সোনারগাঁয়ে ‘রাক্ষুসি রক্ত চোষা ধান্দাবাজ’


স্পেশাল করেসপনডেন্ট | প্রকাশিত: ১০:৪৭ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার
সোনারগাঁয়ে ‘রাক্ষুসি রক্ত চোষা ধান্দাবাজ’

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার নির্বাচনের ডামাঢোল বাজার সঙ্গেই সঙ্গেই শুরু হয়েছে নানা মেরুকরণ। প্রার্থীদের মধ্যে যখন এখন থেকেই তোড়জোড় তখনো ঘোষণা করা হয়নি তফসিল। কিন্তু মাঠ ছাড়তে নারাজ কেউ। আলোচনার তুঙ্গে এখন সেখানকার এমপি জাতীয় পার্টি নেতা লিয়াকত হোসেন খোকার স্ত্রী ডালিয়া লিয়াকত। তাকে নিয়েই সকলের দৃষ্টি।

আর এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ঝড় তুলেছেন অনন্যা হোসাইন মৌসুমী। গত সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। পরিচয় দিতেন প্রয়াত এরশাদের পালিত কন্যা। কিন্তু হালে পানি পায়নি। মনোনয়ন পায়নি এ নারী নেত্রী। কিন্তু তখন তিনি ফেসবুকে ঝড় তুলতেন একের পর এক স্ট্যাটাস দিয়ে।

২ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে ‘অনন্যা হুসেইন’ আইডিতে একিট পোস্ট দেওয়া হয়েছে। আর এটা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা ধরনের গুঞ্জন। কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন তিনি সেটাও নিশ্চিত না। তবে অনেকেই ধারণা করছেন স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধিকে। যদিও তিনি কারো নাম উল্লেখ করেনি।

এতে তিনি লিখেছেন, ‘সোনারগাঁও পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। অনেক প্রার্থী দেখলাম। ভালো লেগেছে খারাপও লেগেছে। গত নির্বাচনেও অনেক প্রতিযোগিতা হয়েছে, সাদেক সাহেব সম্মানিত ব্যক্তি কিন্তু ওনি তো চলতেই পারেনা তবুও ক্ষমতায় থাকার মজা আর স্বাদ পেলে কেউ ছাড়তে চায়না নতুনদের সুযোগ দেয়া উচিৎ। নতুন নতুন অনেককেই দেখছি। সবই ঠিক আছে।’

‘কোন কোন ভাড়াটিয়াও নাকি নতুন ভোটার হইছে? মানুষ কি এতোই বোদাই পুরান পাগলে ভাত পায়না নতুন পাগলের আমদানি? পেট ভরেনা এক এক জনের। পৌরবাসীর সবাইকে বলবো, মার থেকে মাসির দরদ বেশী দেখলে মনে করবেন সে রাক্ষুসি। মানুষ খেকু। রক্ত চোষা। এরা ধান্দাবাজ, ধান্দা করে চলে যাবে। এদের সাথে যাহারা আছে ওরাও ফায়দা লুটতে আসছে। সাবধান পৌরসভার মা বোন ভাইয়েরা। পৌর মেয়র যেই হক সে যেনো পৌরসভার হয়, তার নাড়ির সাথে যেনো মাটির সম্পর্ক থাকে। তার বাবা মার দাদা দাদীর বাড়ী এখানে হয়। তা হলে সোনারগাঁ পৌরসভার উন্নতি হবে, উন্নয়ন হবে। কিন্তু এখানে নতুন ভাড়াটিয়া পৌর মেয়র হলে ধান্দা করতে আসবে, পয়সা কামাই করে চলে যাবে। এটাই সত্য। ভুল করলে পরে বুঝবেন। আর মনে রাখবেন আমার কথাটা।’

প্রসঙ্গত বাজতে শুরু করেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার নির্বাচনের ডামাঢোল। আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে এ নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় চলছিল আগে থেকেই। হঠাৎ করেই মাঠে উদয় হয়েছে এমন একজন ব্যক্তি যিনি শুধুমাত্র সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতে নতুন নয়-রাজনীতির ময়দানেই একেবারে নতুন মুখ।

তিনি আর কেউ নন ডালিয়া লিয়াকত। উপজেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান। এর চেয়েও বড় পরিচয় তিনি সেখানকার এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার স্ত্রী। এমপি’র স্ত্রী হওয়াটা নির্বাচনের ক্ষেত্রে যদিও বড় কোন বিষয় নয় তবুও সোনারগাঁও পৌরবাসী একজন নতুন মুখকে মেনে নিবে কিনা এনিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহের অবকাশ রয়ে গেছে বলে মনে করেন বোদ্ধামহল। তাদের মতে, ডালিয়া লিয়াকতের নিজস্ব যোগ্যতার বৈশিষ্টগুলো সোনারগাঁও পৌরবাসীর জানার সুযোগ হয়নি। তাকে এমপি’র প্রোগ্রামগুলোতে দেখা যেত। ইদানীং জনসেবার কসরত করছেন। তাও উল্লেখ করার মত নয়। সবাই তাকে এমপি’র সূত্র ধরেই যেন চিনতে পেরেছেন। এই চিনতে পারাকে মেয়র পদে নির্বাচন করার যোগ্যতা মনে করলে তা শতভাগ ভুল হবে। এবং হচ্ছে। সোনারগাঁও পৌর নির্বাচনে প্রাধান্য পাবে গণমানুষের পছন্দের ব্যক্তিত্ব। সেই ব্যক্তিত্বের দেখা মিলবে সহসাই। গণমানুষের হৃদয় জয় করতে হলে জনগণের জন্য কাজ করলেই হয়। এক্ষেত্রে মন্ত্রী, এমপি’র পরিচয় বেমানান।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি খোকার দেওয়া সম্পদের হলফনামা অনুযায়ী অর্ধেক সম্পদের মালিক ডালিয়া লিয়াকত। শুধু সম্পদের মালিক হিসেবে পরিচিত নন-একজন প্রেমময়ী হিসেবেও তিনি সমধিক পরিচিত। খোলা মনের মানুষ। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারী ভ্যালেন্টাইন দিবসে ‘প্রেমিক জুটি’ হিসেবে স্মৃতি রোমন্থন করার সময়ে আলোচনায় উঠে আসে দুইজনের নাম। একে অপরের প্রতি অগাধ প্রেম আর ভালোবাসার এতটাই জোর ছিল যেন ডালিয়ার জন্য আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন লিয়াকত হোসেন খোকা। সেদিনের প্রেমিক খোকাকে আত্মহত্যা করতে হয়নি। তাকে বাঁচিয়েছেন প্রেয়সী ডালিয়া।

সূত্রমতে, বর্তমানে সোনারগাঁও পৌরসভার মেয়র সাদেকুর রহমান। তিনি টানা কয়েকবারের জনপ্রতিনিধি। আগামীতেও তার পরিবারের একজন এ মেয়র পদে আগ্রহী। ইতোমধ্যে প্রচারণায় নেমেছেন এর আগে নির্বাচন করা যুবলীগ নেতা গাজী মুজিবুর। পোড় খাওয়া এ ত্যাগী নেতার বড় দুর্বলতা ‘আর্থিক অস্বচ্ছলতা’বলে মনে করেন অনুগামীরা। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তার ‘ত্যাগ’ নিয়ে কারোই কোন সন্দেহ নাই। সবশেষ নির্বাচনে তিনি দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েই সরে যান।

এদিকে, প্রার্থী হতে চান গত নির্বাচনে প্রার্থী হয়েও পরাজয় বরণ করা আইনজীবী এটি ফজলে রাব্বি। তিনি আড়াইহাজারের এমপি এক সময়ের তুখোড় ছাত্রলীগের সেক্রেটারী নজরুল ইসলাম বাবুর ভগ্নিপতি। প্রার্থীর তালিকাতে আছেন ছগির আহমেদও।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের শেষের দিকে সোনারগাঁও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ঘনিয়ে আসছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পৌরসভা নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা নিজেদের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছেন। পিছিয়ে নেই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও।

গত সপ্তাহে সোনারগাঁয়ে একাধিক বৈঠক হয় জাতীয় পার্টির। সেখানে পদ না থাকার পরেও উপস্থিত হন ডালিয়া লিয়াকত। উপস্থিত নেতাকর্মীরা স্লোগান তুলেন, ‘মেয়র পদে ডালিয়া লিয়াকততে চাই’। মুখরিত স্লোগানে হাসি দেখার মিলে ডালিয়ার ঠোটের কোনে।

মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে উঠে একটি পোস্টার। সেখানে ডালিয়াকে ‘মেয়র হিসেবেই দেখতে চাই’ লাল কালিতে দাবী লেখা হয়। সোনারগাঁয়ে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ডালিয়া লিয়াকত। এই পোস্টার নিয়ে চলছে সমালোচনা। জাপার অনেক সিনিয়র নেতা বলছেন, সবই পেছনের কারসাজি। দলের বৈঠকে ডালিয়া লিয়াকতকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই স্লোগান এবং পোস্টার তৈরী করা হয়েছে কর্তার ইচ্ছায়। সেই কর্তা কে ? সোনারগাঁও পৌরবাসী তা বেশ ভালো ভাবেই জানেন।

নারায়ণগঞ্জ-৩ তথা সোনারগাঁও আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা। ২০১৮ সালে হলফনামা অনুযায়ী তার পেশা ব্যবসা। তার ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে কালীরবাজার চারারগোপ যাবতীয় কাচা পাকা ফলের আড়ৎ ও মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় লাবিবা ট্রেড লিংক আইউব প্ল¬াজা। তার ব্যবসা থেকে বাৎসরিক আয় ১০ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪০ টাকা ও স্ত্রীর ব্যবসা হতে আয় ১১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

ব্যাংকে সুদ ও শেয়ার থেকে তিনি আয় করেন ৬১ হাজার ৬৩৪ টাকা ও তার স্ত্রী আয় করেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৮১৪ টাকা। এছাড়া জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে তার বাৎসরিক আয় ২২ লাখ ৪৩ হাজার ১৭৫ টাকা।

অস্থাবর সম্পত্তির ভেতর তার নিকট নগদ অর্থ ব্যবসা থেকে রয়েছে ৮১ লক্ষ ৬ হাজার ২৮৮ টাকা ও ব্যবসা বহির্ভূত সম্পত্তি ১৭ লাখ ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। এছাড়া একই ভাবে তার স্ত্রীর নিকট ব্যবসা থেকে নগদ অর্থ ৫৭ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৫ টাকা।

লিয়াকত হোসেন খোকার নামে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ রয়েছে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৯৪২ টাকা, তার স্ত্রীর নামে ৯ লাখ ৪ টাকা ও তার উপর নির্ভরশীলদের নামে ১৫ লাখ ৮৮ হাজার ৯৮৫ টাকা রয়েছে।

খোকার নামে শেয়ার রয়েছে ৮ লাখ টাকার ও তার স্ত্রীর নামে শেয়ার রয়েছে ২ লাখ টাকার।

লিয়াকত হোসেন খোকার নিজের কোন গাড়ি নেই। তার স্ত্রীর একটি গাড়ী রয়েছে যার বাজার মূল্য ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ২৯ টাকা।

তাঁর কাছে উপহার হিসেবে স্বর্ণালংকার রয়েছে ৩০ ভরি ও তার স্ত্রীর নিকট উপহার হিসেবে রয়েছে ৮৪ ভরি। ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ তার নামে রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার।

এছাড়া অন্যান্য আসবাবের ভেতর তার নামে রয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার সম্পত্তি ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সম্পত্তি। লিয়াকত হোসেন খোকার সৈয়দপুরে ৮ শতাংশ জমি রয়েছে যার মূল্য ২০ লাখ টাকা। তার নিজস্ব কোন বাড়ি নেই তবে তার স্ত্রীর শেয়ারে একটি ৩ তলা বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে যার মূল্য ২০ লাখ ৭২ হাজার ৬৭৯ টাকা।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
newsnarayanganj-video
আজকের সবখবর