‘শামীম ওসমান লাঙল মার্কার লোক, ক্ষমতার রাজনীতি করে’


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৫:৪৬ পিএম, ০৬ মার্চ ২০২১, শনিবার
‘শামীম ওসমান লাঙল মার্কার লোক, ক্ষমতার রাজনীতি করে’

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক ও নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী বলেছেন, এ শামীম ওসমান নৌকার প্রার্থী নাজমা রহমানকে ফেইল করানোর জন্য নারায়ণগঞ্জক্লাবে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছিল। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল দখল করেছে। গলাচিপা ভোট কেন্দ্র দখল করেছে। নৌকা মার্কার প্রার্থীকে ফেইল করানোর জন্য। তার এতো বছর বয়সে সে নৌকা মার্কায় শুধু মাত্র জীবনে একবার ভোট দিয়েছে। তাও ২০১৬ সালে মেয়র নির্বাচনের সময়। তার জীবনে প্রথম নৌকায় ভোট দিয়ে আবেগ উচ্ছাস ধরে রাখতে পারেন নাই। বুথ থেকে বের হয়ে সে সাংবাদিকদের দেখিয়ে দিয়েছে সে নৌকায় ভোট দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত ছিল। এ অপরাধে মামলা হয় নাই। তিনি এজন্য দেখিয়েছেন যে জনগন বিশ্বাস করবে না যে নৌকায় ভোট দিয়েছে। যেহেতু লাঙ্গল মার্কার লোক। এটা হলো তাদের ক্ষমতার রাজনীতি।

৬ মার্চ শুক্রবার বিকেলে শহরের ডিআইটি এলাকায় সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের উদ্যোগে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ৮বছর উপলক্ষ্যে সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ত্বকী হত্যার এ তদন্ত যখন র‌্যাবের কাছে যায় র‌্যাব অত্যন্ত দক্ষতা, যোগ্যতার ও অভিজ্ঞতার সাথে এ তদন্ত কাজ তারা এক বছরের মাথায় শেষ করে। যেজন্য এখানে র‌্যাবের একটা কৃতিত্ব রয়েছে। যেহেতু র‌্যাব একটি সরকারি নিয়ন্ত্রিত সংস্থা সেহেতু সরকারের বাইরের যাওয়ার তাদের কোন এখতিয়ার নেই। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ আজ থেকে সাত বছর আগে তারা সংবাদ সম্মেলন করে যে অভিযোগপত্রটি তারা প্রেস করেছিলেন সেই অভিযোগপত্রটি তারা ফাইলবন্দি করে রেখেছেন। সেই অভিযোগপত্রে, এ ওসমান পরিবারের নির্দেশে, ওসমান পরিবারের লোকজন, তাদের টর্চার সেলেই ত্বকীকে হত্যা করেছে, কেন করেছে, এ সমস্ত কিছু সবাই জানে, দেশবাসীও জানে এবং আপনরাও জানেন। কিন্তু যখন নাকি এ ত্বকী হত্যা হলো সারা দেশের মানুষ জানলো নারায়ণগঞ্জের এ ওসমান পরিবার একটি ঘাতক পরিবার, খুনী পরিবার। তারা একটা শিশুকে হত্যা করেছে। তখন এ ওসমান পরিবার লজ্জিত হলো, ঘৃণীত হলো। তারা একে দমানোর জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করতে শুরু করলো।

শামীম ওসমানের নির্দেশে ত্বকীকে হত্যা : আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে তার টর্চার সেলে হত্যা করা হয়েছে। আজমেরী ওসমানের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই, বিরোধ নাই। র‌্যাব প্রতিবেদনে যে তিনটা কারণ উল্লেখ করেছে, সেই তিনটায় আমার সঙ্গে শামীম ওসমানের সঙ্গে সম্পর্ক। সেজন্য এ হত্যার নির্দেশ দাতা শামীম ওসমান। শামীম ওসমানের নির্দেশে তার ছেলে অয়ন ওসমান এবং তার ভাতিজা আজমেরী ওসমান এ হত্যাকান্ড সংঘঠিত করেছে তাদের অনুগত বাহিনী দিয়ে। এটা স্পষ্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, সাত খুনের যে মামলা, এ মামলায় নূর হোসেনকে প্রধান করে অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন আলামতে দেখি সাত খুনের ঘটনায় শামীম ওসমানের কতটা সম্পৃক্ততা। এ যে সাতখুন মামলার হাজার পৃষ্টার নথি, এ নথির মধ্যে র‌্যাবের পুর্নেন্দু বালা স্পষ্ট করেছে হাইকোর্টে, এ সাত খুনের সঙ্গে শামীম ওসমান জড়িত। নথিতে সাত খুনের মামলায় শামীম ওসমান জড়িত পুর্নেন্দু বালার কথা লেখা আছে। যেহেতু পুর্নেন্দু বালা নি¤œ আদালতে এটা বলে নাই সেহেতু এটা তারা গ্রহণ করে নাই। যে জন্যে নি¤œ আদালতের শুরুতে অভিযুক্ত যারা তাদেরকে সঠিকভাবে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

খুনের রাজনীতি ওসমান পরিবার করে : রাব্বি বলেন, এ খুনের রাজনীতিটা নারায়ণগঞ্জের একটি মাত্র পরিবার, ওসমান পরিবার করে। আজকে না, তারা শুরু থেকেই এ রাজনীতি করে। ১৯৭৩ সালে এ ওসমান পরিবারের লোকজনই, তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হেলালকে হত্যা করেছে। ১৯৮৮ সালে তারু সরদারের ছেলে কামালকে হত্যা করেছে। হেলালকে হত্যা করার পর নারায়ণগঞ্জে যখন বিক্ষোভ বেড়ে গেলো তখন এর থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য নিজেদের লোক কালামকে হত্যা করে তারু সরদারের পরিবারের বিভিন্ন জনের নামে মামলা দেয়। এবং তারা এটা রফা করার প্রস্তাব দেয়। এরা খুনের রাজনীতিটা আজকে না বহুদিন ধরে করে।

টর্চার সেলের সেই রক্ত মাখা প্যান্ট নিহত আশিকের : রাব্বি বলেন, এ আশিককে হত্যা করে তার লাশ শীতলক্ষ্যায় ফেলা হয়েছে। যখন এ আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে র‌্যাব অভিযান চালায়। সেই রক্তমাখা প্যান্ট পাওয়া গিয়েছিল। আমরা মনে করছি সেটা আশিকের প্যান্ট। আশিককে প্যান্ট ছাড়া অ্যান্ডাওয়ের পরা লাশ শীতলক্ষ্যা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। আশিককে এ আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে হত্যা করা হয়েছে। এরজন্য তারা ক্ষমতার রাজনীতি করে।

তারা ক্ষমতার রাজনীতি, দল বদলের রাজনীতি করে : রফিউর রাব্বি বলেন, তাদের এক অনুগত লোক ইতিহাস শিখাতে চান। তিনি ইতিহাস বলে দিবেন। সোমে সোমে আটদিন যার বয়স আর তিনি নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস বলবেন। আছা আমি বলি আপনি বলেন, ১৯৬৫ সালে আওয়ামীলীগের কোন নেতা পিডিবিতে যোগ দিয়েছিল। আওয়ামীলীগ ত্যাগ করে। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে যে লুট হয়েছে ব্যংক, বীমা, বাজার, হাট, সেই লুটের শতকরা ৩০ ভাগ টাকা কোন নেতা নিয়েছে নাম বলেন? বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জিয়াউর রহমানের সময় যখন আওয়ামীলীগ প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসে তখন আওয়ামীলীগ দ্বিধা বিভক্ত। মালেক আওয়ামীলীগ, মিজাম আওয়ামীলীগ। যা ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা এসে সমাপ্ত করেন। তারা ক্ষমতার রাজনীতি, দল বদলের রাজনীতি আজকে না, স্বাধীনতার আগে থেকেই করে। তাদের কোন নীতি আদর্শ নাই।

হেফাজত শামীম ওসমানের অনুগত, হত্যা মামলার আসামি : রফিউর রাব্বি বলেন, শামীম তার অনুগত হেফাজতকে লাগিয়ে দেয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। হিন্দু কতিপয় নেতাদের লেলিয়ে দেয় তাদের বিরুদ্ধে। আমাদেরকে পিপড়ার মতো মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য তারা বলেছিল। এ নাসিম ওসমান বলেছিল। আমাদেরকে টুকরো টুকরো করে কেটে শীতলক্ষ্যায় ফেলে মাছ দিয়ে খাইয়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা করিয়েছে এ হেফাজতকে দিয়ে। আমার বিরুদ্ধে মিছিল করিয়েছিল কল্লা চাই ফাঁসি চাই বলে। এটা হেফাজতে ইসলাম করে। আরে ইসলামতো নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। যারা নাকি ইসলামের কথা তুলে তারা কিভাবে একটা নারীর হাত ভেঙে দেওয়ার কথা বলে, নারীকে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়ার কথা বলে, কিভাবে এ নারীকে তারা তেতুলের সঙ্গে তুলনা করে। তারা কিসের ধর্মের মানুষ। তারা মিম্বরে বসে মিথ্যা কথা বলে অনাবরত। মিথ্যাচার করে। কেন করে সেটাও জানেন। শামীম ওসমান বাঁশিতে ফু দিলে তারা শুরু করে দেয়। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকায় শাপলা চত্ত্বরে যে ঘটনা ঘটেছে। এরপর দিন নারায়ণগঞ্জে যে ৭ থেকে ৮জনকে হত্যা করা হয়েছে, পুলিশ বিজিবি সহ। এ হত্যা মামলার আসামি হেফাজতের তারা। তারা রক্ষা পাওয়ার জন্য এ শামীম ওসমানের দারস্থ হয়। এরা হচ্ছে খুনের মামলার আসামি। মিম্বরে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলে, মিথ্যাচার করে। শামীম ওসমান যাই বলে তাই করে। এদের দ্বারা ইসলাম হেফাজত হবে।

তথাকথিত ধর্মীয় নেতাদের কথায় কান দিবেন না : নারায়ণগঞ্জে হিন্দু নেতারা যারা আছে তাদের শামীম ওসমান নির্দেশ দিলো তারা নেমে গেলো। তারা কি হিন্দুদের রক্ষার জন্য মাঠে নেমেছে? শ্যামল কান্তি ভক্তকে এ সেলিম ওসমান যখন কান ধরে উঠবস করিয়েছে তখন সারা বাংলাদেশে প্রতিবাদ হলো আমরা করলাম। এ নেতাদের মুখে টু শব্দও শুনলাম না। কেন যে, এ কান ধরিয়ে উঠবস করিয়েছে সেলিম ওসমান। এর বিরোধিতা করা যাবে না। সুতরাং আমাদের ভাইদের বলি এ তথা কথিত ধর্মীয় নেতাদের কথায় কান দিবেন না।

নারায়ণগঞ্জ তাদের জন্য নিরাপদ না : রাব্বি বলেন, এ শামীম ওসমান। আমরা যখন বাস ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিবাদে আন্দোলন করেছি সে এ বাস ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে ছিল। তখন র‌্যাবকে এ বন্ধন পরিবহনের মালিকেরা চিঠিতে উল্লেখ করেছিল তারা প্রতি মাসে শামীম ওসমানকে কত টাকা দেয়, নাসিম ওসমানকে কত টাকা দেয়। বলেছিলাম এ চাঁদা বন্ধ করলে আমাদের ভাড়া বাড়াতে হয় না। তারা বিভিন্ন পন্থায় নারায়ণগঞ্জ থেকে টাকা নেন। তারা নারায়ণগঞ্জে আসেন বক্তৃতা দিতে, চাঁদাবাজী করতে। রাতে ঢাকায় ঘুমান। নারায়ণগঞ্জ তাদের জন্য নিরপাদ না।

ওদেরকে, ওদের চৌদ্দ গোষ্ঠিকে নারায়ণগঞ্জের মাটিতে কবর দিবে : রাব্বি বলেন, সেই একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝে এ ভয় যদি নারায়ণগঞ্জে দাবি না রাখে তাহলে তার পিছনে যদি সরকার না থাকে, পুলিশ না থাকে, প্রশাসন না থাকে, এ নারায়ণগঞ্জের মানুষ বাশ দিয়ে পিটিয়ে ওদেরকে, ওদের চৌদ্দ গোষ্টিকে এ নারায়ণগঞ্জের মাটিতে কবর দিবে। এটা আমরা যেমন বুঝি এ ওসমান পরিবারও বুঝে। তাই তারা ততক্ষন সেখানে গলাবাজি করবে যতক্ষন তাদের পিছনে সরকার থেকে প্রশাসন থাকবে পুলিশ পাহাড়ায় থাকবে।

নারায়ণগঞ্জে খুনী ওসমান পরিবারের রাজত্ব হতে দিবো না : রাব্বি বলেন, ‘এ নারায়ণগঞ্জে খুনীদের রাজ্যত্ব কখনো চলবে না। আমরা যতদিন জীবিত থাকবো এ ওসমান পরিবার খুনীদের রাজ্যত্ব নারায়ণগঞ্জে হতে দিবো না। এ নারায়ণগঞ্জ মানুষের নারায়ণগঞ্জ হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নারায়ণগঞ্জ হবে। মানুষের নারায়ণগঞ্জ হবে।

পরে সন্ধ্যায় ডিআইটি থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের উদ্যোগে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে মিছিলটি চাষাঢ়া শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।

প্রসঙ্গত ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে ত্বকী শহরের শায়েস্তাখান সড়কের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরে ৮ মার্চ সকালে চাড়ারগোপে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ত্বকী হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে ৮জনই পলাতক। আর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্ধেহে ৫জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুইজন আসামি ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু এ হত্যাকান্ডের ৮ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পর্যন্ত এ মামলার অভিযোগ পত্র দেয়া হয়নি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর