জিউস পুকরের জরিপ শুরু

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৪ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০২০ রবিবার

জিউস পুকরের জরিপ শুরু

জিউস পুকুর এর জরিপ কাজ শীঘ্রই শুরু হবে। দেওভোগ এলাকাবাসীর জোরালো দাবি উঠেছে। জিউস পুকুর এর জায়গা কতটুকু। দৈর্ঘ্যে কত, প্রস্থে কত ? চৌহদ্দি কতটুকু ? জিউস পুকুরের আদি মালিকানা কার বা কাদের ? এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই সরকারি জরীপ কাজ শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এতগুলি প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানা দরকার। জনগণ জানতে পারলে জিউস পুকুর নিয়ে রাজনীতির নোংরা খেলা বন্ধ হবে।

স্থানীয় লোকজনের সাথে আলাপকালে তারা জানায়, নারায়ণগঞ্জের গোড়াপত্তনের সাথে দেওভোগ লক্ষ্মী নারায়ণ আখড়ার ঐতিহ্যও জড়িয়ে আছে। এই আখড়ায় ছিল সকল রথি-মহারথিদের মিলন মেলা।

ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, ১৭৬৬ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা ভিখন লাল পান্ডে (বেল্লুর ঠাকুর বা লক্ষীনারায়ণ ঠাকুর নামে ও পরিচিত) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিকট থেকে এ অঞ্চলের মালিকানা গ্রহণ করেন। তিনি প্রভু নারায়ণের সেবার ব্যয়ভার বহনের জন্য একটি দলিলের মাধ্যমে শীতলক্ষা নদীর তীরে অবস্থিত মার্কেটকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। তাই পরবর্তীকালে এ স্থানের নাম হয় নারায়ণগঞ্জ। তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের প্রধান তীর্থস্থান ছিল দেওভোগ লক্ষ্মীনারায়ণ আখড়া। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ নামের কোনো নগরীর অস্তিত্ব প্রাচীন বাংলার মানচিত্রে পাওয়া যায় না।

মোগল আমলেরও পূর্বে খিজিরপুর, কদমরসুল ও মদনগঞ্জ বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক নদীবন্দর ছিল। পলাশী যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর কাছে বাংলার শেষ নবাবের পরাজয়ের পর পর ইংরেজরা দল বেঁধে এ অঞ্চলে আসতে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্যের আশায়। সে সময় এ অঞ্চল পাট, লবণ ও বিভিন্ন ধরনের খাবার মসলার জন্য বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। দেওভোগ লক্ষ্মীনারায়ণ আখড়া ছিল বড় আখড়া। দূর-দূরান্ত থেকে কোন মুসাফির নারায়ণগঞ্জে এলে এই আখড়াইতেই রাত্রিযাপন করতে পারতেন ও আহার জুটতো। শুরুতে এই প্রথা ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি। অনেক বছর পর্যন্ত এই রেওয়াজ চালু ছিল বলে জানা যায়। তখন লক্ষ্মী নারায়ণ আখড়া পর্যন্ত নৌকা আসতো বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।

রাজধানী ঢাকা ও সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে (শীতলক্ষ্যার পশ্চিমপাড়) সড়ক ও জল পথের সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কোম্পানির লোকেরা শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম সড়কে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। একের পর এক নি¤œ জলাভূমি ভরাট করে গড়ে তোলে ঘরবাড়ি। আখড়ার চারপাশে বেশ কয়েকটি পুকুর ছিল। আশির দশকেও কমপক্ষে চারটি পুকুর দেখা গেছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, পলাশী যুদ্ধে যেসব ব্যক্তি ইংরেজদের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিল তাদের প্রত্যেককে ইংরেজ সরকার পুরস্কৃত করে। এই সুবাদে বাংলা ১১৭৩ সালে ভীখন লাল ঠাকুর ওরফে লক্ষ্মী নারায়ণ ঠাকুর কোম্পানির নবাব মোজাফফর জঙ্গের (মহম্মদ রেজা খান) কাছ থেকে একটি দলিলের মাধ্যমে এই অঞ্চলের ভোগস্বত্ব লাভ করেন। লক্ষ্মী নারায়ণ ঠাকুরের নামে উৎসর্গকৃত বলে এই অঞ্চলের নাম খিজিরপুর বদলে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয় নারায়ণগঞ্জ।

নরসিংদীর টোকবর্গী থেকে মুন্সীগঞ্জের মোহনা পর্যন্ত দীর্ঘ ৬৫ মাইল শীতলক্ষ্যা নদী নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। ইংল্যান্ডের টেমস নদীর পর পৃথিবীর দ্বিতীয় ‘হারবার’ বেষ্টিত শান্ত নদী শীতলক্ষ্যা। এক সময় ইংল্যান্ডের ওষুধ কোম্পানিগুলো ওষুধ তৈরির কাজে এই নদীর স্বচ্ছ সুশীতল পানি ব্যবহার করতো। কোম্পানি এ অঞ্চলকে আধুনিক শিল্প বাণিজ্যিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর লক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড় কদমরসুল, বন্দর ও মদনগঞ্জ এবং পশ্চিম পাড়ের মোট ৪.৫ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা ঘোষণা দেয়া হয়। প্রথম পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মি. এইচটি ইউলসন।

১৮৬৬ সালে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের সঙ্গে ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা শুরু হয়। এ সময় রানারের মাধ্যমে ডাক সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। ডাক বিভাগের শাখা ছিল বরপা, হরিহরপাড়া, নবীগঞ্জ, কাইকারটেক, শীতলক্ষ্যা, টানবাজার ও সোনারগাঁয়ের পানাম নগরীতে। ইংরেজরা তাদের নিজেদের ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করার জন্য ব্যক্তিগত এক্সচেঞ্জ বসিয়ে ১৮৭৭ সালে টেলিফোন সার্ভিস চালু করেন।

ইংরেজরা তাদের একচেটিয়া বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বণিকদের উৎসাহিত করতে নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরকে ১৮৮০ সালে ফ্রিপোর্ট ঘোষণা দেয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নারায়ণগঞ্জের আগমনের পর পর উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী নদী পথে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সমুদ্র পথের চট্টগ্রাম বন্দর, কলকাতাসহ বিভিন্ন নদী পথে নৌ-পরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়। তখন কলকাতা ও আসাম থেকে যাত্রী এবং মালামাল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরে স্টিমার ভিড়তো। এ সময় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থান ভ্রমণের একমাত্র পথ ছিল নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। এ জন্য নারায়ণগঞ্জকে বাংলা ভ্রমণের প্রবেশদ্বার বলা হতো।

যাত্রী সাধারণের সুবিধার দিকে নজর দিয়ে ও মালামাল পরিবহন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন সার্ভিস চালু হয়। সব মেইল ট্রেন এই নারায়ণগঞ্জ থেকেই ছেড়ে যেত। ফলে ভারতবর্ষের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বন্দর নগরীর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। স্থল পথ, জল পথ ও টেলিযোগাযোগের সুব্যবস্থার কারণে বিশ্ব বাণিজ্য বাজারে স্থান করে নেয়।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নারায়ণগঞ্জের গোড়াপত্তনের সাথে দেওভোগ লক্ষ্মীনারায়ণ আখড়ার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের পাতায়। এত পূরণো ঐতিহ্যের অধিকারী এই আখড়ার অন্যতম অংশ হিসেবে জিউস পুকুরেরও নামডাক কম নয়। সেই ঐতিহাসিক পুকুর নিয়ে এই টানা হেঁচড়া কেনো। ঐতিহ্যবাহী একটি পুকুর দখল করার মানসিকতাসম্পন্ন লোক যদি শহরে থাকে তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে। তাই দ্রুত সরকারি জরিপ করলেই আসল রহস্য জানাযাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরীপ শেষ করে যেন পুকুরের চারপাশে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন। তাতে লেখা থাকবে জিউস পুকুরের প্রকৃত মালিকানা কার বা কাদের। নাকি এটা দেবোত্তর সম্পত্তি তাও লেখা থকবে। দেয়া থাকবে দাগ, খতিয়ান নাম্বার। এরপর কেউ যাতে মালিকানার বিতর্ক তৈরীর সুযোগ না পায়।

এদিকে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী তার পরিবার স্বজনদের বিরুদ্ধে দেওভোগের জিউস পুকুর সহ লক্ষীনারায়ণগ জিউর মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন জেলার সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।

১১ নভেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন শেষে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ এবং জেলা ও মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে এ স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ নগরী স্থাপনের সময়কালে শ্রী বিকন লাল ঠাকুর শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকায় আমাদের উপাস্য দেবতা লক্ষীনারায়ণের নাম শ্রী শ্রী রাজা লক্ষীনারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দির নামে একটি মন্দির স্থাপন করেন।

শত শত বছর ধরে এই মন্দিরটি নারায়ণগঞ্জের লাখো লাখো হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্য একটি পবিত্রতা ও শুদ্ধতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। প্রয়াত বিকন লাল ঠাকুর মন্দিরটির পাশেই পূজা-অর্চনা ও আশপাশের অধিবাসীদের সুবিধার্থে ৩৬৭ শতাংশ জায়গা নিয়ে একটি পুকুর খনন করায় যা স্থানীয়দের কাছে জিউশ পুকুর নামে পরিচিত।
শত শত বছর ধরে এই পুকুরটি হিন্দু ধর্মালম্বীরা যেমন পূজা-অর্চনা করছেন ঠিক তেমনি মুসলিম ভাই-বোনেরাও নিজেদের প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করে আসছেন, যা অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অবিস্মরণীয় নিদর্শন। মন্দির ও উক্ত জিউশ পুকুর মিলিয়ে উক্ত বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তিটি মন্দিরের সেবাতে ও মন্দির কমিটির পক্ষ থেকেই দেখভাল করা হচ্ছে শত বছর ধরে।

ভূমি জরিপের সিএস (ব্রিটিশ) পর্চায় এই বিশাল সম্পত্তিটি (মন্দির ও পুকুরসহ মোট আয়তন প্রায় ৪ একর) দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবেই রেকর্ডভুক্ত হয়। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পর এই বিশাল দেবোত্তর সম্পত্তিটি বিশেষ করে পুকুরটি দখল করে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে একটি স্থানীয় চক্র। বিভিন্ন সময় জাল নকল দলিল করে তারা দখলের চেষ্টাও করে। বিশেষ করে ২০০১ সালের পর বিএনপি জামাত জোট আমলে এই দখলের আগ্রাসন বেড়ে যায় শত গুণ।

সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমল থেকে দেবোত্তর এই সম্পত্তি গিলে খেতে যার পরিবার ওৎপ্রোতভাবে জড়িত তিনি আর কেউ নন আপনার দলেরই মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর পরিবার। যেসকল নকল দলিল করে এই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে সেইসব দলিলেই মেয়র আইভীর মা, দুই ভাইসহ তারই আত্মীয় স্বজনের নাম রয়েছে।
১১ নভেম্বর বুধবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন শেষে ডা. সেলিনা হায়াত আইভী তার পরিবার স্বজনদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দেন জেলার সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা। মানববন্ধনে বক্তব্য ও প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে এ ঘটনায় আইভী ও তার পরিবারকে পুরোপুরি দোষারোপ করা হয়।
এর প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিন হায়াৎ আইভী সময়ের নারায়ণগঞ্জকে দেওয়া প্রতিক্রিয়াতে বলেন, ‘জিউস পুকুরের সঙ্গে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। একজন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা এখানে নাই। আমার বাবা আলী আহম্মদ চুনকারও ছিল না। এ জায়গা যদি ক্রয় করে থাকে আমার নানা মাহাতাব উদ্দিন সাহেব। ওনার ক্রয়কৃত সম্পত্তি থেকে যদি তার ছেলে মেয়েরা ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাহলে কি অপরাধ আমার। এটা কখন কিনেছে মাহাতাব সাহেব এবং ও জামির আহমেদ? এটা খতিয়ে দেখা উচিত। যদি এটা ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালে ক্রয় করে থাকে তাহলে আজকে ৩৯ বছর পর এসে কেন এ প্রশ্ন করা হচ্ছে। তাহলে কোথায় ছিল সমাজপতিরা, হিন্দু সম্পত্তি রক্ষার্থে?


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও