সড়কে মাটি ফেলছে তিতাস মসজিদ এখন সুনশান নীরব

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৪৫ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ সোমবার

সড়কে মাটি ফেলছে তিতাস মসজিদ এখন সুনশান নীরব

‘এখানে গর্ত আছে পড়ে গেলে ব্যাথা পাবেন। তার চেয়ে বরং বাড়ির ভিতর দিয়ে ঘুরে যান।’ যার আসছেন নিজ দায়িত্বে সবাইকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন একজন বৃদ্ধ। তার পাশেই সেই গর্ত ভরাট করতে মাটি ফেলে চলেছেন তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের নিয়োজিত শ্রমিকেরা। তারাও বিভিন্ন মানুষকে একই কথা বলছেন। ফলে মসজিদের সামনে দিয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারছে না এলাকাবাসী। তবে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী আর শ্রমিকেরা না থাকলে জনবহুল পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে আজ সুনশান নিরবতা।

১৩ সেপ্টেম্বর রোববার দুপুরে সরেজমিনে বাইতুস সালাত জামে মসজিদে গিয়ে দেখা গেছে, বাইরে থেকে তলা দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে কেউ ভিতরে প্রবেশ করতে পারছেন না। ভেতরে এখনও ক্রাইম সিনের সেই ফিতে বাঁধা রয়েছে। পরে আছে ভাঙা কাঁরে টুকরো। মেঝেতে আছে নোংরা পানিও। বাকা হয়ে যাওয়া ফ্যানগুলোও ঝুলে আছে, সমানের কাভার গলে যাওয়া এসিগুলো সেখানে আছে। এ যেন এ পরিত্যক্ত কক্ষের মতো।

এছাড়াও মসজিদের সামনে নিরাপত্তা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দুই একজন সদস্য থাকলেও তারাও একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। তাছাড়া আশা যাওয়ার দুটি রাস্তায় বাঁশ ফেলে রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। আর মসজিদের সামনে থাকা দোকানগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে। বাসা বাড়িতে লোকজন থাকলেও দরজা জানলা বন্ধ করে রাখছেন। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বের হতেও দেখা যায়নি টানা ২ ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করে।

স্থানীয়রা জানান, যে মসজিদে নিচ তলায় প্রথম অংশে এক কাতারে ১১ জন করে ৯৯জন নামাজ আদায় করতেন। এছাড়াও বারান্দার অংশে ৪ কাতারে ৩২জন। তাছাড়া দ্বিতীয় তল্লায় এক কাতারে ১৫ জন করে প্রায় ১৫০জন নামাজ আদায় করেন। তবে এ সংখ্যাটা প্রতি জুম্মায় ছাড়িয়ে যেতো ৫০০ কিংবা তারও বেশি। এর ধারাবাহিকতায় গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবারও মসজিদে জুম্মার নামাজে ছিল পর্যন্ত ভীড়। কিন্তু পরবর্তী শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বরই ছিল তলাবদ্ধ। মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে এলাকাবাসী চোখের পানি ফেলে দোয়া করেছেন। মুসল্লিদের ভীড়ে মসজিদ যেখানে থাকতো উৎসবমুখর সেখানে আজ শোকাহত পরিবেশ।

উল্লেখ্য গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টায় সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লার বাইতুস সালাত জামে মসজিদে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।এতে মসজিদের মুয়াজ্জিন, ইমাম, শিশু, শিক্ষার্থী, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ফটো সাংবাদিক সহ ৩৯ জন দগ্ধ হয়। যাদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ৩১জন মৃত্যুবরণ করেন।

মসজিদের দ্বিতীয় তলায় রুমে ভাড়া থাকতেন আনিসুল ইসলাম। মসজিদে বিস্ফোরণের পর থেকেই পাশের একটি বাড়িতে বসবাস করছেন। সকাল বিকেলে মসজিদের সামনে এসে ঘুরোঘুরি করেন।

তিনি বলেন, ‘অত্র এলাকায় সব থেকে বেশি মুসল্লি এ মসজিদে হতে দেখেছি। প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্ত নামাজে নিচেও ১০০ থেকে ১৫০ মানুষ হয়। বিস্ফোরণের রাতেও প্রায় ১০০জন ছিল। কিন্তু অনেকেই নামাজ শেষ করে বের হয়ে যায়। আর যারা নফল নামাজ ও দোয়া করতে ছিলেন তারাই মূলত দগ্ধ হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘এখানে পানি জমে থাকলেও মানুষ এদিক দিয়েই মূলত যাতায়াত করতো। কারণ এটাই ছিল পুরাতন ও এলাকার মূল রাস্তা। ফলে এদিক দিয়েই জনসমাগম বেশি ছিল। রেল লাইন ও এর আশেপাশের মানুষ এখানেই এসে নাম পড়তো। কিন্তু বিস্ফোরণের পর থেকেই এর রাস্তায় চলাচল কমে আসছে। আর তিতাসের খোড়াখুড়িতে এখন সম্পূর্ণ ভাবে রাস্তা বন্ধ। সবাই ঘুরে অন্য গলি দিয়ে যাতায়াত করছে। যার জন্য এ রাস্তা আশে পাশে নিরব পরিবেশ।’

নাম বলতে না চাওয়া বৃদ্ধ বলেন, ‘মসজিদ আর মসজিদ নেই। এখন একটা শুধু ভবন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নামাজ দোয়া ও কোরআন না পড়লে সেটা আর মসজিদ থাকে। কবে এটাই নামাজ পড়তে পারবো জানি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘যারা মারা গেছে তারা শহিদ হয়েছে। আল্লাহ তাদের বেহেস্ত নসিব করুক। কারণ আল্লাহর ঘরে নামাজরত অবস্থায় শহীদ হয়েছেন। আল্লাহ তাদের সবগুনা মাফ করে দিয়েছেন।’

গণমাধ্যমের কর্মীরা জানান, ‘সকাল থেকেই ফায়ার সার্ভিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্তে মসজিদে আসবেন সেজন্য সবাই অপেক্ষা করছিলেন। তবে সেটা কখন আসবে জানেন না বলেই সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সবাই বসে ছিলেন। তাছাড়া এখানে ঘটনার ফলোআপ করার মতো নতুন কোন কার্যক্রম দেখা যায়নি।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, ‘ঊর্ধ্বতনরা এখানে আসবেন এ বিষয়ে কোন কিছু জানায়নি। তাই বলতে পারছি না তারা কখন আসবেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘তদন্ত চলছে। বিভিন্ন বিষয়গুলো ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়েই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।’


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও