টাকা ছাড়া নড়ে না : ফতুল্লা লঞ্চঘাটে প্রতিনিয়ত যাত্রী নাজেহাল

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:০০ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০২০ বৃহস্পতিবার

টাকা ছাড়া নড়ে না : ফতুল্লা লঞ্চঘাটে প্রতিনিয়ত যাত্রী নাজেহাল

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা লঞ্চঘাটে যাত্রীরা পদে পদে নাজেহালের অভিযোগ পাওয়া গেছে। লঞ্চঘাটে প্রবেশ করতে শুল্ক দিতে হয় দ্বিগুন। আর যে কোন মালামাল পরিবহনে শুল্ক নেয়া হয় বহুগুন বেশী। যাত্রীদের বিভিন্নভাবে হয়রানী ও নাজেহাল করাটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হিসেবে দাড়িয়েছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। দাবীকৃত অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে নাজেহালসহ মারধরেরও শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের।

অতিরিক্ত শুল্ক আদায়ের প্রতিবাদ করা নিয়ে প্রায়শই যাত্রীদের সঙ্গে ঘাটের ইজারাদারের লোকজনের হাতাহাতি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। লঞ্চঘাটটির ইজারাদার ক্ষমতাসীন দলের লোকজন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিআইডব্লিউটিএ’র লোকজন দেখেও না দেখার ভান করছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের। অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করা হলেও যাত্রীসেবার কোন বালাই নেই। ইজারাদারের দাবি তারা নিয়ম মেনেই শুল্ক আদায় করছেন। অপরদিকে বিআইডব্লিউটিএ বলছে তারা এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নিবে।

বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা নদী বন্দর সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা লঞ্চঘাট প্রতিবছর দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেয় সরকার। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, প্রতিজন যাত্রী প্রতিবার টার্মিনালে প্রবেশ করতে ৫ টাকা দিয়ে টিকেট কিনতে হবে। মালামাল উঠানামার (অবতরণ অথবা নির্গমন) জন্য প্রতি মেট্রিক টন বা তার অংশ বিশেষের জন্য ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। ছাগল অথবা ভেড়া প্রতিটি প্রতিবার ৭টাকা, গবাদি পশু প্রতিটি প্রতিবার ১৭ টাকা, অন্যান্য সকল জীব-জন্তু (পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক যে সকল জীব-জন্তু, পশু পাখি ধরা নিষেধ তা ব্যতিত) প্রতিটি প্রতিবার ১৭ টাকা, পাখি বা এ জাতীয় অন্যান্য (পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক যে সকল জীব-জন্তু, পশু পাখি ধরা নিষেধ তা ব্যতিত) প্রতিটি প্রতিবার ২ টাকা, ট্রাক, বাস, মিনিবাস, স্টেশন ওয়াগন ও কাভার্ডভ্যান প্রতিটি প্রতিবার ৩৫ টাকা, কার, জীপ, পিক আপ ও মাইক্রোবাস প্রতিটি প্রতিবার ১৭ টাকা, টেম্পু, বেবীট্যাক্সি (সিএনজি), মোটরসাইকেল ইত্যাদি প্রতিটি প্রতিবার ১০ টাকা, সাইকেল প্রতিটি প্রতিবার ২ টাকা হারে শুল্ক আদায় করা যাবে। যেসকল দ্রব্যদির পরিমাণ ঘনফুট বা ঘনমিটারে নির্ধারিত হয় তাদের প্রতি ঘনফুট বা ঘনমিটার বাং অংশবিশেষের জন্য প্রতি ঘনফুটে প্রতিবার ২৫ পয়সা ও প্রতি ঘনমিটারে প্রতিবার ৮ টাকা ৯২ পয়সা হারে শুল্ক আদায় করা যাবে।

এদিকে ফতুল্লা লঞ্চঘাটটিতে শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে ইজারাদারের লোকজন কোন ধরনের নিয়ম নীতির তোয়াক্কা করছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। যাত্রী পারাপার ও মালামাল বহনে ইজারার শর্ত ভেঙে বহুগুন বেশী শুল্ক আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি অতিরিক্ত শুল্ক দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে যাত্রীদের নাজেহালসহ মারধরও করা হচ্ছে বলে অভিযোগে জানা গেছে।

সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর অতিরিক্ত শুল্ক আদায়ের প্রতিবাদ করা নিয়ে ইজারাদারের লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের মধ্যে বাকবিতন্ডা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে ইজারাদারের প্রতিনিধি মুন্না, নিহাদ, হৃদয়, তানভীরসহ তাদের অনুগামী লোকজনের হামলা ও পিটুনীতে মিলন, মাসুম, শুভ, শাহজাহানসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। এর আগেও একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত ৮ অক্টোবর অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা আইউব আলী নিজের ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, ফতুল্লা লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীসেবা বলতে কিছুই নেই। ১০ টাকার টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে লঞ্চ এর জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। হাজার হাজার যাত্রী কোথাও বসার জন্য একটি টুল পর্যন্ত নেই। অসুস্থ রোগীদের যে কি অবস্থা তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে। বাথরুম করার জন্যও কোন ব্যবস্থা নেই। অথচ বহিরাগত যাত্রীর মালামালের জন্য ঘাট খরচ বাবদ গুনতে হয় অনেক টাকা। যেমন একটি টিভির জন্য গুনতে হয় ৩০০ টাকা। বিশ কেজি চালের বস্তার জন্য ২০০ টাকা। একটি বড় মোরগ বা হাঁস নিলে ১০০ টাকা। এই নিয়ে নিয়মিত যাত্রীদের সঙ্গে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। এগুলো দেখার মতো কেউ নেই? এ ব্যপারে আমি বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর মেহজাবিন ইসলাম তার ফেসবুক আইডিতে এক আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। তিনি উল্লেখ করেন, লঞ্চঘাটের ভিতরে কেউ ঢুকতে গেলে ১০ টাকা নিচ্ছে। বের হতে যার কাছে যা পারে তাই নিচ্ছে। দক্ষিণ অঞ্চল থেকে আসা লঞ্চের যাত্রীদের কাছ থেকে যার থেকে যা পারছে টাকা নিচ্ছি। যদি কোন বস্তা বা ব্যাগে কিছু মালামাল, হাস, মুরগি, হাতে বাজারের ব্যাগ থাকলেই দিতে হয় ৬০-১০০ টাকা। এমন ও দেখা যায় ব্যাগের মধ্যে গ্রামের বাড়ি থেকে শাক নিয়ে এসেছে যার দাম হবে ১শ’ টাকা, কিন্তু বাজারের ব্যাগে আনাতে দিতে হলো ১শ’ টাকা। সকাল থেকে প্রায় ১০ জন লোকের সঙ্গে ফতুল্লা ঘাটের ইজারদারের লোকজনের সঙ্গে যাত্রীদের তর্ক বিতর্ক, গায়ে হাতাহাতি হয়। নিয়ম অনুযায়ী জেটিতে ঢুকতে ৫ টাকা লাগে, আর বের হতে টাকা লাগে না। ব্যবসায়িক মালামাল না হলে কোন টাকা লাগে না। কিন্তু কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে হতে হয় নানা হেনস্তা, অপমান ও মাইরও খেতে হয়। এক বৃদ্ধ বাড়তি টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাকে থাপ্পড় মারে ইজারাদারের লোকজন। ফতুল্লা লঞ্চ ঘাটের ইজারদারের হাত থেকে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির হাত থেকে রক্ষা পেতো স্থায়ী কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। সেখানে টোলের তালিকা নেই। তাই এভাবেই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের অপমান সইতে হচ্ছে যেন দেখার কি কেউ নেই।

ফতুল্লা লঞ্চঘাটের ইজারাদার ফারুক চৌধুরী নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, সরকারী যা রেট আছে সে রেট অনুযায়ীই শুল্ক আদায় করা হয়।

সরকারী রেট কতো জানতে চাইলে তিনি রেট জানেন না বলে জানান। তিনি ইজারাদার অথচ রেট জানেন না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনি শুধুমাত্র নামেই ইজারাদার। এই লঞ্চঘাটটি তিনি সাব কন্টাক্টে ইজারা দিয়েছেন

সাব কন্টাক্টে ইজারা দেওয়ার নিয়ম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, নিয়ম অনেক আছে আবার অনেক নিয়ম নেই এগুলো বলে লাভ নেই। আমি থাকতে পারিনা এজন্য সাব কন্টাক্ট দিয়েছি। অনেক কিছুতো নিয়মের বাইরেও আছে যেমন অনেক প্রশাসনের লোক ফ্রি যায়। স্থানীয় লোকদেরও ফ্রি দিতে হয়। এটা একটা ওপেন স্পেস। অতিরিক্ত শুল্ক আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন অনেকে লেবারের টাকার সঙ্গে আমাদের শুল্কের টাকাও গুলিয়ে ফেলে তখনই বিপত্তি বাধে। আর একটা মুরগীর দাম কি একশ’ টাকা আছে যে একশ’ টাকা শুল্ক রাখবো। এটা কি মগের দেশ? কারা বেশী নিচ্ছে আমাকে প্রমান দিতে বলেন। হয়তো পাখি পরিবহনের ৩ টাকা রেটের জায়গায় কোন কোন সময় ৫ টাকা নেওয়া হয়। অতিরিক্ত কোন শুল্ক নেওয়া হয়না। আর বছরের পর বছর ঘাটের ভেল্যু বাড়লেও আয় সেই তুলনাই কিছুই নেই। সংঘর্ষের ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা একটা ওপেন প্লেস। অনেক সময় স্টাফরা হয়তো যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে তখন সমস্যা হয় তবে আমার কাছে এ ধরনের বিচার আসলে আমি তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নিয়ে থাকি।

বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক আরিফউদ্দিন নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ইজারাদার বা তাদের লোকজনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হারে শুল্ক আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও