ভয়ংকর খুনিরা ৫ মাসেও অধরা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২০ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২১ শুক্রবার

ভয়ংকর খুনিরা ৫ মাসেও অধরা

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় দুই স্কুল ছাত্রকে হত্যার ঘটনায় ২৪জনকে আসামী করে আদালতে চার্জশীট দেয়া হলেও অধরা রয়ে গেছে ভয়ংকর সন্ত্রাসী খুনি শাকিল ও শামীম গ্যাংয়ের সদস্যরা। দীর্ঘ ৫ মাসেও এই ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ প্রশাসন। এই ভয়ংকর খুনিরা এখন কোথায় কিভাবে আছে; এখনো কি পালিয়ে বেড়াচ্ছে নাকি স্থান পরিবর্তন করে সন্ত্রাসীপনা অব্যাহত রেখেছে তা যেন সকলেরই অজানা। এতে ভয় যেন থেকেই যাচ্ছে। কে জানে এই খুনিদের হাতে কার মায়ের বুক খালি হবে জিসান মিহাদের মত। এই আশঙ্কার সাথে নিহতদের বিচারের দাবিতে স্বজনদের বোবা কান্না থামছেনা। আর খুনিদের অধরা থাকার ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনকে দায়ী করছেন মামলার বাদী ও নিহত জিসানের বাবা কাজিমউদ্দিন।

প্রসঙ্গত, ১০ আগস্ট বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে বন্দরের ইস্পাহানী ঘাট এলাকার বিকেলে কাজিমউদ্দিনের ছেলে জিসান (১৫) ও নাজিমউদ্দিন খানের ছেলে মিনহাজুল ইসলাম মিহাদ (১৮) নিখোঁজ হয়। রাতেই তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। রাতেই নিহত জিসানের বাবা বন্দর প্রেস ক্লাবের সাবেক সেক্রেটারী কাজিমউদ্দিন বাদী হয়ে গ্রেপ্তারকৃত ৬ আসামী সহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ৮ জনকে আসামী করে বন্দর থানায় মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তার এজাহারভুক্ত ৬ জন হলো আলভি (২০), মোকতার হোসেন (৫৭), আহমদ আলী (৪৫), কাশেম (২০), আনোয়ার হোসেন (৪৫), শিপলু (২৩)। পরবর্তীতে গত ২৮ আগস্ট দেলোয়ার হোসেন ওরফে বাবুকে গ্রেফতার করা হয়।

এদিকে মামলাটি প্রথমে বন্দর থানা তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটি ডিবিতে বদলী করা হয়। ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক ফকির হাসানুজ্জামান তদন্ত করেন। গত ৫ জানুয়ারী তিনি আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন।

এতে ৮ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তারা হলেন মোক্তার হোসেন, আলী আহাম্মদ, কাশেম, কাউসার, আনোয়ার হোসেন, শিপলু, মনির হোসেন, জাকির হোসেন।

মামলায় ২৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলো আলভী, বড় শামীম, ছোট শামীম, শাকিল, সুজন, বাবু ওরফে টিঅ্যান্ডটি বাবু, নাহিদ, দেলোয়ার হোসেন বাবু, রাকিব, রয়েল, জাহান, বাবু, রবিন, সাজ্জাদ, ইমন, জয়, শান্ত, সজীব, রিয়াদ, রনি, রাজন, আবু মুসা, পাপ্পু। তাদের সকলের বাড়ি বন্দর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। আসামীদের মধ্যে আলভী, দেলোয়ার হোসেন বাবু ও আবু মুসা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছেন।

চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়, ৯ আগস্ট কিছু লোক নৌকার মাঝি সুমনকে মারধর করে। কিন্তু সুমন তাদের চিনতো না। ১০ আগস্ট বন্দরে আকিজ ফ্লাওয়ার মিলের সামনে একটি দোকানে আলভীর সাথে থাকা অন্তর, অনিক, অনাবিল, প্রিন্স ওরফে সানি, শাহাদাত মুন্না, তোহা, আরসিমদের কাছে মাঝি সুমন বিচার দেয়। দুপুর দেড়টায় ইস্পানি বাজার এলাকাতে পুতুল স্টুডিওতে বিচারের সময়ে বড় শামীম, ছোট শামীম, শাকিল, সুজন, হান্নান খান, রনি, রাকিব, নাহিদ টিএন্ডটি বাবু, বাবু, রয়েল, রবিন, জয়, শান্ত, জাহান, পাপ্পু, সজ্জাদ, সজীব, রিয়াদ, আবু মুসা, ইমন, রাজন, দেলোয়ার হোসেন বাবু ছুটে আসে। তখন উভয় গ্রুপের মধ্যে বাকবিতন্ডা ঘটে। এক পর্যায়ে টিঅ্যান্ডটি বাবু নিজেই অকিলকে দুই হাত দিয়ে ঝাপটে ধরে। খবর পেয়ে বড় শামীমের সরদারের ভাগিনা নাহিদা, শাকিল, সুজন, রনি, রকিব, বাবু, রয়েল, পাপ্পু, রবিন, জয়, শান্ত, জাহান, সাজ্জাদ, সজিব, রিয়াদ, আবু মুসা, ইমন, রাজন এসে অকিলকে ধরে ইস্পানী বাজারে নিয়ে যায়। আলী তখন ছাড়ানোর চেষ্টা করলে তাকে কিল ঘুষি মারা হয়। ওই সময়ে অন্তর নিজেই শাকিলের নানা আবদুলকে আরসিমের মোবাইল দিয়ে বিষয়টি জানায়। পরবর্তীতে আবদুল বড় শামীম ও নাহিদের কাছ থেকে অকিলকে ছুটিয়ে নিয়ে আসে। বিকেল ৩টায় অন্তর, অনিক, সানি, নাজমুল, অকিল ও আরসিম আকিজ কোম্পানীর ময়দার গেটের সামনে আসলে শামীম সরদারের ভাগিনা নাহিদ সরদার দলবল নিয়ে তাদের ধাওয়া করে। ওই সময়ে আলভীর ফোন পেয়ে মিহাদ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

বিকাল সাড়ে ৪টায় বড় শামীম ও ছোট শামীম গ্রুপের লোকজন লাঠিসোটা, দা, রড নিয়ে আলভীদের ধাওয়া করে। ভয়ে তারা ইস্পানী ঘাটের দিকে দৌড়ে আসে। সেখানে আলভী, মিহাদ, জিসান, তোহা, শাহাদাত হোসেন মুন্নাকে পেটানো হয়। তারা বাঁচার জন্য ইস্পানী ঘাটের সিড়ি থেকে লাফি দেয়। প্রিন্স, তোহা, মুন্না, জিসান, মিহাদ ঘাটে ভেড়ানো একটি নৌকায় উঠে পালানোর চেষ্টা করলে আসামীরা জিসান ও মিহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ গুমের জন্য শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে যায়।

জানা গেছে, দুই শিক্ষার্থী হত্যাকান্ডের ঘটনায় সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের লিডার শাকিল ও শামীম বেশ আলোচিত চরিত্র। শাকিল ও ছোট শামীম সম্পর্কে ভাই হলেও এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে উভয় নেতৃত্ব দিয়ে বেশ আলোচনা উঠে এসেছে। এদের ব্যাপারে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ভয়ংকর গ্যাং তৈরি করে শাকিল শামীম।

স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, নিয়মিত ঝগড়া ও মারামারি নিয়ে থাকতো এই শাকিল গ্যাং। প্রায় প্রতি সপ্তাহে তাদের ঝগড়া-লড়াই করতে দেখা যায়। তবে শাকিল ও শামীমের নেতৃত্বে ইস্পাহানি বাজার এলাকার ১ নম্বর গলি সহ আশেপাশের ছেলেরা দল পাকিয়ে প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে। যেকারণে প্রায় সময় এলাকার মধ্যে নানা ইস্যু নিয়ে ঝগড়া-লড়াই হতো বলে জানাগেছে।

সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের লিডার হিসেবে শাকিলের নাম বেশি ছড়ানোর মূল কারণ হলো ভবঘুরে স্বভাবের হওয়ায় সারা দিন অবসর সময় পার করতো। এই সুযোগে শাকিল এলাকার উঠতি বয়সের ছেলেদের নিয়ে সারা দিন আড্ডাবাজি করতো। শাকিল মারামারিতে খুব পারদর্শী হওয়ার কারণে উঠতি বয়সের ছেলেরা খুব সহজে তার সান্নিধ্যে চলে আসে। আশেপাশের মহল্লাগুলোর ছেলেরা কখনো কিছু বললেই শাকিল বাহিনীর ছেলেরা মারমুখি হয়ে তাদের পিটুনি দিতো। বেশ প্রভাবশালী গ্যাংয়ে পরিণত হয়। যেকারণে শাকিল বাহিনী অন্যরা তার নেতৃত্বকে মেনে নিত।

এই গ্যাংয়ের আরেক লিডার ও শাকিলের বড় ভাই শামীম ওরফে ছোট শামীম তার ভাইয়ের মত ভবঘুরে না হলেও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ষোল আনা ভূমিকা রেখে আসছে। শামীম ইস্পাহানি ঘাটের পাশে একটি রিকশার গ্যারেজের ব্যবসা করছে। শাকিল ও শামীম দুই ভাইয়ের প্রভাবে আশেপাশের গ্যাংগুলো যেমন অতিষ্ঠ হয়ে আছে ঠিক তেমনি এলাকার লোকজনও বেশ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্যে কেউ তাদের ব্যাপারে মুখ খুলতেও অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তাদের ব্যাপারে মুখ খুললেই তার উপর নেমে আসবে নির্যাতনের খড়গ। তাদের ভয়ে তটস্থ এলাকাবাসী। কারণ ক্রমশ এই বাহিনী ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্রতি সপ্তাহে মারামারি সহ সন্ত্রাসী কর্মকা- করে বেশ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এই বাহিনী।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বন্দরের একরামপুরের ইস্পাহানি এলাকার মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী মো. সালামের ছেলে মো. শাকিল। শাকিল একরামপুর এলাকার একটি কিশোর গ্যাংয়ের লিডার। তার নেতৃত্বে ওই এলাকায় নানা অপরাধমূলক কার্যক্রম সংঘটিত হচ্ছে। শাকিলের ভাই স্থানীয় একটি গ্যারেজ মালিক মো. শামীম ভাইয়ের গ্যাং পরিচালনায় সহযোগিতায় করেন। এই দলটিকে নেপথ্যে থেকে পরিচালনা করেন যুবলীগ নেতা শামীম। শামীম ২৩নং ওয়ার্ডের যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

সূত্রটি আরও জানায়, শাকিলের নেতৃত্বে কিশোর গ্যাংটি ইস্পাহানি, একরামপুর, সিএসডি গেইট এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে বেড়ায়। এই গ্যাংয়ের সদস্যের আড্ডার স্থান হচ্ছে শাকিলের আপন ভাই শামীমের রিকশা গ্যারেজ। এইসব কিশোর সন্ত্রাসীরা এলাকায় প্রায়ই ‘ছোট ভাই বড় ভাই’ বলা নিয়ে বিভিন্ন কিশোর ও যুবক ছেলেদেরকে লাঞ্চিত ও মারপিট করে থাকে।

নিহত জিসানের বাবা ও বন্দর প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজিমউদ্দিন বলেন, পুলিশ প্রশাসনের তদন্ত কর্মকর্তা কোন চেষ্টা করেনি। তার অবহেলার কারণে এখনো আমার ছেলের খুনি সন্ত্রাসীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ যাদের নাম চার্জশীটে দিয়েছে তাদের প্রায় সবাই অধরা রয়েছে। আলভীর পরে চার্জশীটে থাকা দু একজনকে গ্রেফতার করেছে। একারণে আমার ছেলের খুনিরা এখনো বাহিরে রয়েছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও