে পারেনি সেহেতু সেই কাজের মূল্যায়নকে সামনে এনেই একজন মানবিক মানুষ হিসেবেই ভোট চাইতে হতে পারে তাকে। এ ক্ষেত্রে খোরশেদ নাগরিক প্রার্থী হতে পারেন মনে করছেন অনেকেই।

বিএনপির রাজনীতি থেকেও খোরশেদের প্রাপ্তি কম না। বিগত আন্দোলন সংগ্রামের সময়ে দলের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান বার বার তাঁকে ফোন করে উৎসাহ দিয়েছেন। সবশেষ সম্প্রতি যখন খোরশেদের স্ত্রী আফরোজা আক্তার লুনা করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন সুদূর লন্ডন থেকে খোঁজ নিয়েছেন তারেক রহমান।

কিন্তু বিষয়টি কখনোই মিডিয়ার সামনে আনেননি খোরশেদ। কারণ তিনি তো হাঁটছেন ব্যক্তি মানবিক খোরশেদ হিসেবে জনসমর্থন আদায়ে, জনগণের হৃদয়ে থাকতে। দল মতের ঊর্ধ্বে একজন খোরশেদ হিসেবে নারায়ণগঞ্জবাসীর হৃদয়ে যে স্থান করে নিয়েছেন সেটাইকে অক্ষুন্ন রাখতেই খোরশেদের এ প্রয়াস আর সে কারণেই এখন আর মুখে আনছেন না তারেক রহমানের নামও।

যদিও খোরশেদকে ইতোমধ্যে যুবদলের ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়েছে। কেন্দ্রের এত বড় একটি পদের পরেও ‘রা’ নেই খোরশেদের। সে কারণেই বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আপাতত বেঈমানী করছেন খোরশেদ যিনি এক সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে বিএনপির নাম উচ্চারিত রাখতেই পুলিশের বন্দুক আর লাঠির সামনে আন্দোলন করতে বিন্দুপরিমাণ দ্বিধাবোধ করতেন না।’

খোরশেদের ঘনিষ্ঠজনদের মতে, বিএনপি বা যুবদলের নাম থাকলে করোনার সময়ে হয়তো বেশীদূর আগাতে পারতেন না খোরশেদ। কিন্তু নাম ব্যবহার করলেও যে একটি মানবিক বিপর্যয়ের সময়ে খোরশেদ অনুজ্জল থাকতেন সেটাও প্রতীয়মান না। বরং দুটি পথেই নিজেকে শক্তিশালী করতে পারতেন এ করোনা হিরো কিংবা করোনা বীর খ্যাত খোরশেদ।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা ও তাদের সান্তনা দেয়ার জন্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আসে। ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে তারা ঘটনাস্থলে আসেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর ও বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান। বক্তৃতা দেয়ার শেষ পর্যায়ে উপস্থিত বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বিভিন্ন নেতাদের নাম বলে এক পর্যায়ে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকে এমনিতেই আপনারা সবাই চিনেন। তাকে সারাদেশের মানুষ চিনে। তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না।

নারায়ণগঞ্জে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির পরেই প্রথমবারের মত হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে গণমাধ্যমে আলোচনায় চলে আসেন খোরশেদ। ক্যামিস্ট বন্ধুদের সহযোগিতায় উপকরণ ক্রয় করে ৩০ হাজার হ্যান্ড স্যানিটাইজার যখন তৈরির উদ্যোগ নেন তখন নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এসে তাঁর কাছ থেকে কৌশল রপ্ত করতে ভীড় করেন। নিজ কার্যালয়ে বিতরণের পর ওয়ার্ডের সবগুলো এলাকাতে নিজ উদ্যোগে বাড়ি বাড়ি হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ শুরু হয়।

সেই সাথে খোরশেদ ঘোষণা দেন নারায়ণগঞ্জে করোনা উপসর্গ কিংবা এ রোগে কেউ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে দাফনের ব্যবস্থা করবেন। এরপর থেকেই তিনি একের পর এক লাশের কাফন দাফন সম্পন্ন করে চলছেন। নিজ ধর্মালম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মালম্বীদেরও লাশের সৎকার করে যাচ্ছেন মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। যা নিয়ে দেশের পাশাপাশি বর্হিবিশে^ও আলোচনায় চলে আসে। তাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। কেউ বলছেন, ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ কেউ বলছেন ‘হিরো অব করোনা’।

মাকসুদল আলম খন্দকার খোরশেদকে নিয়ে স্ট্যাটাস দেন ডাচ রাজনীতিবিদ জোরাম জারন ভ্যান ক্লাভেরেন। তিনি ফ্রিডম পার্টির সদস্য হিসাবে তিনি ২০১০ সালের ১ জুন থেকে ২০১৪ সালের ২১ মার্চ অবধি নেদারল্যান্ডের একজন সংসদ সদস্য ছিলেন।

এই করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জবাসীর হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে নিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। করোনাকালিন সময়ে মাকসুদল আলম খন্দকার খোরশেদের অনেক বেশি সক্রিয়তা লক্ষ্য গেছে। করোনা সংক্রমের শুরুতেই তিনি ঘোষণা দেন করোনা রোগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ কাফন দাফন করবেন। এরপর থেকেই তিনি একের পর এক লাশ কাফন দাফন করে যান যা এখনও বলবৎ রয়েছে। খোরশেদের এই তৎপরতা চোখে পড়ে নাগরিকবাসীদের। সকলেই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তাকে বিভিন্নভাবে উপাধিতে ভূষিত করেন।

আর এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোশেনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাতে শুরু করেন। কিন্তু খোরশেদ এখন পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ না করলেও তাকেই সিটি কর্পোরেশনের আগামী নির্বাচনের যোগ্য প্রার্থী বিবেচনা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা খোরশেদ ছাড়া অন্য কাউকে বিকল্প হিসেবে ভাবছেন না।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর