বিএনপি থেকে এসে সর্বনাশা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:২৮ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০২১, মঙ্গলবার
বিএনপি থেকে এসে সর্বনাশা

কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনিরুল আলম সেন্টু নৌকা প্রতীক পাওয়ায় ৮/১০ জন তৃণমূল কর্মীর মত হতাশ হয়েছেন দলের পরিচ্ছন্ন নেতারাও। এনিয়ে কেউ মুখ খুলছেন আবার কেউ চুপ করে বসে থাকছেন। তবে এরই ভেতর আক্ষেপের সুরে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও পরিচ্ছন্ন আওয়ামী নেতা সানাউল্লাহ সানু।

সম্প্রতি দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এখানে (কুতুবপুরে) আদর্শচ্যুত যাকে বলে সেটাই হয়েছে। তারা মুখে আদর্শের কথা বলে কিন্তু কাজে নয়। কেন্দ্রে এমপি বুঝিয়েছে যে তার হাত শক্তিশালী হবে। তারাও হয়তো সমর্থন দিয়েছে। এতে করে একদিন মূল কান্ডই থাকবে না। বিএনপি থেকে আসারাই হয়ে যাবে মূল কান্ড। এর পরিণতি ভালো হবে না। সিদ্ধিরগঞ্জের নজরুল ছিল জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারী। আওয়ামী লীগে জয়েন করলো নূর হোসেন। এরপর কি হলো? নূর হোসেনের হাতে আমরা নজরুলকে হারালাম সাথে আরও ৬ জন। এই প্রভাবশালী পরিবার নূর হোসেনকে আওয়ামী লীগে জয়েন করানোর কারণেই আমরা ৭ জনকে হারিয়েছি। এখন কুতুবপুরে সেই ধারবাহিকতা শুরু হয়েছে। যারা এতদিন কুতুবপুরে আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতা ছিলো তাদের সরিয়ে নতুন নেতা তার অবস্থান নিবে।

তিনি দলের ভেতর দুর্নামের বিষয়ে বলেন। আমি যখন থানার সেক্রেটারি তখন সোহেল (মীর সোহেল) জয়েন করে আমাদের দলে। আজ সোহেল জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক। এগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য করছে। আজ সোহেল দাপটের সাথে চাঁদাবাজি করে চলে। সেন্টু এখন আসছে সেও একই কাজ শুরু করবে। যত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা আছে যেমন পলাশ, নাজিম উদ্দিন, গোলাম রসুল এগুলারে দাবায়া একদিন সে এক নাম্বারে আসবে। আর শামীম ওসমান যেদিন থাকবো না সেন্টুই এমপি পদে নমিনেশন চাইবো।

তিনি কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কেন্দ্র আমাদের কিছু জিজ্ঞাসও করেনা। আমরা কেন্দ্রে ক্যান্ডিডেট দিয়েছি। কিন্তু তারা হয়ে সেন্টুকে দিয়েছে। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর ৪ নেতাকে সরিয়ে মোস্তাকরা ঘনিষ্ট হয়েছিলো। সিরাজ উদ দৌলাও মীর জাফরকে বিশ্বাস করছে। আমরাও সেই ভুলই করে যাচ্ছি। মুখে বলে আদর্শের কথা আর বাইরে সব অনাদর্শিক কাজ। সারাদেশে অর্থ ছাড়া কোন কাজ হয়না। সচিবালয়, স্বাস্থ্য বিভাগ সবখানে টাকা। বালিশের দাম শুনলে অবাক হই। এখন তো লুটপাট চলছে ইচ্ছেমত। আমরা এখন কিছু বলতে পারিনা, কারন বললে দলের বিরুদ্ধে যায়। চুপ করে বসে থাকা ছাড়া কি করার আছে আমাদের? যারা নীতিনির্ধারক তারাই বলে ভাসমান না নিতে, আবার তারাই ভাসমানদের নিয়ে আসে। কোন তো সমাধান দেখছি না আমরা। জেনে শুনে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত কোনভাবেই আটকানো গেলো না নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন কুতুবপুরের বর্তমান চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুকে। রীতিমত সকলকে তাক লাগিয়ে তিনি বৈঠা হাতে নিয়েছেন। এবার তার প্রতীক নৌকা। আগামী ১১ নভেম্বর লড়বেন তিনি। মনোনয়ন পত্র বৈধ হলে আর কোন বেগ পেতে হবে না তাঁর। নিশ্চিত জয়। শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। ভোট নিছক চেয়ারম্যান পদে নিয়ম রক্ষার লড়াই। এ সেন্টুকে নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা গায়ে লাগায়নি। কারণ কোটি টাকার মিশন ছিল এটার পেছনে। রা ছিল না আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জের ধারক বাহক খ্যাত শামীম ওসমানেরও। তাঁর নীরব সমর্থন ছিল সেন্টুর প্রতি। পর্দার আড়ালেই তিনি খেলোয়াড়। আশাহত আওয়ামা লীগের নেতাকর্মীরা। কিছু বলতে পারছেন না। কারণ সেন্টুর পেছনে প্রভাবশালীরা। শুধু শামীম ওসমান কিংবা জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী না বরং আরো রয়েছেন অনেকেই।

৯ অক্টোবর রাতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড সেন্টুর নাম ঘোষণা করেন। এখানে আওয়ামী লীগের বিকল্প কারো নাম দেওয়া হয়নি। নারায়ণগঞ্জের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদলের তালিকাতে একজনই ছিলেন সেন্টু। ছাত্র রাজনীতি করে তোলারাম কলেজের ভিপি থেকে জেলা যুবলীগ ও জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী বাদল তালিকায় সেন্টুর নাম দিতে কাপূর্ণবোধ না করলেও কুতুবপুর ও নারায়ণগঞ্জের নেতাদের হৃদয় কেঁদেছে। কিন্তু অসহায় তারা।

সেন্টু এক সময়ের বিএনপির ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। ফতুল্লা এলাকাতে বিএনপির ভাষায় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আর আওয়ামী লীগের ভাষা যেটা ‘নাশকতা’ তার নেতৃত্বে ছিলেন সেন্টু। ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে ফতুল্লায় ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার চেষ্টা সহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। নাশকতা ও বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় ডজনখানেক মামলাও আছে।

অভিযোগে জানা যায়, মীর সোহেল দীর্ঘদিন ফতুল্লায় বিএনপির রাজনীতি সম্পৃক্ত হয়ে থানা ছাত্রদলের সভাপতি হয়। দীর্ঘদিন এ পদে আসিন থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। একপর্যায়ে মীর সোহেল আওয়ামীলীগ প্রথম ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামীলীগে যোগদান করে। ওই সময়ে ফতুল্লায় আওয়ামীলীগের তেমন একটি জনপ্রিয়তা ছিল না যেমনটা এখন রয়েছে। যার কারণে দলের শীর্ষ নেতাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তিনি ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি হয়। শামীম ওসমানের সাথে থেকে রাজনীতি করে সুবিধা গ্রহণ করে আবার পল্টি দেয়। ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে সারাহ বেগম কবরী আওয়ামীলীগের এমপি হওয়ার পর সুবিধা নিতে এবং সেক্টর দখল করতে তার বাবা মীর মোজাম্মেল আলী তাকে কবরী কাছে নিয়ে তার সাথে যোগদান করেন। অথচ শামীম ওসমান সমর্থিত ফতুল্লায় আওয়ামীলীগের কোন নেতাই কবরীর সাথে ছিল না। সে সময়ে যুবলীগ তাকে পদ থেকে সাময়িক বরখাস্তও করেছিল। কবরী আওয়ামীলীগের কোন নেতাকেই তেমন একটা মূল্যায়ন করতো না। তিনি শ্যামপুরের সেন্টু আর কিছু বাহিনী ছাড়া সব কিছুই তার কাছে তুচ্ছ ছিল। আর ওই সময় মীর সোহেলকে তার কর্মকান্ডের কারণে ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি হতে বহিস্কার করা হয়। পরে কবরীর সাথে থেকে তেমন একটা সুবিধা করতে না পেরে আবার ঘরে ছেলে ঘরে ফিরে যায়।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণের পর খুন হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ ৭জন।

নজরুল নিহত হওয়ার ৪৭ দিন আগেই আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেন তাকে মেরে ফেলবে আশংকা করে নজরুল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে যাদের কাছে আবেদন করেছিল তাদের হাতেই প্রাণ গিয়েছে তার!

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে করা আবেদনে উল্লেখ করেন, ‘১৯৯৮ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে তৎকালীন বিএনপির নেতা ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নূর হোসেনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর সে আমাকে হত্যা করতে নানাভাবে চেষ্টা চালায়। এর কিছুদিন পর নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হলে নূর হোসেনের লোকজন মিজমিজি এলাকার নিরীহ জহিরকে গুলি করে হত্যা করে। ২০০০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কার্যালয়ের সামনে আমাকে হত্যার জন্য ভাড়াটিয়া খুনী দিয়ে গুলি করলে আমার বাল্য বন্ধু যুবলীগের থানা কমিটির সদস্য আব্দুল মতিন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এ সময় এলাকায় নূর নানা অপকর্ম করে সন্ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ালী লীগ ক্ষমতায় এলে নূর হোসেন দেশে ফিরে এসে পুনরায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, নদী দখল, মাদক ব্যবসা পাশাপাশি শিমরাইল চৌরাস্তা ট্রাক স্ট্যান্ডে রাতের অন্ধকারে অশ্লীল নৃত্য ও জুয়ার আসর বসায়।’

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর