আইভীর বিপরীতে কেউ নাই


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:২৬ পিএম, ০৪ মে ২০২১, মঙ্গলবার
আইভীর বিপরীতে কেউ নাই

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী অনেকটাই চিন্তামুক্ত হয়ে আছেন। প্রতিপক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বি কেউ কোন অভিযোগ তুলেই তাঁকে ঘায়েল করতে পারেনি। ফলে তিনি কদাচিৎ বিচলিত হলেও কাবু হয়নি। বলে মনোবলের দিক থেকেও তিনি বেশ দৃঢ়। রোজার মধ্যেও সিটি করপোরেশনের কর্মকান্ড চালাচ্ছেন। করোনার মহামারীতেও থেমে নেই। সাম্প্রতিক তাঁর বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম যে মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছিল সেটাও ফিকে হতে চলেছে। বরং উল্টো এখন হেফাজত প্রশ্নবিদ্ধ। তাঁরা একটি বিশেষ মিশন নিয়ে আইভীকে ঘায়েল করার প্রয়াসে ছিলেন। সেটা এখন বুমেরাং হতে চলেছে। স্থানীয় হেফাজত আর তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মুখোশ উন্মোচন হতে চলেছে।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বছরের শেষে অনুর্ষ্ঠিত হতে পারে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। করোনার কারণে ঢামাঢোল নাই। কিন্তু ভেতরগত প্রস্তুতিও আছে অনেকের। কিন্তু আইভীর সামনে কে দাঁড়াবে সেটা নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগে বিকল্প কেউ নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। গত নির্বাচনের আগে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন এমপি শামীম ওসমান। আইভী কিছুটা ভড়কে গিয়েছিলেন। কারণ রাজনীতি আনোয়ার হোসেনের অবদান ছিল। প্রধানমন্ত্রীর তালিকাতেও তিনি ছিলেন গুডবুকে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও পরবর্তীতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেন প্রধানমন্ত্রী। গত নির্বাচনে ছিলেন আনোয়ার হোসেন। এর আগের নির্বাচনে আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন শামীম ওসমান। দুইজনই ছিলেন প্রতিপক্ষ হিসেবে শক্তিশালী আমলে নেওয়ার মত। কিন্তু এবার সে রকম কেউ নিজেকে জাহির করতে পারেনি।

আওয়ামী লীগে যেমন বিকল্প কেউ নেই তেমনি বিএনপিতেও কেউ সুবিধে করতে পারেনি। গত নির্বাচন করা সাখাওয়াত হোসেন খানও এখন নিরব। ভোটের পর থেকে আর জনসেবাতে নেই। মেয়র হতে চাওয়া এ নেতাকে করোনার মহামারীতে কোন কাজেই দেখা যায়নি। তবে বিএনপির দুইজন কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু ও মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকে দেখা গেছে বেশ সক্রিয়। গুঞ্জন রয়েছে খোরশেদ ধানের শীষ চাইবেন। যদিও তিনি নিজে বিষয়টা স্পষ্ট করেনি। ফলে সামগ্রিক দিক থেকে মেয়র আইভী কার্যত নো টেনশন অবস্থায় আছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ঘায়েল করতে এমপি শামীম ওসমানের উদ্যমতা ২০১১ সালের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর থেকেই। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েও সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে লাখো ভোটে পরাজিত হন। পরের নির্বাচনের আগে আইভীকে মনোনয়ন না দিতে উঠেপড়ে লাগেন। দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয় সংসদে। দুদকের তদন্তে সেটার প্রমাণ মিলেনি। শহরজুড়ে আইভীর বিরুদ্ধে পোস্টারিং, জুতা মিছিল করে যখন ক্লান্ত শামীম ওসমান তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোটের আগে আইভীর হাতেই নৌকা তুলে দেন। পরে আইভীর বিরুদ্ধে আনা হয় জামায়াত সংশ্লিষ্টতা, দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি। প্রাথমিক তদন্তে সেটারও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সবশেষ অস্ত্র হিসেবে নারায়ণগঞ্জের বহুল বিতর্কিত হেফাজত নেতাদের মাঠে নামান শামীম ওসমান। সেটা তাঁর বক্তব্যেই প্রমাণ মিলে। এবার সেই অস্ত্রটিও কার্যত ভোতা হতে চলেছে। কারণ হেফাজত নেতারা নিজেরাই এখন বিতর্কে। ফলে আগামীতে তারা আইভী বিরোধী সমাবেশ করে হালে পানি পাবে না মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারায়ণগঞ্জে প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, নারায়ণগঞ্জ শহরকে একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি উন্নত শহরে রূপান্তর করেছেন এই নারী মেয়র। ব্যক্তিগত জীবনে কঠোর পরিশ্রমী মেয়র আইভী একটি অন্ধকার শহরকে একটি আলো জলমলে শহরে রূপান্তর করেছেন। তাই তার এই ১৯ বছরের ইতিহাস হবে এই জনপদের জন্য স্বর্ণযুগ। তাই আইভীর শাসনামল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে বলেই নারায়ণগঞ্জ শহরের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার সকল পুরানো রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ সুবিধা গড়ে তোলা ছাড়াও তিনি বহু নতুন রাস্তা করেছেন। তিনি এমন সব জায়গা দিয়ে রাস্তা করেছেন যা অতীতে কেউ কল্পনাও করেননি। তার প্রতিটি মহৎ পদক্ষেপে প্রবল বাধা এসেছে, কিন্তু তিনি ছিলেন অনড় ও অবিচল। তিনি এই শহরবাসীর জন্য এমন কিছু করে রেখে যাচ্ছেন যা কিনা এই শহরের নতুন প্রজন্ম বহুকাল পর্যন্ত সুফল ভোগ করবেন। সিটি করপোরেশনের নারায়ণগঞ্জ শহর ছাড়াও মেয়র আইভী বন্দর এবং সিদ্ধিরগঞ্জের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন। ওই দুই এলাকায়ও তিনি রাস্তাঘাটের পাশাপাশি বহু মেগা প্রজেক্ট গড়ে তুলছেন। তিনি কেবল মানুষের স্বাচ্ছন্দে চলাচলের জন্য কেবল রাস্তাঘাট ব্রিজ কালভার্টের উন্নয়নই করেননি বরং তিনি পরিবেশ বান্ধব শহর গড়ে তোলার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই সিটি করপোরেশেনের পরিত্যাক্ত খাল, লেক ও পুকুরগুলো তিনি পুনরুদ্ধার করে রীতিমতো জনগনের বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলছেন। রক্ষা করেছেন সিটি করপোরেশন এলাকার খেলার মাঠগুলি এবং এসব মাঠেরও ব্যাপক উন্নয়ন করে চলেছেন। জিমখানা লেককে শেখ রাসেল পার্কে রূপান্তর, বাবুরাইল খাল পুনরুদ্ধার ও ব্যাপক ‍উন্নয়ন, সিদ্ধিরগঞ্জ খালের ব্যাপক উন্নয়ন, বন্দরের ত্রিবেনী খাল সহ অন্য খালের পরিবেশ বান্ধব ব্যাপক উন্নয়ন, মন্ডলপাড়া লেক সহ বহু খাল ও পুকুরের ব্যাপক উনয়ন করেছেন এবং করে চলেছেন মেয়র আইভী।

সর্বশেষ শহরের উত্তরে গঞ্জেআলী খালের কাজও ইতোমধ্যে শুরু করেছেন তিনি। খালগুলোকে তিনি কেবল উন্নয়ন করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছেন না বরং এসবকে তিনি এই শহরের মানুষের বিনামূল্যে বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলেছেন। লেক ও খালপারে তিনি লাগাচ্ছেন বিপুল পরিমান গাছ। দেওভোগ ও জিমখানার শেখ রাসেল পার্ককে তিনি এমন একটি পার্ক হিসাবে গড়ে তুলেছেন যে এই লেকপারে গেলে প্রাণ জুরিয়ে যায়। ফলে এক কথায় বলা চলে একটি ইট পাথরের শহরেকে তিনি গাছপালায় ভরা প্রচুর অক্সিজেনের শহরে রুপান্তর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি কেবল স্বাচ্ছন্দে চলাচলের ব্যবস্থাই করছেন না বরং শহরবাসী যাতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে সেই ব্যবস্থাও করছেন। তিনি প্রাকৃতিক বিনোদন কেন্দ্রের বাইরেও আরো একাধিক বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন।

তাই এক কথায় বলা চলে মেয়র আইভী এক সময়কার গিঞ্জি শহর নারায়ণগঞ্জকে একটি বসবাসের উপযোগী স্বাস্থ্যকর শহরে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এতো কিছু করার পরেও এক শ্রেনীর মানুষ কেবল তার সমালোচনা করছেন। এটাই স্বাভাবিক। যতো মহৎ নেতাই হোন না কেনো তিনি কখনোই সব মানুষের মন জয় করতে পারবেন না। এছাড়া একজন মানুষ হিসাবে তার কিছু ভুল ত্রুটিও থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটাই হলো বাস্তবতা যে ইতিহাসে কখনো ভুল কিছু লিপিবদ্ধ হয় না। কেউ ইতিহাস বিকৃতি করতে চাইলেও তা কখনো ফলপ্রসূ হয় না। কারণ একদিকে যেমন ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না অপরদিকে তেমনি ইতহিাস করো অবদান তুলে ধরতেও কার্পন্য করে না।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর