কিং মেকার অস্তিত্বহীন : আগে তাঁকে পেত এখন তিনি পান


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১২:১০ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, শনিবার
কিং মেকার অস্তিত্বহীন : আগে তাঁকে পেত এখন তিনি পান

এক সময়ে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ছিলেন মোহাম্মদ আলী। অনেকেই তাকে ডাকেন কিং মেকার হিসেবে। পর্দার আড়ালের এ সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন অনেক কিছুর কেন্দ্রবিন্দু। নারায়ণগঞ্জে সর্বদলীয় রাজনৈতিক দলে তাঁর অবস্থান ছিল শক্ত। কিন্তু এখন হারিয়ে গেছে তাঁর সেই স্বকীয়তা। ক্রমশ আর আগের মত লোকারণ্য হয় তার দরবার। আগের মত ঢু মারেন না রাজনীতিকেরা যাঁরা নিয়মিত তাঁর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে চলতেন। সবশেষ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীও খোঁচা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলীকে। সামগ্রিক দিক দিয়ে মোহাম্মদ আলীর সেই কারিশমাটিক অবস্থা আর নাই সেটাও প্রতীয়মান।

২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে সিটি কর্পোরেশনের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষ্যে বই উপহার প্রদান অনুষ্ঠানে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহজাহান জুলহাসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি চুনকার সন্তান বাদই দিলাম। আমি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আপাতত মেয়র। আপনাদের ভোটে নির্বাচিত মেয়র। আমাকে একদিনের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদে ডাকা হয় নাই। আমার প্রবেশ নিষেধ। কেন আমার প্রবেশ নিষেধ? কেন? আমি ওখানে গেলে কারও বাপের সাধ্য আছে নাকি আমাকে না ঢুকতে দেয়া? এটা কি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি শেখ হাসিনা বানিয়ে দিছে নাকি? মুক্তিযোদ্ধার সমস্ত কিছু কি কারও উপড়ে দিয়ে দিছে নাকি? তারাই নারায়ণগঞ্জের হর্তকর্তা? তাদের কথা শুনতে হবে? আমার ভাই মোহাম্মদ আলী ভাইও আমাকে ডাকেন না। তিনিও ভয় পান। ভয়ের কারণেই তিনি আমাকে ডাকেন না।

জানা গেছে, মোহাম্মদ আলী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ছিলেন। সবশেষ জেলা প্রশাসক এ দায়িত্ব নেওয়ার আগে নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় খেয়াঘাট এলাকাতে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। এটা নির্মাণ করা হয় এমপি সেলিম ওসমানের উদ্যোগে। কিন্তু ওই কমপ্লেক্স তদারকি করেন মোহাম্মদ আলী। কারণ একাধিক সভাতে এর আগে সেলিম ওসমান বার বার বলেছেন, ‘আমি মোহাম্মদ আলীকে অনুরোধ করেছি তিনি যেন নিয়মিত কমপ্লেক্সে বসেন। এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কার কি প্রয়োজন কার কি সমস্য জানেন। আমরা ইনশাল্লাহ সকলে বসে এসব সমস্যার সমাধান করবো।’

এদিকে ২০১৬ সালের সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর ২০১৭ সালের জুলাইতে বাজেট অনুষ্ঠানে আচমকা নগর ভবনে হাজির হন মোহাম্মদ আলী। সঙ্গে ছিলেন এমপি সেলিম ওসমান। বদলে যায় দৃশ্যপট। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত হয় নিতাইগঞ্জ থেকে ট্রাক স্ট্যান্ড সরে যাবে। সরেও যায়। কিছুটা বিশৃঙ্খলা কমে আসে সেখানকার। কিন্তু এর পরে নানা কারণে আবার দেখা দেয় বিরোধ।

মোহাম্মদ আলী এক সময়ে বিএনপির সদস্য ছিলেন। তিনি দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি, ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদে নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধরগঞ্জ) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৬ জুন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনে ওসমান পরিবারের সদস্য সেলিম ওসমানের পক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন মোহাম্মদ আলী এবং বিএনপির ভোটারদের ও নেতাকর্মীদেরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামীলীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে বিএনপির এই সাবেক সাংসদ কাজ করে গেছেন। একই সাথে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন সেলিম ওসমান।

পরর্বীতের ২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মোহাম্মদ আলী ফের আলোচনায় আসেন। কারণ ক্লাবের বর্তমান সভাপতি ও ভোটে নির্বাচিত সভাপতি প্রার্থী তানভীর আহমেদ টিটু এমপি শামীম ওসমানের শ্যালক। তাঁর পক্ষে কাজ করেন সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান। তবে এ দুইভাইকে এবার অনেকটাই ব্যাকফুটে রেখে সামনে ও আড়ালে থেকে পুরো কারিশমা দেখান মোহাম্মদ আলী। সরাসরি মাঠে নামেন টিটুর পক্ষে। বিনিময়ে জিতেছেন তিনি নিজে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ওসমান পরিবারের দুই সদস্য যথাক্রমে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের পক্ষে মাঠে নামেন মোহাম্মদ আলী। অনেকটা আড়ালে থেকেই ওসমান পরিবারের এই দুই সংসদকে জয়ী করার পক্ষে কাজ করেন তিনি। কখনও কখনও প্রত্যক্ষভাবেও কাজ করেছেন। ফলশ্রুতিতে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে জয়ী হয় তাদের।

নারায়ণগঞ্জে বিগত দিনে অনেক রাজনীতিকের উত্থান এ মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই এর নির্বাচনেও কুশীলব হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনেও তিনি ছিলেন এমপি। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাত্র ১৭ দিনে আগে গিয়াসউদ্দিনকে বিএনপিতে জয়েন করিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করে আলোচনার চূড়ায় উঠেন মোহাম্মদ আলী। তাঁর সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় লোকজন ও নেতাকর্মীদের রয়েছে সু সম্পর্ক।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর