এক সময়ের আগুন সন্ত্রাসী এখন নৌকায়


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১২:০৮ এএম, ১১ অক্টোবর ২০২১, সোমবার
এক সময়ের আগুন সন্ত্রাসী এখন নৌকায়

কোনভাবেই আটকানো গেলো না নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন কুতুবপুরের বর্তমান চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুকে। রীতিমত সকলকে তাক লাগিয়ে তিনি বৈঠা হাতে নিয়েছেন। এবার তার প্রতীক নৌকা। আগামী ১১ নভেম্বর লড়বেন তিনি। মনোনয়ন পত্র বৈধ হলে আর কোন বেগ পেতে হবে না তাঁর। নিশ্চিত জয়। শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। ভোট নিছক চেয়ারম্যান পদে নিয়ম রক্ষার লড়াই। এ সেন্টুকে নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা গায়ে লাগায়নি। কারণ কোটি টাকার মিশন ছিল এটার পেছনে। রা ছিল না আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জের ধারক বাহক খ্যাত শামীম ওসমানেরও। তাঁর নীরব সমর্থন ছিল সেন্টুর প্রতি। পর্দার আড়ালেই তিনি খেলোয়াড়। আশাহত আওয়ামা লীগের নেতাকর্মীরা। কিছু বলতে পারছেন না। কারণ সেন্টুর পেছনে প্রভাবশালীরা। শুধু শামীম ওসমান কিংবা জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী না বরং আরো রয়েছেন অনেকেই।

৯ অক্টোবর রাতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড সেন্টুর নাম ঘোষণা করেন। এখানে আওয়ামী লীগের বিকল্প কারো নাম দেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদলের তালিকাতে একজনই ছিলেন সেন্টু। ছাত্র রাজনীতি করে তোলারাম কলেজের ভিপি থেকে জেলা যুবলীগ ও জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী বাদল তালিকায় সেন্টুর নাম দিতে কাপূর্ণবোধ না করলেও কুতুবপুর ও নারায়ণগঞ্জের নেতাদের হৃদয় কেঁদেছে। কিন্তু অসহায় তারা।

এ সেন্টুকে দলের মনোনয়ন দিতে মানা হয়নি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশও। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলতেন দলে অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকাতে হবে। দলে যোগ দেওয়ার ৩ বছরের আগে কাউকে সামনে আগানো যাবে না। সেন্টু আওয়ামী লীগে আনুষ্ঠানিক যোগ দেয়নি কিন্তু টাকার জোরে পেয়ে গেছেন নৌকা প্রতীক। অথচ এ সেন্টুর হাতে লেগে আছে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আর আগুন সন্ত্রাসের তকমা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিতেন নিয়মিত গালাগাল। করতেন সমালোচনা। বিএনপির তারেক রহমানের সঙ্গে ছিল বেশ সখ্যতা। কার্যত ফতুল্লা বিএনপির এক সময়ের সহ সভাপতি। যুবদলের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক।

তবে শুধু এবারই না। এর আগের তথা ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও এ সেন্টুকে জয়ী করাতে নৌকাকে ডুবিয়ে দেওয়া হয় পরিকল্পনা মাফিক। গত নির্বাচনে মনিরুল আলম সেন্টু ৪২ হাজার ৯০৩ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকের আওয়ামীলীগ প্রার্থী গোলাম রসুল শিকদার পেয়েছেন ১০ হাজার ৯৮৭ ভোট। ব্যবধান প্রায় ৩২ হাজারেরও বেশী। ভোটের দিন কুতুবপুরের অনেক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেলপাড়ার একটি কেন্দ্রে বুকে নৌকার প্রতীকের কাগজ সাটিয়ে সেন্টুর আনারসের প্রতীকের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে।

সেন্টু এক সময়ের বিএনপির ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। ফতুল্লা এলাকাতে বিএনপির ভাষায় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আর আওয়ামী লীগের ভাষা যেটা ‘নাশকতা’ তার নেতৃত্বে ছিলেন সেন্টু। ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে ফতুল্লায় ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার চেষ্টা সহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। নাশকতা ও বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় ডজনখানেক মামলাও আছে।

জানা যায়, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের পক্ষে নৌকায় ভোট চেয়ে প্রচারণার অভিযোগ এনে তৎকালীন ফতুল্লা থানা বিএনপির সহ সভাপতি মনিরুল আলম সেন্টুকে বহিস্কার করে বিএনপি। দলের সহ দপ্তর সম্পাদক বেলাল আহমেদ এ তথ্য তখন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে পথ আরো পরিষ্কার হয় সেন্টুর। আর তাই এবার নৌকার পক্ষের লোকজন তাকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে প্রচার করছেন।

সেন্টু বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ধীরে ধীরে আওয়ামীলীগে ঘেঁষতে থাকেন। এমপি শামীম ওসমানকে ‘পীর’ হিসেবেই আখ্যায়িত করে বক্তব্য রাখেন। শামীম ওসমান সংসদ সদস্য হবার পর থেকে সেন্টু তার অনুগত হয়ে যান। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও শামীম ওসমানের সকল নির্দেশনা পালন করতেন এই সেন্টু। সেন্টুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কুতুবপুর ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলো। এ ছাড়াও আওয়ামীলীগের একটি বড় অংশ রয়েছে সেন্টুর সাথে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর