তিতাসের ঘুষের রাজসাক্ষীর মৃত্যু

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫০ পিএম, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ বুধবার

তিতাসের ঘুষের রাজসাক্ষীর মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৮ নম্বর মৃতের তালিকায় মসজিদ কমিটির সেক্রেটারী হান্নান সাউদ মিয়ার নাম যুক্ত হয়েছে। তিনি এই বিষ্ফোরণের ঘটনার দায়ী ব্যক্তিদের একমাত্র রাজসাক্ষী ছিলেন। কারণ গ্যাস লিকেজ থেকে এই বিষ্ফোরণ হয়েছে তা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। আর এই ঘটনার ২০ দিন আগে গ্যাস লিকেজ সারাতে তিতাস গ্যাস অফিসের কোন ব্যক্তিকে মৌখিকভাবে অবহিত করে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারী হান্নান মিয়া। তিতাসের সেই অজ্ঞাত ব্যক্তিটি লিক সারাতে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। সেই ঘুষের টাকা ম্যানেজ করতে বিলম্ব হওয়ায় দুর্ঘটনায় মারা যায় ২৮ জন এবং দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে ৮ জন। তবে সেই ঘুষের ঘটনার রাজসাক্ষী হান্নান মিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় ঘুষের ঘটনা আড়ালেই থেকে যাবে। আর সেই সুযোগকে পুঁজি করে কিছুটা হলেও সুবিধা পেতে পারে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় দগ্ধ হান্নান মিয়া ঢাকা শেখ হাসিনা বার্ণ ইন্সিটিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দগ্ধ ৩৭ জনের মধ্যে ২৮ জন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বাকি ৯ জনের মধ্যে ১ জনকে রিলিজ দেয়া হয়। আর বাকি ৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে ওই দিন সন্ধ্যায় তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদের বিষ্ফোরণের ঘটনায় মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুল গফুর মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডের কর্মকর্তারা। চাষালা বালুর মাঠ এলাকার তিতাস গ্যাস অফিসে ডেকে এসে জিজ্ঞাসাবাদ ও ফর্মে স্বাক্ষর রাখা হয়।

মসজিদের সভাপতি আব্দুল গফুর মিয়া বলেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আমাকে আসতে বলেছিল। আমরা ৪ জন এসেছি। এখন তারা একটা ফর্ম তৈরি করেছে। যেমন তিতাস গ্যাসের কারো সাথে আপনি কি যোগাযোগ করেছেন। তো আমিতো যোগাযোগ করিনি। তখন আমাকে লিখতে বলা হয়, ‘আপনি যোগাযোগ করেন নাই।’ যোগাযোগ করছে তো সেক্রেটারী। তারা বলে আপনি যেগুলো যেগুলো করেন নাই সেগুলো লিখেন। সেক্রেটারী যোগাযোগ করছে না করছে সেগুলো আপনার দরকার নাই। প্রায় ১০-১১ টা ঘর তৈরি করছে। এই ঘরগুলো ফিলাপ করাইছে। পূর্বে আপনাদের যে বক্তব্য দিয়েছি এখানেও সেই বক্তব্য দিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, আমি যখন তাদের বললাম আমি না আসলেও সেক্রেটারী আসতে তখন তারা বলেন, আপনি আসেন নাই এবং লিখিত কোন অভিযোগ দেন নাই, দিয়েছেন ? এটা লিখেন। সেক্রেটারী বা অন্য কেউ আসছে কিনা সেটা দেখার বিষয় না আপনে আসছেন কিনা সেটা লিখেন-এমনটাই বলেছেন গ্যাস কর্মকর্তারা। আমি তিতাস গ্যাস অফিসে আসি নাই কমিটির সেক্রেটারী আসছে। সে কার সাথে কথা বলেছে কন্ট্রাকটার নাকি কোন অফিসারের সাথে কথা বলেছে আমি জানিনা। তিনি শুধু বলেছিল অফিসের লোকজনের সাথে কথা বলেছি। তারা ৫০ হাজার টাকা চায়। এই টাকা দিলে কাজ করবে। তখন আমরা এই টাকা ম্যানেজ করতে পারি নাই। ফান্ডে এতো টাকা ছিলনা।

‘দুই জন আছে কমিটির মধ্যে আর দুইজন আছে কমিটির বাইরে। আমি সহ কমিটির সহ সভাপতি সামসুদ্দিন সরদার। এবং কমিটির বাইরে থাকা মামুন ও স্বপন কে নিয়ে তিতাস গ্যাস অফিসে দেখা করতে আসেন বাইতুস সালাত জামে মসজিদের সভাপতি মো. গফুর মিয়া।’

অন্যদিকে বিষ্ফোরণের ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে গ্যাস লিকেজের তথ্য উঠে আসে। সেই তদন্তের রেশ ধরে গত ৭ সেপ্টেম্বর মসজিদের সামনের ও দুই পাশের সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি করে দুই পাইপের লিকেজ ধরা পড়ে। এতে তিতাসের কর্মকর্তা সহ ৮ জনকে বরখাস্ত করা হয়।

তাছাড়া এলাকাবাসীর অভিযোগ, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারী হান্নান মিয়া নিজেও এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তিনি কয়েকদিন আগেও তিতাস গ্যাসকে এ লাইন সংস্কারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিতাস তখন ৫০ হাজার টাকা দাবী করেন। টাকা না দেওয়ার কারণে লাইন মেরামত বা সংস্কার করেনি। ফলে লিকেজ হয়ে অন্য দিনের মতই গ্যাস জমে যায় মসজিদে। আর গরমের কারণে এসি চালানোর ফলে বাতাস বের হতে না পারায় গ্যাস জমে যায়। আর সেই থেকেই মূলত দুর্ঘটনা ঘটেছে।

সেসময় মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুল গফুর মিয়া জানান, কয়েকদিন আগেও আমাদের একজন লোক সাঈদ সাহেব তিতাসকে গিয়ে লিকেজের কথা জানায়। তখন তিতাস থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবী করা হয়। কিন্ত টাকা যোগাড় করা যায়নি। ফলে আমাদের এত হতাহতের ঘটনা ঘটলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষ্ফোরণের ঘটনার পর থেকে গ্যাস লিকেজ এবং সেই লিক সারাতে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবির বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়েছে। কিন্তু ঘুষের বিষয়টির একমাত্র সাক্ষী হিসেবে ছিলেন মসজিদ কমিটির সাবেক সেক্রেটারী হান্নান মিয়া যিনি এই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এতে করে তিতাস গ্যাসের সেই অজ্ঞাত কর্মকর্তার ঘুষের বিষয়টি আড়ালে থেকে যাবে। আর তাতে অনায়াসে পার পেয়ে যাবে সেই আসাধু কর্মকর্তা। অন্যদিকে মসজিদ কমিটির লোকদের বেশ বিপাকে পড়তে হবে। প্রথমত তারা তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে কোন অভিযোগ করেনি। দ্বিতীয় ঘুষ দাবির কোন সাক্ষী ও প্রমাণ না থাকায় তা উল্টো প্রভাব ফেলবে। তৃতীয়ত ৮ সেপ্টেম্বর তিতাস গ্যাস অফিসে মসজিদ কমিটির সভাপতিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের বর্ণনা দায় এড়ানোর ইঙ্গিত বহন করছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও