এ অশ্রু থামার নয়

মোবাশ্বির শ্রাবন ও সোহেল রানা || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:২৯ পিএম, ৫ এপ্রিল ২০২১ সোমবার

এ অশ্রু থামার নয়

লঞ্চ ডুবির পরেই যখন বাড়িতে বসে শুনতে পায় তখনই মূর্ছা যেতে থাকে পরিবারের অনেকেই। যাঁদের জ্ঞান ছিল ছুটে আসেন শীতলক্ষ্যার তীঁরে। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে পরিবেশ। রোববার রাতে যখন বৃষ্টি তখন স্বজনদের আহাজারিতে গড়ানো চোখের পানি একাকার হয়ে যায়। কাল বৈশাখী ঝড়ের আগেই এক ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যায় পরিবার। স্বজন হারায় অনেকেই। সোমবার রাত পর্যন্ত ২৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওইসব স্বজনেরা ছুটে আসেন শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে। রোববার রাতে ৫জনের লাশ উদ্ধার হলেও তখনো নিখোঁজ ছিল অনেকেই। সোমবার সকালে তাই আলো ফোটার আগেই শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে শুধু মানুষ আর মানুষ। নদীতে কিছু ভেসে উঠতে দেখলেই ছুটে যান।

মৃত খাদিজা বেগমের মেয়ে নাজমুন নাহার বলেন, ‘মা ডাক্তার দেখাতে বরিশাল থেকে নারায়ণগঞ্জে এসেছিল। কিন্তু লকডাউনের জন্য আমাদের কারো কথা না শুনে বাড়ি যাইতেছিল। বাবা অসুস্থ বাড়িতে দেখার কেউ নেই। এখন বাবাকে কে দেখবে, বলেই তিনি কান্না শুরু করেন।

মাহিন নামের ১২ বছরের শিশু চিৎকার করে বলেন, ‘এটাই আমার বাবা আর ওইযে আমার মা। আমার বোন কই আমার বোন কই’। আমার বোনকে খোঁজে দেন।’ বলেই চিৎকার করছিল ১২ বছরের শিশু মাহিন। স্বজনেরা কোন ভাবেই তাকে শান্ত করতে পারছিল না।

মাহিন বলেন, ‘দুই বোন, মা-বাবা সহ আমরা ঢাকায় শনির আখড়া এলাকায় বসবাস করি। সাত দিনের লকডাউন তাই কাজ বন্ধ। বাবা, মা ও বোন তিনজনই নানুর বাড়ি মুন্সিগঞ্জে বেড়াতে যাচ্ছিল। লকডাউন শেষে চলে আসবে। কিন্তু কেউ আর নেই। ছোট ৭ বছরের বোনকে নিয়ে কিভাবে থাকবো, কোথায় থাকবে, কে আমাদের দেখবে, খাওয়াবে।’

এদিকে দুই বছরের একমাত্র সন্তান আজমেরীকে হারিয়ে হতবাক হয়ে মা স্বর্ণা বেগম। কান্নায় বিলাপ করছিলেন ‘আমার বুকের মানিককে নিয়া শেষ করছে। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচুম।’ শিশু সন্তানের খোঁজে তিনি নদীতে ঝাঁপ দিলে স্বজনরা তাকে তুলে নিয়ে আসেন।

দুপুরে লঞ্চ উঠানোর পর শিশু আজমীরের লাশ পাওয়া যায়।’

প্রতিমা শর্মার বোন হেনা শর্মা বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসের নকল নবিস হিসেবে চাকরি করতেন আমার বোন প্রতিমা শর্মা। কখনো লঞ্চে যাতায়ত করেনি। সড়ক পথে যানজট থাকায় রোববার প্রথম লঞ্চে উঠে। কিন্তু এ যাত্রাই তার শেষ যাত্রা হয়েছে। মৃত্যুর ডেকেই তাকে লঞ্চে নিয়েছে। না হলে জীবনে যে কোন লঞ্চে উঠেনি সে কেন আজ উঠতে গেলো।’

নিহত শাহআলম মৃধার ছোট ভাই নূরে আলম বলেন, ‘ব্যবসার কাজে প্রতিদিনের বাসে ঢাকায় যাওয়া আসা করে। কিন্তু আজকে রাস্তায় যানজটের জন্য লঞ্চে ফিরছিল। জীবনে কখনো লঞ্চে যাতায়াত করেনি। আজকে যাতায়াত আজকেই মৃত্যু হল।’

মৃতদের পরিচয়
সেই ভয়াবহ লঞ্চ ডুবির ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের সকলেই মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।

সোমবার উদ্ধারকৃত মৃতরা হলেন, ‘রুনা আক্তার (২৪), সোলেমান ব্যাপারী (৬০), বেবী বেগম (৬০), সুনিতা সাহা (৪০), পখিনা বেগম (৪৫), বিথী (১৮), অরিফ (১), প্রতিমা শর্মা (৫৩), শামসুদ্দিন (৯০), রেহেনা বেগম (৬৫), হাফিজুর রহমান (২৪), তহমিনা (২০), আব্দুল্লাহ (১), নারায়ণ দাস (৬৫), পার্বতী রানী দাস (৪৫), আজমীর (২), শাহআলম মৃধা (৫৫), মহারাণী (৩৭), আনোয়ার হোসেন (৫৫), মাকসুদা বেগম (৩০), সাউদা আক্তার লতা (১৮), আব্দুল খালেক (৭০), জিবু (১৩), খাদিজা বেগম (৫০), মোহাম্মদ নয়ন (২৯), সাদিয়া আক্তার (৭), বিকাশ সাহা (২২) ও মানসুরা (৭ মাস) ও অজ্ঞাত এক নারীকে জেনারেল হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় স্বজনরা।

সেই দুর্ঘটনা
৪ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর চর সৈয়দপুর এলাকার ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। এক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে ট্যাংকার ধাক্কা দেওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই ডুবে যায় লঞ্চটি।

বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের সহকারী পরিচালক (নৌ নিট্রা) বাবু লাল বৈদ্য জানান, বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিটের দিকে প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে মুন্সিগঞ্জের উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে যায় সাবিত আল হাসান নামের লঞ্চটি। সৈয়দপুর এলাকায় শীতলক্ষ্যা ব্রীজের কাছে একটি কোস্টার ট্যাংকারের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী যা বললেন
ডুবে যাওয়া লঞ্চটি থেকে সাঁতরে তীরে ওঠা মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা শ্রমিক আলম মিয়া জানান, আমি লঞ্চের পেছনের ছাঁদে ছিলাম। হঠাৎ দেখি একটি কার্গো জাহাজ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে আমাদের লঞ্চটিকে ভাসিয়ে ব্রীজের নীচে নিয়ে আসে। পরে লঞ্চটি ডুবে যায়। আমি ছাঁদ থেকে লাফিয়ে পড়ে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হই। কিন্তু লঞ্চে প্রায় ৫০-৬০ জন যাত্রী ছিল। তদের মধ্যে ১৫-২০ জন হয়ত সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছে।

রাতেই ৫ মরদেহ উদ্ধার
রোববার দুর্ঘটনার পর রাতেই ৫নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার পর প্রচন্ড বৈরি আবহওয়া থাকাতে উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত ঘটে। রাতেই উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় ঘটনাস্থলে গেলেও স্রোত আর নানা কারণে উদ্ধার করা যায়নি।

স্বজনদের বিক্ষোভ
রোববার রাতে লঞ্চ উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হওয়াতে দফায় দফায় বিক্ষোভ করেন স্বজনেরা। কয়েক দফায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মী ও প্রশাসনের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে যান তারা। একই অবস্থা ছিল সোমবার সকালেও। তাদের অভিযোগ ছিল ইচ্ছা করে লঞ্চ উদ্ধারে কালক্ষেপন করে।

সকাল থেকে উদ্ধার
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, ‘বৈরী আবহওয়ার জন্য রোববার রাতে উদ্ধারকাজ ব্যহত হয়। যার জন্য লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সোমবার সকালে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ দুপুর ১টার দিকে লঞ্চটি উদ্ধার করে। লঞ্চের ভেতর থেকে ওই সময়ে ২২জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

শুধু কান্না আর কান্না
দুপুর ১টার দিকে লঞ্চ উঠার পর শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে স্বজনরা চিৎকার করতে থেকে। হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দুপুর আড়াইটায় লঞ্চের ভেতর থেকে বের করা লাশগুলো একেক করে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বতীরে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। পরে স্বজনরা একেক করে লাশের পরিচয় শনাক্ত করে।

২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা
নারায়ণগঞ্জ সদর নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক জানান, জেলা প্রশাসকের ঘোষণা অনুযায়ী নিহতের দাফন ও সৎকারের জন্য ২৫ হাজার টাকা সহযোগিতায় দেওয়া হয়েছে। ৩৬ জন নিখোঁজের অভিযোগ পেয়েছি। যার মধ্যে ২৯জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফলে এখনও ৭জন নিখোঁজ রয়েছে। এখনও কয়েকজন নিখোঁজ আছে স্বজনরা দাবি করছেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা ট্রলার দিয়ে আশে পাশেও খোঁজ করবো। এছাড়াও মাইকিং করা হবে যদি কেউ কোন লাশের সন্ধান পায় তাহলে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য।

এদিকে লঞ্চ ডুবির ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মৃণাল কান্তি দাস, বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) জসিম উদ্দিন, নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও