বিচারের পথে ৩৪ মৃত্যু

শাহরিয়ার অর্ক : || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৮ পিএম, ১ জানুয়ারি ২০২১ শুক্রবার

বিচারের পথে ৩৪ মৃত্যু

নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার পশ্চিম তল্লায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৩৪ জনের মৃত্যু ও আরো তিনজন দগ্ধের ঘটনায় বিচার শুরু হতে যাচ্ছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর মসজিদে বিস্ফোরণের প্রায় সাড়ে ৩মাস পর ৩১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে সিআইডি ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার চার্জশীট নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শকের কাছে হস্তান্তর করেন। আগামী ৩ জানুয়ারী চার্জশীট আদালতে জমা দেওয়া হবে। আগামী ২৭ জানুয়ারী এ চার্জশীট সংক্রান্ত শুনানী হবে। মসজিদ কমিটির সভাপতি সহ ২৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসাদুজ্জামান জানান, বিকেলে সিআইডি কর্মকর্তারা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর ওই চার্জশীট জমা দিয়েছেন। ১৫ পাতার চার্জশীটে ২৭ টি আলামাত দেখানো হয়েছে। সাক্ষী করা হয়েছে ১২২ জনকে।

আসাদুজ্জামান আরো বলেন, মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারকৃত তিতাসের ৮ কর্মকর্তা কর্মচারীর দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পেলেও সরকারী অনুমতি তাদেরকে অভিযুক্ত করে সম্পূরক চার্জশীট প্রদান করা হবে।

যে ২৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে ২৬ জন মসজিদ কমিটিতে সম্পৃক্ত। বাকি দুইজন স্থানীয় বিদ্যুৎ মিস্ত্রি ও একজন ডিপিডিসির মিটার রিডার।

যারা অভিযুক্ত
চার্জশীটে অভিযুক্ত মসজিদ কমিটির ২৬ জন হলেন সভাপতি আব্দুল গফুর, সিনিয়র সহ সভাপতি মো. সামসুদ্দিন সরদার, সহ সভাপতি মো. শামসু সরদার, মো. শওকত আলী, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. অসিমউদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল, উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক মো. নাঈম সরদার, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তানভীর আহমেদ, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আল আমিন, দপ্তর সম্পাদক মো. আলমগীর সিকদার, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা মো. আল আমিন, প্রচার সম্পাদক মো. সিরাজ হাওলাদার, কার্যকরী সদস্য মো. নেওয়াজ মিয়া, মো. নাজির হোসেন, মো. আবুল কাশেম, মো. আব্দুল মালেক, মো. মনিরুল, মো. স্বপন মিয়া, মো. আসলাম আলী, মো. আলী আজম (মিল্কী), মো. কাইয়ুম, মামুন মিয়া, মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. বশির আহমেদ হৃদয়, মো. রিমেল।

অপর তিনজন হলেন আরিফুর রহমান, মোবারক হোসেন ও রায়হানুল ইসলাম। এর মধ্যে আরিফুর রহমান ডিপিডিসি নারায়ণগঞ্জ পূর্ব অঞ্চলের মিটার রিডার, রায়হানুল ও মোবারক হোসেন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি। তাদের মধ্যে মোবারক হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়ছেন।

যারা মারা গেলেন
মসজিদের বিস্ফোরণের ঘটনায় সবশেষ ২২ সেপ্টেম্বর দগ্ধ মোহাম্মদ সিফাত (১৮) এর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোরে মারা যান অগ্নিদগ্ধ আব্দুল আজিজ (৪০), ময়মনসিংহের ত্রিশালের আব্দুর রহমানের ছেলে ফরিদ (৫৫) মারা যান।

১০ সেপ্টেম্বর সকালে আবদুস সাত্তার (৪০) মারা যান। বিকালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শেখ ফরিদ (২১)।

এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থেকে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারী আবদুল হান্নান (৫০) নামে মারা যান।

এর আগে মৃতদের মধ্যে রয়েছেন ইমরান (৩০), আবুল বাশার (৫১), মোহাম্মদ আলী মাস্টার (৫৫), শামীম হাসান (৪৫), স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ নাদিম (৪৫), তল্লার বাসিন্দা নূর উদ্দিনের বড় ছেলে নারায়ণগঞ্জ কলেজের ছাত্র সাব্বির (২১) ও মেজো ছেলে তোলারাম ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র জোবায়ের (১৮), জুলহাস উদ্দিন (৩০), পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদের ইমাম আবদুল মালেক নেসারি (৪৮), মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও তার ছেলে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের বাসিন্দা জুনায়েদ হোসেন (১৬), মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হাটবুকদিয়া গ্রামের কুদ্দুস বেপারী (৭২), চাঁদপুর সদর উপজেলার করিম মিজির ছেলে মোস্তফা কামাল (৩৪), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পোশাক শ্রমিক জুলহাস ফরাজীর ছেলে জুবায়ের ফরাজী (৭), পটুয়াখালীর গলাচিপার আবদুল খালেক হাওলাদারের ছেলে পোশাক শ্রমিক মো. রাশেদ (৩০), পশ্চিম তল্লার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির (৭২), পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার কাউখালী গ্রামের জামাল আবেদিন (৪০), পোশাক শ্রমিক ইব্রাহিম বিশ্বাস (৪৩), নারায়ণগঞ্জ কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী রিফাত (১৮), চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইন উদ্দিন (১২), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মো. জয়নাল (৩৮), লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তালুকপলাশী গ্রামের মেহের আলীর ছেলে পোশাক শ্রমিক মো. নয়ন (২৭), ফতুল্লার ওয়ার্কশপের শ্রমিক কাঞ্চন হাওলাদার (৫০), শ্রমিক মো. রাসেল (৩৪), বাহার উদ্দিন (৫৫), নিজাম ওরফে মিজান (৪০)।

দগ্ধ যারা
পটুয়াখালীর চুন্নু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ কেনান (২৪), নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসিরহাট গ্রামের আবদুল আহাদের ছেলে আমজাদ (৩৭)।

আহতরা সবাই বিভিন্ন জেলার হলেও তারা শিল্প নগরী নারায়ণগঞ্জে থাকতেন। এদের প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। নিহত ও আহতরা সবাই তল্লা চামারবাড়ি বাইতুস সালাত জামে মসজিদের আশেপাশের বাসিন্দা। আহত ও নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে পুরো তল্লা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘরে ঘরে বইছে শোকের মাতম আর কান্নার রোল। কে কাকে সান্তনা দেবেন সেই ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। স্বাধীনতার পর একসঙ্গে এতো মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম দেখলো তল্লাবাসী। লাশের ভারে রীতিমত স্তব্দ তল্লা যার প্রভাব পুরো নারায়ণগঞ্জে।

৪ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিমতল্লা এলাকার বাইতুস সালাত জামে মসজিদের এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতরে থাকা প্রায় ৪০ জনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে দগ্ধ অবস্থায় ৩৭ জনকে জাতীয় শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে মামুন নামের একজন ছাড়া পান।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও