কদম রসুল দরগায় নবীজীর পায়ের ছাপ


স্টাফ করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১১:৩৩ পিএম, ১৯ অক্টোবর ২০২১, মঙ্গলবার
কদম রসুল দরগায় নবীজীর পায়ের ছাপ

বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য সহজ সরল পথ দেখাতে আল্লাহ তাদআলা হযরত মুহাম্মদ (স:) কে আরব ভূমিতে প্রেরণ করেন। হযরত মুহাম্মদ (স:) ৫৭০ খ্রীস্টাব্দের ২৯ আগস্ট হিজরী ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন।

হিজরী সালের ১২ রবিউল আউয়াল দিনটিকে নবীজির জন্ম ও ওফাত (মৃত্যু) উপলক্ষে পৃথিবীর মুসলিম সমাজ সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন হিসেবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পরিবেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকে।

১২ই রবিউল আউয়াল ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে আলোকসজ্জিত করা হয়েছে বন্দরের কদম রসূল দরগাহ, যেখানে নবী করীম (সাঃ) এর পদচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে। দিনটিকে ঘিরে ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, নফল নামাজ ও রোজা আদায় করবেন। দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ বয়ান হবে।

বুধবার (২০ অক্টোবর) দিনব্যাপী নানা আয়োজনে এ দরগাহে অনুষ্ঠিত হবে দিনটি। ইতোমধ্যে দরগাহ শরীফ রঙ করা, আলোকসজ্জা করা, দরগাহের চারিদিকে মেলা বসানো হয়েছে। এদিন দরগাহের মসজিদে বিশেষ বয়ান, দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হবে। রাতভর নফর ইবাদতে এখানে মশগুল হবে নবীপ্রেমীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, দরগাহের চারিদিকের সিড়ি, দরগাহ শরীফ রঙ করা হয়েছে নতুন করে। পুরো দরগাহকে বিশেষভাবে আলোকসজ্জিত করা হয়েছে। দরগাহের চারিদিকে মেলা বসিয়েছেন অস্থায়ি দোকানিরা। এসব মেলায় বিভিন্ন ধরনের খাবার, খেলনা ও ধর্মীয় বই বিক্রি করা হচ্ছে। মেলাকে ঘিরে চারিদিকে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা।

এদিকে বিশেষ দিনটিকে ঘিরে নবীর পদচিহ্ন দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে ভিড় করছেন ধর্মপ্রাণ মুসুল্লিরা। তারা এখানে দোয়া করেন এসে এবং দরগাহের বিভিন্ন মাজার পরিদর্শন করেন। অনেকে এখানে এসে নিজের জন্য কান্নায় দোয়া করেন।

প্রায় তিন দশক পূর্বে নারায়ণগঞ্জে এমনটি ছিল না। দিবসটি উপলক্ষে এখনকার মতো পাড়া-মহল্লার মসজিদ ও পারিবারিকভাবে ওয়াজ ও জিকির অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এক শ্রেণির লোকের জন্য ‘কদম রসুল দরগা’ দর্শন ছিল একটি বাড়তি আকর্ষণ। যা আজও অব্যাহত আছে। কদম রসুল দরগাদটি নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানার কদমরসুল ইউনিয়নে অবস্থিত।

এই কদম রসুল দরগা সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হলো-কদম শব্দের অর্থ পা এবং রসুল শব্দের অর্থ আল্লাহ প্রেরিত পুরুষ। অতএব কদম রসুল শব্দের অর্থ রসুলের (স:) পা বা রসুলের পায়ের চিহ্ন। এখানে দুই পায়ের ছাপ দেওয়া এক খন্ড কালো পাথর আছে।

বাংলাদেশের অত্যন্ত সুপরিচিত “কদম রসূল” বা ‘কদম রসূল দরগাহ শরীফ’। মির্জা নাথান এর বাহারিস্থান-ই-গাবী গ্রন্থে ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে জানা যায়, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পবিত্র পদচিহ্নটি (পদাঙ্গুলী চিহ্নিত পবিত্র কাল পাথর) বহু শত বৎসর পূর্বে হাজী নূর মোহাম্মদ নামক এক তাপস ও সাধক পুরুষ একজন আরব দেশীয় বণিক হতে সংগ্রহ করে এই কদম রসূল নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে ধর্মপ্রাণ ভক্তরা বিভিন্ন সময় ভক্তির নিদর্শন স্বরূপ এখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেন। ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১৭৭৮ খ্রীষ্টাব্দের দিকে পবিত্র কদম মোবারক (পবিত্র পদচিহ্ন) স্থাপনে এক কক্ষ বিশিষ্ট একটি দালান ঘর তৈরী করেন। যার সামনের দিকে একটি বারান্দা এবং একটি গম্বুজ আছে। কক্ষের মাঝে কদম মোবারক রক্ষিত যা সর্বদা একটি পাত্রে গোলাপ পানিতে নিমজ্জিত রাখা হতো। এই পবিত্র স্মৃতি পদচিহ্নযুক্ত (কদম মোবারক) দরগাহে সর্বদাই দেশ বিদেশের ধর্মপ্রাণ সকলশ্রেণির লোকজন দর্শন করেন এবং ধর্মীয় বিধি-বিধান মতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে।

এই “পদচিহ্ন” কদম রসূলের কারণে এই এলাকার নামকরণ “কদম রসূল” হয়। ঐতিহাসিক বর্ননায় জানা যায় ঈশাখাঁ তার সেনাপাতিগণের মাধ্যমে কদম মোবারকের সন্ধান লাভ করেন এবং এখানে এসে পদচিহ্ন দেখে আকৃষ্ট হন এবং ফয়েজ ও বরকত লাভের আশায় পদচিহ্নের উছিলায় মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি কদম মোবারকের ফয়েজ ও বরকত লাভে সন্তুষ্ট হয়ে পবিত্র কদম মোবারকটি (পদচিহ্ন) সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি কল্পে উপযুক্ত উঁচু স্থানে স্থাপন করার জন্য আফগান সেনাপতি (যিনি সম্রাট আকবরের প্রচারিত ধর্মীয় মতবাদ (দীন-ই এলাহি) এর বিরুদ্ধাচরণ করে যুদ্ধ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বঙ্গে এসে ঈশাখাঁর সাথে যোগ দেন) মাসুম খাঁন কাবুলিকে দায়িত্ব প্রদান করেন। মাসুম খাঁন কাবুলির নেতৃত্বে বর্তমান কদমরসুল দরগাহ শরীফের পূর্বদিক (বর্তমানে খাদেমপাড়া নামে পরিচিত) একটি পুকুর খনন পূর্বক সংগৃহীত মাটি দ্বারা প্রায় ৩০ (ত্রিশ) ফুট উঁচু বিরাট এলাকা নিয়ে একটি টিলা তৈরী করে টিলার ঠিক মাঝখানে একটি কক্ষে পবিত্র কদম মোবারক (পদচিহ্ন) সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তিতে ঢাকার জমিদার দরবারের ভক্ত গোলাম নবী ১৭৭৭-৭৮ সালে উক্ত উচু স্থানে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি কক্ষ নির্মাণ করে দেন।

মির্জা নাথান এর “বাহারিস্থান-ই-গায়বী” গ্রন্ধে বর্ণিত কদম রসূল দর্শন করে সম্রাট শাহজাহান দরগাহের খাদেমগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং কদম মোবারক (পদচিহ্ন) এবং দরগাহ রক্ষনাবেক্ষণের জন্য খাদেম সৈয়দ হাজী নূর মোহাম্মদকে তিনি ৮০ (আশি) বিঘা করমুক্ত জমি দানের ওয়াদা করেন। শাহজাহান পুত্র শাহসুজা বাংলার সুবেদার নিযুক্ত থাকা কালীন সেই ওয়াদা বাস্তবায়নে দুই সনদে যথাক্রমে ৬০ এবং ২০ বিঘা জমি (যাহা সম্পূর্ণ করমুক্ত) দান করে শাহি ফরমান জরী করেন যা হাজী নূর মোহাম্মদ ওয়াকদ এস্টেট (আল-হাওলাদ) হিসাবে গণ্য এবং বর্তমানেও পরিচিত। দরগাহ শরীফের খাদেমগণ ইহার সর্বপ্রকার রক্ষনা-বেক্ষণ করে থাকেন। তবে বিভিন্ন সময়ে দরবারের ওয়াকফ্ ৮০ বিঘা সম্পত্তির কিছু অংশ বিভিন্ন প্রভাবশালী বহিরাগত দ্বারা বেহাত হয়েছে। ঐতিহাসিক কদম রসুল দরগাহ শরীফে হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর পদচিহ্ন সম্বলিত পবিত্র কদম মোবারক শত শত বৎসর যাবত সংরক্ষিত আছে। যা কদম রসুল দরগাহ শরীফের মোতোয়াল্লি কমিটির সিদ্ধান্তে স্থায়ী ভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। শত শত বৎসর যাবত খাদেমগন এই পদচিহ্ন খচিত কদমমোবারক দরবারে আগত ভক্ত ও আশেকানদের জন্য হাতে নিয়ে প্রদর্শন করতেন। আগত ভক্ত দর্শনার্থীরা এটাকে হাতে ছুয়ে দেখতেন এবং শ্রদ্ধা জানাতেন।

দীর্ঘদিন যাবত খাদেম পরিবারের সদস্য ও মোতোয়াল্লিগন এই পবিত্র কদমমোবারক এর মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার্থে স্থায়ী ভাবে স্থাপন উপলদ্ধি করায় মোতোয়াল্লি কমিটির অনুমতি ক্রমে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসি মরুহুম খাদেম হাজী মহিউদ্দিন মিয়ার পারিবারিক প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে ও ভক্ত বৃন্দের সহায়তায় পবিত্র কদম মোবারক প্রতিস্থাপন কাজ সম্পন্ন করা হয়। ৫ অক্টোবর ২০১৪ বিভিন্ন ধর্মীয় রীতিনীতি ও আনুষ্ঠানিকতা শেষে কদম মোবারকটি স্থায়ী ভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। এখনথেকে দরবারে আগত ভক্তগন কদম মোবারকটি মনোরম ও সুদৃশ্য কাঠামোতে হাতে স্পর্শ ব্যতীত দেখতে পারবেন। কদম মোবারকটি স্থাপনের জন্য চার ফুট ব্যসার্ধের একটি চৌকিতে আধুনিক মার্বেলে বেষ্টন করে উপর অংশে স্টিল ফ্রেমের মধ্যে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন স্বচ্ছ কাচের বেষ্টনিতে রাখা হয়। কদম মোবারকে সার্বক্ষনিক বিশুন্ধ পানি প্রবাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর