রেহাই নাই নরঘাতকের

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:০১ পিএম, ১৬ নভেম্বর ২০২০ সোমবার

রেহাই নাই নরঘাতকের

সাত খুন মামলার ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী নূর হোসেনের রেহাই নাই। সাত খুন ছাড়াও এবার তার ঘাড়ে আরো কয়েকটি দুর্নীতি মামলার খড়গ রয়েছে। ২৩ বছর আগের একটি দুর্নীতি মামলায় এবার তিনি ফেঁসে যাচ্ছেন।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের মামলায় নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আনিসুর রহমানের আদালতে হাজির হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেন। ১১ নভেম্বর বুধবার চার্জ গঠনের শুনানীর পূর্বনির্ধারিত দিন ধার্য থাকায় নুর হোসেনকে আদালতে হাজির করানো হয়। পরে নূর হোসেনের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা আদালতে সময় প্রার্থনা করলে আদালত আগামী ৬ জানুয়ারী শুনানীর দিন ধার্য করেন।

এর আগে সকালে কড়া নিরাপত্তায় কাশিমপুর কারাগার থেকে নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ আনা হয়।

এ বিষয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, দুদকের মামলায় ৪০৯/৪২০ ও দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার মামলায় নুর হোসেন আদালতে হাজির হয়েছিলেন। এটা পুরানো মামলা। এই মামলায় নুর হোসেনকে খালাস দেয়া হয়েছিল। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি পুনউজ্জীবীত করে চার্জের জন্য শুনানীর দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল।

যার প্রেক্ষিতে আসামীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা দরখাস্ত দিয়ে বলেছেন মামলাটি বহু দিনের পুরানো মামলা হওয়ায় আমাদের ধারণা বাহিরে। আমাদের কাগজপত্র লাগবে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সময় দিয়ে আগামী ৬ জানুয়ারী শুনানীর দিন ধার্য করেছেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শুনানীর জন্য প্রস্তুত ছিল। দুদকের পিপি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আমি তাকে সহযোগিতা করেছি।

নথি থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে নূর হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকা কালে পরিষদের অনুকূলে প্রাপ্ত ভূমি উন্নয়ন করের এক শতাংশ অর্থ বরাদ্দের পাঁচ লাখ টাকা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আত্মসাৎ করেন। ২০০২ সালের ২৮ নভেম্বরে বিষয়টি তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ জেলা দুর্নীতি দমন ব্যুরোর তদন্তে প্রমাণিত হলে পরিদর্শক ঋত্বিক সাহা নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত শেষ করে ২০১১ সালের ১৯ জুলাই দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল হোসেন অভিযোগপত্র দাখিল করেন। কিন্তু মামলাটি দেরিতে হওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জের বিশেষ জজ আদালত ২০১৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আসামিকে অব্যাহতি দেন। তার অব্যাহতি আদেশের বিরুদ্ধে দুদক ২০১৫ সালের ২৩এপ্রিল হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন করেছিলেন।

এর আগে ২০১৬ সালের ১ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক (বর্তমানে পরিচালক) মো. জুলফিকার আলী। তিনি ও সহকারী পরিচালক শফি উল্লাহ মামলার তদন্ত করেন। ওই মামলায় একইদিন নূর হোসেনের স্ত্রী রুমা আক্তারকে (৪০) গ্রেফতার করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি টিম।

দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, নূর হোসেনের ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬৯ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। কিন্তু মাত্র ১ কোটি ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬ টাকার উৎস পাওয়া যায়। অর্থাৎ তিনি ২ কোটি ৮১ লাখ ১১ হাজার ৮১৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া ২ কোটি ৪৫ লাখ ৪ হাজার ১৭২ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।

নূর হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে ২০১৪ সালের ১৯ মে অনুসন্ধান শুরু করার পর নূর হোসেনের নামে-বেনামে প্রায় ৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পায় দুদক। ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর তার যাবতীয় সম্পদ বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেয় সংস্থাটি। পরে ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার-২ এর জেল সুপারের মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী দাখিল করে নূর হোসেন। তবে তার দাখিলকৃত ওই সম্পদ বিবরণীতে মাত্র এক কোটি ৭৮ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব দেখানো হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী দুদকের উপ-পরিচালক মো. জুলফিকার আলী ও সহকারী পরিচালক শফিউল্লাহ এর নেতৃত্বে একটি টিম নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে নূর হোসেন, তার স্ত্রী ও পরিবারের লোকজনদের সম্পদের খোঁজ খবর নেন। তারা সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে নূর হোসেনের মালিকানাধীন বাড়ি, নূর হোসেনের মালিকানাধীন হাজী বদরউদ্দিন মার্কেট, শিমরাইল টেকপাড়ার নূর হোসেনের বাড়ি, নয়াআটির রসুলবাগের নূর হোসেনের স্ত্রীর নামে করা বাড়ি, মুক্তিনগর কিসমত মার্কেট এলাকায় তার বড় ভাই নূর ছালামের বাড়ি, রসুলবাগ এলাকায় তার ছোট ভাই বিএনপি নেতা মিয়া মোহাম্মদ নূর উদ্দিনের বাড়ি ও নূর হোসেনের মালিকাধীন পরিত্যক্তভাবে পড়ে থাকা এবিএস পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন সম্পত্তি পরিদর্শন করেন। তবে ওই সময় নূর হোসেনের ছোট ভাই বালু সন্ত্রাসী নুরুজ্জামান জজের নামে করা ৬ তলা বাড়িতে দুদকের টিমকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। দুদকের টিম দেখে বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী মূল ফটকে তালা বদ্ধ করে দেয়। এরপর ২০১৬ সালের ৯ মার্চ নূর হোসেনের স্ত্রী রুমা হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। পরে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৬ সালের ১ আগস্ট রাজধানীর রমনা থানায় নূর হোসেন ও তার স্ত্রী রুমা আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওই মামলার প্রেক্ষিতেই রুমা আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়।

দুদক ওই বছরের ২৯ মে তাঁর সম্পদের অনুসন্ধানে নামলেও পরে এই কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ভারত থেকে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর দুদকের অনুসন্ধানেও গতি আসে। তারই ধারাবাহিকতায় উপপরিচালক জুলফিকার আলী অনুসন্ধান শেষে মামলা করেন নূর হোসেন ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও