সংকীর্ণ নৌপথ, শীতলক্ষ্যা ব্রীজ নির্মাণে ধীরগতি দায়ী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৭ পিএম, ৬ এপ্রিল ২০২১ মঙ্গলবার

সংকীর্ণ নৌপথ, শীতলক্ষ্যা ব্রীজ নির্মাণে ধীরগতি দায়ী

নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যার নৌরুট ক্রমশ সংকীর্ন হয়ে পড়েছিণ। একদিকে চলছে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী মহল কর্তৃক নদী দখল ও ভরাটের মহোৎসব। অপরদিকে এলোপাথারি জাহাজ বার্থিংয়ের (নোঙর) কারনে বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে নৌরুটটি। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছিল হাজার হাজার নৌযান। খেয়া পারাপারে নিয়োজিত থাকা অসংখ্য ইঞ্জিন চালিত ট্রলার ও নৌকাও চলছে ঝুঁকি নিয়ে। এসকল নৌযানের অধিকাংশেরই দক্ষ চালক না থাকার কারণে নদীপথে বেড়েই চলেছিল নৌ দুর্ঘটনা। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে কোস্টার ট্যাংকারের ধাক্কায় সাবিত আল হাসান নামে মুন্সিগঞ্জগামী একটি লঞ্চ অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আর এজন্য শীতলক্ষ্যা ব্রীজের নির্মাণ কাজে ধীরগতিকেও দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গত ৩ বছর ধরেই ব্রীজ নির্মাণের অজুহাতে শীতলক্ষ্যা নদীকে সংকীর্ণ করে রেখেছিল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ৬ বছর পূর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত প্রকল্পটি উদ্বোধন করলেও অদ্যাবধি শেষ হয়নি ব্রীজটির নির্মাণ কাজ। ব্রীজটির নির্মাণ কাজের জন্য শীতলক্ষ্যা নদীর ওই স্পটটি সরু হয়ে পড়ার কারণে এর আগেও একাধিকবার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছিল বলেও জানিয়েছেন নৌযান শ্রমিকরা।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সৈয়দপুর-মদনগঞ্জ তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ। এর মেয়াদ বাড়ানোসহ কিছু সংশোধনী করা হচ্ছে। ৩৫ স্প্যানবিশিষ্ট ১ হাজার ২৯০ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণে মেয়াদকাল ধরা হয়েছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। তবে সে সময়ের মধ্যে সেতুর বিশদ নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সেতুটির নকশা প্রণয়নে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। নারায়ণগঞ্জ শহরতলীর সৈয়দপুর ও বন্দরের মদনগঞ্জ পয়েন্টে তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর জন্য ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। যার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৯০ মিটার। চারটি লেনে ১৫ মিটার চড়া হবে। সেতু নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে ৬২ দাগে ৩০ জমির মালিকের ১০ দশমিক ৩ একর জায়গা ইতোমধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ওইসব জমি মালিকদের অধিগ্রহণের মূল্য হিসেবে ওই বছরের ২২ নভেম্বর ১৫ কোটি ৭৯ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬০ টাকার চেক প্রদান করেছে সরকার।

২০১০ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটি নির্মাণকাজের শেষ সময় ধরা ছিল গত বছর ডিসেম্বর পর্যন্ত। তার আগে চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাজ শেষ করার কথা গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রকল্পের উন্নয়ন সহযোগী সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের (এসএফডি) ঠিকাদারের অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে সময় বাড়ানো হয় ৩১৭ দিন। সে হিসাবে গত ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এখন বলা হচ্ছে, করোনার কারণে নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই গত ২২ সেপ্টেম্বর এসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো প্রকল্পের মেয়াদ আরও ৫৭৪ দিন বাড়ানোর আবেদন করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদারের সঙ্গে আলোচনা করে এখন আরও ৩৬৫ দিন তথা এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এরপর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড হিসেবে আরও এক বছর তথা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পরামর্শক সেবারও সংশোধন করতে হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ বাড়ানোয় পরামর্শকের চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। প্রকল্পের আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করতে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করে এখন ডিপিপি সংশোধন করা হবে। ঠিকাদারের নির্মাণকাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এক বছরের পরামর্শক খাতের জন্য ৭ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। গত মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৭১.৫৬ শতাংশ। এ নিয়ে ২৪ ডিসেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয় মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করতে হলে বাড়বে ঋণচুক্তির মেয়াদও।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শীতলক্ষ্যার ওপর ছয় লেনের সেতু হবে। সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে নারায়ণগঞ্জ জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার। তা ছাড়া নির্মাণাধীন পদ্মাসেতুর সঙ্গে বাইপাসের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কে সংযোগ স্থাপিত হবে। এমন গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ চলছে ১০ বছর। এখন আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি খরচও বাড়াতে হচ্ছে।

এদিকে দীর্ঘদিনেও সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ার কারণে শীতলক্ষ্যার ওই স্থানটিতে এর আগেও একাধিকবার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন নিরাপদ নৌপথ চাই ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার মাষ্টার। তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যার ওই সেতুটির অনেক পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। অথচ পদ্মা সেতুর যেখানে দৃশ্যমান এবং উদ্বোধনের প্রহর গুনছে সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত প্রকল্পটির এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। ব্রীজটির নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে নৌরুটটি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। আর ৪ এপ্রিলের দুর্ঘটনার জন্যও ব্রীজটির নির্মাণকাজে ধীরগতিও অনেকাংশে দায়ী বলে তিনি মনে করেন। কারণ ব্রীজটির সামনে দিয়ে জাহাজ কিংবা লঞ্চ চলাচলের সময়ে যে ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা দরকার ছিল সেগুলোর কিছুই করা হয়নি। নৌযান শ্রমিকরা সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা প্রিমিয়ার সিমেন্ট, বসুন্ধরা সিমেন্ট, সিমেক্স সিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট, বাংলাদেশ সিমেন্ট, সুপারক্রীট সিমেন্ট, মীর সিমেন্ট, সাতঘোড়া বা ইস্টার্ন সিমেন্টসহ বেশ কয়েকটি সিমেন্ট কারখানাগুলোর সামনে ক্লিংকার ও ফ্ল্যাইঅ্যাশবাহী অসংখ্য বড় আকারের জাহাজ নোঙর করে রাখে। এছাড়াও সিটি মিল, শবনাম ভেজিটেবল, রূপচাঁদা, আফতাব ফুড, পারটেক্স গ্রুপ, এসি আইসহ বড় শিল্পকারখানাগুলোর সামনে অসংখ্য বৃহদাকারের জাহাজ নৌঙ্গর করে রাখে। নিতাইগঞ্জ পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্রের সামনেও অসংখ্য পণ্যবোঝাই নৌযান বার্থিং করে রাখা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জে পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর সামনেও অনেক জাহাজ বার্থিং করে রাখা হয়। এতে করে ওই এলাকাগুলো দিয়ে দু’টি নৌযান পাশাপাশি যেতে পারেনা। জোয়ার ভাটার কারণে অনেকসময় চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়। ছোট নৌযানগুলোর অনেকগুলোতেই সার্টিফিকেটধারী চালক নেই। একদম অদক্ষ চালক দিয়েই অনেক নৌযান চলছে। প্রশিক্ষণ না থাকায় কোন দিকে হর্ণ দিতে হবেও তাও অনেকে জানেনা। এছাড়া বালুমহালের ইজারাদারের নিয়োজিত সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে অনেক বালুবাহী বাল্কহেডের চালকরা রাতে চালায়। তারা দিনের বেলায় লস্কর, বাবুর্চির হাতে স্টিয়ারিং দিয়ে ঘুমিয়ে নেয়। এতে করে দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নৌপথ সংকীর্ণ হওয়ার বিষয়ে এর আগে নিরাপদ নৌপথ চাইসহ একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গেল বছরে বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে অভিযান চালানোর পরে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। কিন্তু করোনার কারণে আবারো বিশৃঙ্খল শীতলক্ষ্যার নৌরুট।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও