হকারের বিপক্ষেই সবাই

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪২ পিএম, ৫ নভেম্বর ২০২০ বৃহস্পতিবার

হকারের বিপক্ষেই সবাই

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা সেলিনা হায়াৎ আইভী ফুটপাত চান না। সুশীল সমাজ ও নাগরিক সমাজ তো সরাসরি হকারদের বিপক্ষে। অপরদিকে জেলা পুলিশ সুপারের সাফ কথা তিনি হকার চানন না। তবে শুধু তিনি না ডিসি সাহেব হকার চাইলেও হবে না বরং সকলকে সমন্বিত হয়ে কাজ করতে হবে। এর আগে জেলা প্রশাসকও হকারদের জানিয়েছেন, পায়ে চলা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা ঠিক না। এটা করা যাবে না। ফুটপাতের এলাকাটি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমানের এলাকাতে। তিনিও হকারদের ফুটপাতে বসার পক্ষে পরোক্ষভাবে না। তিনিও চান এর সুষ্ঠু সমাধান। শীর্ষদের প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তাহলে কারা হকার চায়। কোন জনপ্রতিনিধি হকারদের ফুটপাতেই দেখতে চায়।

সবশেষ ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় এক সুধী সমাবেশে জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম হকার ইস্যুতে জনপ্রতিনিধি উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা জনপ্রতিনিধি কাছে তাদের কাছে উদাত্ত আহবান করছি আপনারা মিটিং ডাকেন আমি যাবো। শুধু এমপি বসলে হবে না শুধু মেয়র বসলে হবে না। সবাই মিলে বসতে হবে। রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ আছেন সরকারি দলের নেতৃবৃন্দ আছেন তারা যদি বলে হকার বসবে না তাহলে পৃথিবীর এমন কোনো শক্তি নাই যে এখানে হকার বসবে। যদি কোনো পুলিশ টাকা নেয় তাহলে আমাকের জানান আমি ব্যবস্থা নিব। কিন্তু আমি এটা পারবো না ফুটপাত হকারমুক্ত করতে। এটা করতে হলে সবাইকে একসাথে আসতে হবে। এখানে শাহ নিজাম সাহেব উনারা চাইলে ফুটপাতে হকার বসবে আমি এটা বিশ্বাস করি না। উনাদেরকে চাইতে হবে।

তিনি বলেন, আমার আগে এখানে পুলিশ সুপার হিসেবে অনেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের সময়ে পুলিশ ফুটপাত নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত হয়েছে এবং চেষ্টা করেছে। আমিও চেষ্টা করছি। কিন্তু এই চেষ্টায় ফুটপাত দখলমুক্ত হয়নি। আমি সারাদিন চেষ্টা করলেও বন্ধ হবে না। একার চেষ্টা বন্ধ হবে না। ফুটপাত নারায়ণগঞ্জের জাতীয় সমস্যা। ফুটপাত সরাতে হলে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিসি সাহেব কিংবা এসপি সাহেব ফুটপাত সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। জনপ্রতিনিধিদের আসতে হবে।

পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, সবাই মিলে যদি আমরা চাই তাহলে ফুটপাত সমস্যার সমাধান হবে। আমি ফুটপাতে রমজানে বসতে দেই নাই। এখনও দেই নাই। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা তো আমি আটকিয়ে রাখতে পারি না। আমি যখন যাই তখন তারা বসে না। এখানে শতকরা ৯৫ ভাগ আছে যারা এই অধিবাসী না। অন্য জেলার অধিবাসীদের জন্য মায়া দেখিয়ে লাভ নেই। অন্য জেলার অধিবাসীদের জন্য মায়া দেখিয়ে লাভ নেই। তারা নিজেদের জেলায় ফুটপাতে বসুক। তারা কেন নারায়ণগঞ্জে এসে বসবে। এই বিষয়টা সবার মাথায় ঢুকাতে হবে। সেটা আমি একা এসপি ঢুকালে হবে না। নারায়ণগঞ্জের জনপ্রতিনিধি সবাইকে এই বিষয়টা মাথায় নিতে হবে।

সম্প্রতি এক টক শোতে মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, শহরের ফুটপাতে শান্তিপূর্ণ হাঁটতে গিয়েই আমি আক্রমনের শিকার হয়েছিলাম। সেদিন আমি মারাও যেতে পারতাম। সরাসরি পিস্তল উঁচিয়ে মারতে আসলো। গুলি করলো। গুলিটা ভাগ্যক্রমে লাগে নাই তাই বেঁচে আছি। আমার বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকা সময়েই একটি হকার্স মার্কেট করেছিল। আমি তৎকালীন পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও ৬০০ হকারদের জন্য একটি মার্কেট করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেও এখন শহরের ফুটপাতে হকার বসে।

আইভী বলেন, ‘হকারদের পক্ষ কেন অবলম্বন করতে হবে সেটাও সামনে প্রশ্ন। হকার সহ সব ধরনের নি¤œ আয়ের মানুষের প্রতিই আমাদের সহমর্মিতা আছে। সিটি করপোরেশনেরও আছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রধানতম বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতেই বসতে চায় হকাররা। হকাররা যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের সঙ্গেই আঁতাত করে। রাজনৈতিক নেতাদের সভা সমাবেশে যেখানে যায়। আর হকাররা মনে করে ফুটপাতে বসলেই কাস্টমার পাবে। তাদের মদদ দিচ্ছে রাজনীতিবিদ। আর হকারদের কাছ থেকে তো চাঁদা তোলা হয়। অনেকেই চাঁদা তুলে। সিটি করপোরেশনের কয়েকজন জড়িত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন আর তারা জড়িত না। আমরা সিটি করপোরেশন, ডিসি ও এসপি মিলে একাধিকবার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম হকার ফুটপাতে বসবে না। কিন্তু এত বড় ঘটনা ২ বছর আগে আমাদের মারধর করা হলো তার পরেও ফুটপাতে বসে হকারররা। গত সপ্তাহে হকাররা থানা ঘেরাও করে। এতেই তো প্রমাণিত হয় প্রশাসন কিংবা প্রভাবশালী কেউ এর পেছনে কাজ করছে। পুলিশ তো হকার বসতে দিতে চায় না। অথচ হকাররাও ঠিকই বসছে। তাদের খুটির জোর নিশ্চয় শক্ত।

আইভী বলেন, যার যে কাজ সে সেটা করলেই তো হয়ে যায়। সিটি করপোরেশনের কাজ সিটি করপোরেশনকে করতে হবে। কিন্তু এখানে যদি কেউ এসে বলে হকার ফুটপাতে বসবে তাহলে তো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

সবশেষ গত জুলাইতে এক সভায় শহর ও বন্দর আসনের এমপি সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি একটি অনুষ্ঠান থেকে সিটি মেয়রের কাছে অনুরোধ রেখে ছিলাম যাতে করে ফুটপাতের ভাসমান দোকানদারদের ঈদ পর্যন্ত বসার সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের কাছে অনুরোধ করেছিলাম যাতে করে এই সুযোগে তারা যত্রতত্র দোকানপাট বসাতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখার জন্য। আমি সিটি মেয়র, ডিসি এবং এসপির কাছে অনুরোধ করবো ঈদের ছুটির পর যাতে করে তাদের ফুটপাতে আর না দেখা যায়, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সড়ক চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত সড়কে যাতে করে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলার কোন প্রকার সমস্যা সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করার অনুরোধ জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে আমরা পরবর্তীতে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার একত্রে বসে হকারদের কিভাবে সহযোগীতা করা যায় আলোচনার মাধ্যমে সেটি সমাধানের চেষ্টা করবো।

জুলাইতে ফুটপাতে বসার দাবিতে বিক্ষোভের পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে নারায়ণগঞ্জ শহরের হকাররা। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা। তখন জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, মেয়র তো আপনাদের জন্য ব্যবস্থা করেছিল একবার সেই ২০০৮ সালে। কিন্তু এখন তো আপনারা পায়ে চলা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করতে পারেন না। আপনারা আপনাদের সমস্যাগুলো নিয়ে মেয়র আইভীর সাথে আরেকবার আলোচনা করেন।

এর আগে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারিও মেয়র আইভীর সঙ্গে বসে হকার সমস্যা সামাধান করবেন ঘোষণা দেন সেলিম ওসমান। এ সময়ের পরও একাধিক বার হকারদের আন্দোলনের সময় তিনি সমাধানের জন্য বসবেন বলেছিলেন।

জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালের ১৬ জানুারি এই সড়কেই লঙ্কাকান্ড ঘটেছিল। সেদিন ‘হকারমুক্ত ফুটপাত চাই’ স্লোগানে চাষাঢ়ার দিকে পদযাত্রা নিয়ে এগিয়ে আসার সময় সায়াম প্লাজার সামনে চতুর দিক থেকে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর উপর বৃষ্টির মতো বর্ষিত হতে থাকে ইটপাটকেল। মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় চাষাঢ়া ও এর আশপাশের এলাকা। তখন মেয়র আইভীকে বাঁচাতে মানবঢাল তৈরী করে সমর্থক ও নেতাকর্মীরা।

হকার সহ আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর সমর্থকদের মধ্যে তৈরী হয় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ। পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সেক্রেটারি শরীফউদ্দিন সবুজ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের শহরের সভাপতি জুয়েল হোসেন সহ অন্তত অর্ধশত আহত হয়েছিলেন।

সম্প্রতি আবারো আটঘাট বেঁধে ফুটপাত হকার মুক্ত করার অভিযানে নামে পুলিশ। প্রতিদিন টহল দেয়া শুরু পুলিশের টিম। যে কারণে আবারো ফুটপাত হকার মুক্ত হতে থাকে। তবে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে এখনো কৌশলে ফুটপাতে বসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হকাররা। এখনো সেই অবস্থাতেই চলছে বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতের অবস্থা। দেখার বিষয় আগামীতে কি হয়।

প্রসঙ্গত হকার ইস্যু’র শুরুটা নাকি বহু পূর্বেই। সেই সত্তুরের দশকে। পৌরপিতা আলী আহাম্মদ চুনকার আমলে। তিনি পৌরসভা চেয়ারম্যান। শহরে কিছু হকার ছিল। তারা এলোমেলোভাবে ব্যবসা করতো। ২নং রেলগেইট তথা ডায়মন্ড চত্বরেই ছিল হকারদের মিলন মেলা। পৌরপিতা হকারদের পুনর্বাসন করে মার্কেট নির্মাণ করে দিয়ে ছিলেন। কোথায় সেই প্রথম হকার্স মার্কেট ? থানা পুকুর পাড়ে। তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পাশেই ছিল বিরাট পুকুর। স্বচ্ছ জলের পুকুরে একটি ঘাটলা  ছিল। থানার পাশে বলে পুকুরের নামকরণ হয়েছিল ‘থানা পুকুর’। এলাকাটাকে এখনো বলা হয় ‘থানা পুকুর পাড়’। এই পুকুর ভরাট করেই শহরে প্রথম হকার মার্কেট তৈরী করে দেয়া হয়। এখানে হকাররা দোকান বরাদ্ধ পায়। আজকে সেই মার্কেটকে হোসিয়ারী মার্কেট বলেই সকলে চিনেন ও জানেন। সত্তর ও আশির দশক থেকেই শহরবাসী হকারদের যন্ত্রণা একেবারেই পছন্দ করতোনা।

জানা গেছে, বর্তমানে চলছে ২০২০ সাল। নারায়ণগঞ্জ এখন সিটি কর্পোরেশন। এখনো শহরে হকারদের যন্ত্রণা। খোদ সিটি মেয়র ও শহরের আপামর জনসাধারণ ‘হকার’ শব্দটি শুনলেই রাগে তেতে উঠে। কেউ হকার  দেখতে চায় না। তবে অনেকেই হকারদের কাছ থেকে কম দামে জিনিসপত্র কিনতে আগ্রহী।

গলাচিপা এলাকার কয়েকজন প্রবীণ লোক বলেন, হকারদের জন্য ওদের এতই দরদ যে ওরা হকারদের পক্ষ নিয়ে মেয়রের উপর হামলা চালিয়ে ছিলেন মেয়রকে হকারদের কাছে গণশত্রু বানিয়ে। ওরা মেয়রকে হকারদের কাছে গণশত্রু বানিয়েছে। হকাররা এখন মেয়রকে গণশত্রুই ঠাহর করে। হকাররা দেখতে চায় এই শহরে এতবড় জাদরেল নেতা তাদের পক্ষে থাকার পরও কারা বা কোন কোন পক্ষ হকার দেখতে চায় না।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও