আরেক ডেভিডের উত্থান!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ০৭:৪৯ পিএম, ২২ জুলাই ২০২১, বৃহস্পতিবার
আরেক ডেভিডের উত্থান!

নারায়ণগঞ্জে এক ডেভিডের উত্থান হয়েছিলো মিশনপাড়া থেকে। বিএনপির দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে দাপিয়ে বেড়াতেন পুরো নারায়ণগঞ্জে। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলা সহ মোট ৩৩টি মামলা ছিলো তার বিরুদ্ধে। দল ক্ষমতায় থাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলো সে। অবশেষে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে সমাপ্তি ঘটে মমিনউল্লাহ ডেভিডের। মৃত্যুর ১৭ বছর পরেও ডেভিডের নাম শুনলে আঁতকে উঠে এই জনপদের লোকজন। ঢাকা শহরে এককালে যেমন দাপিয়ে বেড়াতেন সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীর, তেমনি নারায়ণগঞ্জে ছিল মমিনউল্লাহ ডেভিডের প্রভাব।

তবে ডেভিড যেই রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন সেই দল ক্ষমতায় থাকতেই পতন ঘটে তার। সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করলে যেন দ্রুত আধিপত্য বিস্তার করা যায়। আর তারই অংশ হিসেবে এবার দেওভোগে আবির্ভাব ঘটেছে নতুন এক ডেভিড। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোন পদ পদবীতে না থাকলেও দলের নাম ভাঙ্গিয়ে ত্রাস শুরু করেছেন দেওভোগ এলাকায়। গড়ে তুলেছেন নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী। ইতোমধ্যে ২টি হত্যাকান্ডের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই ডেভিডই কি তবে আগামী দিনে দেওভোগ তথা নারায়ণগঞ্জ শহরে ত্রাস তৈরী করবে এমন প্রশ্ন করছেন অনেকেই।

নতুন এই ডেভিডের আসল নাম রিয়াজুল হক। পৈত্রিক সূত্রে ডেভিড নাম প্রদান করা হয়নি তাকে। গত কয়েক বছর ধরে এলাকায় নিজের আধিপত্য প্রকাশের জন্য নিজের নামের সাথে যুক্ত করেছেন ডেভিড উপাধি। তার বাবার নাম দেলোয়ার হোসেন। দেওভোগ এলাকার স্থানীয় নন এমন দাবী করেছেন স্থানীয় অনেকেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন এই ডেভিড এলাকায় মাদক ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে তৈরী করেছে বিশাল একটী বাহিনী। এর ভেতর রয়েছে কিশোরদের বড় একটি উপস্থিতি। তার নিজের বয়স ২৮ হলেও ১৪ থেকে ৩৪ বয়স পর্যন্ত বেশ কিছু সদস্য সংগ্রহ করেছেন তিনি। আর এদের দিয়েই বিভিন্ন সময় মারামারি, মাদক ব্যবসা, প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি করে থাকে দেওভোগ জুড়ে।

দেওভোগ এলাকার বেশ কয়েকজন জানায়, ডেভিড বাহিনী দিনে দিনে প্রভাবশালী হয়ে উঠছে পুরো দেওভোগ এলাকা জুড়ে। ইতিপূর্বে একটি হত্যাকান্ড ঘটানোর পর থেকে সবাই তাকে সমীহ করে চলে। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায় না। তার সাথের সহযোগীরা মাদক ব্যবসা সহ বিভিন্ন অপকর্মে জেলে ঢুকলে তাদের ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করে ডেভিড। পুলিশের যেই সোর্স ডেভিড বাহিনীর বিরুদ্ধে কাজ করে তাকে করা হয় ব্যাপক নির্যাতন। পুলিশের সোর্সকে মাসোয়ারা দেয়ার বদলে উল্টো সোর্স নিজেরাই ডেভিড ও তার বাহিনীকে সমীহ করে চলে।

ডেভিড ও তার বাহিনীর আলোচিত ঘটনাবলী : ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি রাত ৮টার দিকে দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকায় আলমগীর হোসেন (৩০) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে ডেভিড বাহিনী। নিহত আলমগীর পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। তার পাশাপাশি পোশাক তৈরীর ব্যবসাও ছিলো। নিহত আলমগীরের ভাতিজা শাকিল বলেন, কিছুদিন আগে এলাকার মাদক ব্যবসায়ী ডেভিড ও তার কয়েকজন সহযোগীকে পুলিশে ধরিয়ে দেন আলমগীর। এর প্রতিশোধ নিতেই তাকে হত্যা করা হয়।

একই বছরের ২৮ জুলাই চোখে মোটরসাইকেলের হেডলাইটের আলো পড়াকে কেন্দ্র করে শাকিল (৩৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে তুহিন ও তার সহযোগীরা। এই মামলায় অভিযুক্ত তুহিন উঠতি সন্ত্রাসী ডেভিডের অনুসারী হিসেবেই পরিচিত।

সবশেষ চলতি বছরের ১৮ জুলাই আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দেওভোগ মাদ্রাসা সংলগ্ন হাজী বাড়ি মাঠ এলাকায় হামলা চালায় ডেভিড বাহিনী। হামলায় ওমর ফারুক ও ইমন গ্রুপের ইমন নিহত হয়। এ ঘটনায় থানায় দায়ের করা হয় মামলা। মামলায় এখন পর্যন্ত ৩ আসামীকে গ্রেপ্তার করা হলেও ডেভিড পলাতক রয়ে গেছে।
শুধু তাই নয় ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মেয়র আইভীর বাড়ির পাশ থেকে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। সেসময় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের এক সদস্য আসিফ জানায়, স্থানীয় বড় ভাইদের শেল্টারেই এসব অস্ত্র মাঠে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো।

ডেভিড বাহিনী এখন দেওভোগের আতঙ্ক : ইমন হত্যাকান্ডের পর ডেভিড বাহিনীর আস্তানা হিসেবে পরিচিত দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। ঘটনাস্থল হাজী বাড়ি মাঠে প্রবেশ করেই দেখা যায় ঘনবসতিপুর্ন এলাকা ডেভিড বাহিনীর ভয়ে জনশূন্য হয়ে পড়েছে। হত্যাকান্ডের পর থেকে বাড়ির বাইরে বের হতে চাচ্ছেন না কেউই। যেই মাঠে সকাল বিকাল খেলা চলতো সেই মাঠ এখন জনশূন্য। ঘটনাস্থলের সাথে থাকা দোকানিদের কাছে জানতে চাওয়া হলে অন্তত ৬ জন দোকানির বক্তব্য ছিলো, ‘ভাই আমি দেখিনি। আমার দোকান বন্ধ ছিলো সন্ধ্যায়। আমার জানা নেই।’ আর ঘটনাস্থলের পাশে কয়েকটি বাসায় থাকা নারীদের সাথে একই বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তারাও কিছু বলতে রাজি হননি। কেবল বলেছেন, ‘ভাই আমরা জানিনা আমাদের জিজ্ঞাস কইরেন না।’

মাদ্রাসা এলাকার বেশ কিছু তরুণের কাছে ডেভিড বাহিনী ও হত্যাকান্ডের বিষয়ে জানতে বলেন, ‘ভাই এইখানে আগেও একবার একটা পোলারে মাইরা ফেলসে। এবার আরেকজন। আমাগো তো জানের ভয় আছে। বইলা কোন বিপদে পরমু? এখানে সবাই সবকিছু জানে। যারা মারামারি করছে তাগো পিছনে অনেক বড় শক্তি আছে। তাই আপনারে কেউই কিছু কইবো না। কারন আপনে যাওয়ার পর ওরা আমাগোরে আইসা ধরবো।

তারা আরও জানায়, সংঘর্ষের দিন ফাটানো হয় বেশ কয়েকটি ককটেল বোমা। কারও কারও মতে গুলিও ছোড়া হয়েছিলো কয়েকটি। হাতে চাপাতি, রড, রামদা ছিলো অনেকেরই হাতে। আর এই ধরণের মারামারি প্রায়ই হয়ে থাকে দেওভোগ মাদ্রাসা ও তার আশেপাশের এলাকায়। আর এসবের পেছনে মূল হোতা যে ডেভিড ও তার বাহিনী তা সহজেই স্পষ্ট।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর