অনুদান কারো বেশী কারো কম

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০৪ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ রবিবার

অনুদান কারো বেশী কারো কম

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে ভয়াবহ একটি ট্রাজেডি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লা এলাকায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনা। ভয়াবহ এই ঘটনার পর সরকারি, বেসরকারি, রাজনৈতিক সংগঠন সহ ব্যক্তিগত সহায়ত নিয়ে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ালেও সেই সহায়তার সুষম বন্টন হচ্ছে না। নিহতদের পরিবারগুলো যে সহায়তা পাচ্ছে আহতদের পরিবারগুলো সেই অনেক কম সহায়তা পাচ্ছেন। এমতাবস্থায় বেঁচে ফেরা মানুষগুলোর চিকিৎসা নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছে পরিবারগুলো।

বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ৩ জনের পরিবার ও নিহত ১০ জনের পরিবারসহ মোট ১৩টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয়ে জানা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে গত এক সপ্তাহে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে যে সহায়তা এসেছে তা পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত না। নিহতদের পরিবারগুলো যে সহায়তা পেয়েছে আহত পরিবারগুলো সেই সহায়তাও পাচ্ছে না। সরকারি সহায়তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে দেওয়া সহায়তার যে পরিমাণ নিহতদের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে। আহতদের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে এর অর্ধেক।

নিহত পরিবারগুলো মধ্যে একটি পরিবার দেড় লাখ টাকারও অধিক আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এছাড়া অন্যান্য পরিবারগুলো গড়ে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার নগদ আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। ওই টাকার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছে মডেল গ্রুপ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং অবশিষ্ট টাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আহত ৩ জনের পরিবারের সঙ্গে কথা হলে জানা যায় তাঁরা নিহতদের তুলনায় অনেক কম সহায়তা পেয়েছেন। আহত তিন জনের পরিবারের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ফেরা মো. মামুনের পরিবার পেয়েছে ৫৫ হাজার টাকা। ওই টাকার মধ্যে ৩০ হাজার টাকা মডেল গ্রুপের, জেলা প্রশাসনের ১০ হাজার বাকি টাকা বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এখনো বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আমজাদের পরিবার শুধুমাত্র মডেল গ্রুপের পক্ষ থেকে ৩০ হাজার টাকা পেয়েছে।

তবে সব থেকে খারাপ অবস্থা বিস্ফোরণের সময় মসজিদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দগ্ধ সালমা বেগমের পরিবার। এই পরিবারটি এখনো পর্যন্ত মাত্র ২৫ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছে। যার মধ্যে ১০ হাজার টাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সদর ইউএনও নাহিদা বারিক দিয়ে এসেছেন। অবশিষ্ট টাকা বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ দগ্ধদের তালিকায় সালমার নাম না থাকায় মডেল গ্রুপের সহায়তাও তিনি পাননি।

এ প্রসঙ্গে সালমা বেগমের স্বামী মো. আমির নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘মসজিদে বিস্ফোরণের আগুনে আমার স্ত্রী দগ্ধ হলেও দগ্ধদের তালিকায় নাকি আমার স্ত্রীর নাম নাই। যে কারণে তেমন সহযোগীতা আমরা পাই নাই। জেলা প্রশাসনের ১০ হাজার টাকা আর ব্যক্তিগত কিছু সহায়তা পেয়েছি। মোট ২৫ হাজার টাকার মত হবে। মডেল গ্রুপের সহায়তাও আমরা পাই নাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত সব খরচ আমাদের কেউ দিতে হচ্ছে। গত কালকেও তিনদিনের ওষুধ আনছি ১৪০০ টাকার। তিনদিন পর পর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। সেখানেও খরচ হয়। এখনো পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। আরো কতদিন চিকিৎসা করাতে হবে সেটাও তো বলতে পারি না। যদি সহায়তা না পাই তাহলে কিভাবে চিকিৎসার খরচ চালাবো সেটা নিয়ে চিন্তায় আছি।’

এখনো সাহাপাতালে চিকিৎসাধীন মো. আমজাদের শাশুড়ি নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমার দুই মেয়ের জামাই আগুনে পুড়েছে। একজন মারা গেছে। আরেকজন এখনো হাসপাতালে আছে। যে জামাই মারা গেছে তাঁর নামে ৭৫ হাজার টাকার মত পাইছি। কিন্তু হাসপাতালে যে আছে তাঁর নামে শুধু মডেল গ্রুপের ৩০ হাজার টাকা পাইছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা চলতাছে আমাদের কোনো টাকা এখনো লাগে নাই। চিকিৎসার খরচ সরকার থেকেই দিছে। কিন্তু পরিবারের জন্য ৩০ হাজার টাকা ছাড়া আর কোনো টাকা পাই নাই। ছোট একটা মেয়ে আছে। আয় রোজগারের আর কেউ নাই। মেয়ের পরিবারটার খরচ কিভাবে চালাই চিন্তা তো একটু হয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন জামাইরে বাঁচায়া ফিরায়। আল্লাহ একটা না একটা ব্যবস্থা করবোই।’

প্রসঙ্গত এ যাবত যাঁরা মারা গেছেন দু’একজন বাদে সকলেই ছিলেন উপার্জনক্ষম মানুষ। ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। একজনের আয় দিয়েই সংসারের চাকা ঘুরতো। তল্লায় মসজিদ ট্রাজেডিতে ৩১জনের মৃত্যু ঘটেছে। এত লাশ ইতোপূর্বে একসাথে দেখেনি এই এলাকার মানুষ। হতদরিদ্র শ্রেণীর পরিবারগুলো কোন রকমে টেনেটুনে চলতো একজনের আয়ের টাকায়। ঘরভাড়া দিলে চাল, ডাল আনতে কষ্ট হত। বাচ্চাদের পড়াশোনাও ঠিকমত করাতে পারতোনা। এরই মধ্যে ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটে গেল দরিদ্র শ্রেণীর মানুষগুলোর জীবনে। কেউ গার্মেন্টে চাকরি করতো। কেউ বা রিক্সা চালাতেন। কেউ করতেন টিউশনি। একজন ফটোসাংবাদিক ছিলেন। তিনিও ছিলেন নি¤œবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। পেশায় সৎ ছিলেন। সাদাসিদে জীবনযাপন করতেন। ঘরে অভাব-অনটন থাকলেও কাউকে বুঝতে দিতেন না। মসজিদ ট্র্যাজেডিতে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। সকলেই চোখেমুখে দেখছেন গভীর অন্ধকার। এ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের কিছু আশ্বাস পাওয়া গেছে। বড় ধরনের কোন ক্ষতিপূরণ কেউ পায়নি। হাইকোর্ট থেকে তিতাস গ্যাসকে নিহতের পরিবার প্রতি ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

৮ সেপ্টেম্বর পশ্চিম তল্লা বোমারু মাঠে হতাহত পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত পরিবারের পক্ষে মসজিদের ইমাম আব্দুল মালেকের ছেলে ফাহিম ইসলাম বলেছেন, যারা মারা গেছে তাদেরকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আমাদের এই অভাব কখনও পূরণ হবে না। আমরা সবাই গরীব। গার্মেন্টেসে চাকরি করে এই পরিবারগুলোর সংসার চলতো। তাই এই পরিবারগুলোর কর্মসংস্থানের জন্য ৫০ লাখ টাকা করে দিলে উপকৃত হতো।

ফাহিম ইসলাম আরও বলেন, আমরা শুনেছি ৫০ লাখ টাকা দাবী করে একটি রিট করা হয়েছে। আমরা সেই অনুযায়ী-ই বলবো সরকারের কাছে ৫০ লাখ টাকা কোনো ব্যাপার না। যারা মারা গেছে তারা বেঁচে থাকলে হয়তো ৫০ লাখ টাকা আয় করা তাদের কোনো ব্যাপার ছিল না। আমরা অনুদানের উপড় নির্ভর করে বেঁেচ থাকতে চাই না। কারও কাছে হাত পাততে চাই না। যে পরিবারের সদস্যরা মারা গেছে তাদের পরিবারের সদস্যকে ভাল একটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া হোক।

ইমাম আব্দুল মালেকের বড় ছেলে নাইমুল ইসলাম বলেন, আমরা সরকারের কাছে আবেদন করবো ভাল একটা কর্মসংস্থানে ব্যবস্থা করা হোক। যাদের পরিবারে বয়স্করা রয়েছে তাদের জন্য বয়স্কভাতার ব্যবস্থা করা হয়। যাতে করে তারা শেষ সান্তনাটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। সেই সাথে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। যাতে আর কোনো এরকম ঘটনা না ঘটে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য যথেষ্ট করেছেন আমরা তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় আমরা স্বজনদের শেষ চিকিৎসাটুকু করতে পেরেছি। সেই সাথে মসজিদকে বাইতুস শহীদ হিসেবে নামকরণ করে পুনরায় চালু করা হোক।

এদিকে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে মডেল গ্রুপ কর্তৃক আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে। নিহত ২৮টি পরিবারের কাছে ৫০ হাজার টাকা ও আহত ৯টি পরিবারকে ৩০ হাজার করে টাকা প্রদান করেন মডেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুজ্জামান। এ সময় হতাহত পরিবারদের পাশে থাকার ব্যক্ত করেন মডেল গ্রুপের এমডি।
বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টায় মডেল গ্রুপের সভাকক্ষে হতাহত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই অনুদান প্রদান করা হয়।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও