শীতলক্ষ্যায় সেতুর নকশার কারণে আরও দুর্ঘটনার শঙ্কা

বাংলানিউজ হতে নেওয়া : || ১০:৫৯ পিএম, ৭ এপ্রিল ২০২১ বুধবার

শীতলক্ষ্যায় সেতুর নকশার কারণে আরও দুর্ঘটনার শঙ্কা

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে লঞ্চ ডুবির ঘটনাস্থলের কাছে সেতুর নকশার কারণে ভবিষ্যতে আরও দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।

বুধবার (৭ এপ্রিল) সচিবালয়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এসময় প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেন। ওই স্থানে সেতুর পিলার দৃষ্টিপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার সভাপতি মাহবুব উদ্দীন।

রোববার (৪ এপ্রিল) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাত্রীবাহী লঞ্চ সাবিত আল হাসান প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার পথে কয়লাঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে প্রিমিয়ার সিমেন্ট সংলগ্ন এসকে ৩ কোস্টার জাহাজের আঘাতে ডুবে যায়।

নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে মাহবুব উদ্দীন বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে সেতুর পিলার দৃষ্টিপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত যদি মাস্টার নদীর সরু চ্যানেলের কথা চিন্তা করে আগে থেকেই জাহাজটির গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন।

নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ বলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের কাছে অনাকাঙিক্ষত। প্রথম যখন সংবাদ পেলাম তখন মনে হয়েছে কাল বৈশাখী ঝড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। আজকে দুর্ঘটনার বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব উদ্দীন কিছুটা আভাস দিয়েছেন। তবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সে তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে আমাদের বক্তব্য পেশ করবো।

নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাহবুব উদ্দীন সাহেব বলেছেন, আমার কাছেও মনে হয়েছে, গতকাল আমি ছবিটি দেখেছি। এর আগে ভিডিও ক্লিপ দেখেছি। কালকে যে সেতুর ছবিটি দেখেছি, আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ত নৌ রুট এটা। নদী এমনিই ছোট হয়ে আসছে বিভিন্ন কারণে। সেখানে আরও বেশি ছোট করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেতুর পিলার দুটি স্থাপন করা হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে কথা বলেছি। মাহবুব সাহেব বলেছেন, পিলার দৃষ্টি সীমানায় বাধা হয়ে থাকতে পারে, এটা আমি জানি না। তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

খালিদ মাহমুদ আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, সেখানে পাশাপাশি পিলার দুটো থাকার কারণে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করবো আর যেন না হয়। কিন্তু আমার আশঙ্কা ভবিষ্যতে এখানে মনে হয় আরও দুর্ঘটনা হতে পারে শুধু এই নকশার কারণে। আমরা এ বিষয়ে সেতু বিভাগের সঙ্গে কথা বলবো, এটার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগে যে দুর্ঘটনা হতো কাল বৈশাখী ঝড় বা স্রোত বা নকশা বিভিন্ন কারণে, আমরা এগুলোর ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছি। এই ধরনের দুর্ঘটনা আমরা সড়কে দেখি, একটির সঙ্গে আরেকটির মুখোমুখি সংঘর্ষ। নৌপথে আমাদের পর পর দুটি দেখতে হলো। এটাও একই ধরনের ঘটনা। যেখানে ৫০ জনের মতো যাত্রী ছিল, ৩৫ জনের সলীল সমাধি হয়েছে।

এই দুর্ঘটনার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ একটি হত্যা মামলা করেছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কার্গো ভেসেলের অনুমোদন নেই বলে কথা বলা হচ্ছে, সেই ভাসমান কথার সাথে আমি যুক্ত হতে পারি না। আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়েছি সেটার নিবন্ধন থাক আর না থাক যেহেতু সেটা ধাক্কা মেরেছে সেটা যেন আইনের আওতায় আনা হয়। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কথা বলেছি, এটা যেন দ্রুত আইনের আওতায় আসে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা চেষ্টা করবো অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং তদন্ত রিপোর্ট আপনাদের সামনে নিয়ে আসবো। তদন্ত রিপোর্টের যেন যথাযথ প্রয়োগ ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় সে ব্যাপারে আমরা সদা প্রস্তুত আছি।

এদিকে দীর্ঘদিনেও সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ার কারণে শীতলক্ষ্যার ওই স্থানটিতে এর আগেও একাধিকবার দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন নিরাপদ নৌপথ চাই ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার মাষ্টার। তিনি বলেন, শীতলক্ষ্যার ওই সেতুটির অনেক পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। অথচ পদ্মা সেতুর যেখানে দৃশ্যমান এবং উদ্বোধনের প্রহর গুনছে সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত প্রকল্পটির এখনো নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। ব্রীজটির নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে নৌরুটটি সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। আর ৪ এপ্রিলের দুর্ঘটনার জন্যও ব্রীজটির নির্মাণকাজে ধীরগতিও অনেকাংশে দায়ী বলে তিনি মনে করেন। কারণ ব্রীজটির সামনে দিয়ে জাহাজ কিংবা লঞ্চ চলাচলের সময়ে যে ধরনের সচেতনতামূলক প্রচারণা দরকার ছিল সেগুলোর কিছুই করা হয়নি। নৌযান শ্রমিকরা সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা প্রিমিয়ার সিমেন্ট, বসুন্ধরা সিমেন্ট, সিমেক্স সিমেন্ট, আকিজ সিমেন্ট, বাংলাদেশ সিমেন্ট, সুপারক্রীট সিমেন্ট, মীর সিমেন্ট, সাতঘোড়া বা ইস্টার্ন সিমেন্টসহ বেশ কয়েকটি সিমেন্ট কারখানাগুলোর সামনে ক্লিংকার ও ফ্ল্যাইঅ্যাশবাহী অসংখ্য বড় আকারের জাহাজ নোঙর করে রাখে। এছাড়াও সিটি মিল, শবনাম ভেজিটেবল, রূপচাঁদা, আফতাব ফুড, পারটেক্স গ্রুপ, এসি আইসহ বড় শিল্পকারখানাগুলোর সামনে অসংখ্য বৃহদাকারের জাহাজ নৌঙ্গর করে রাখে। নিতাইগঞ্জ পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্রের সামনেও অসংখ্য পণ্যবোঝাই নৌযান বার্থিং করে রাখা হয়। সিদ্ধিরগঞ্জে পদ্মা ও মেঘনা ডিপোর সামনেও অনেক জাহাজ বার্থিং করে রাখা হয়। এতে করে ওই এলাকাগুলো দিয়ে দু’টি নৌযান পাশাপাশি যেতে পারেনা। জোয়ার ভাটার কারণে অনেকসময় চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়। ছোট নৌযানগুলোর অনেকগুলোতেই সার্টিফিকেটধারী চালক নেই। একদম অদক্ষ চালক দিয়েই অনেক নৌযান চলছে। প্রশিক্ষণ না থাকায় কোন দিকে হর্ণ দিতে হবেও তাও অনেকে জানেনা। এছাড়া বালুমহালের ইজারাদারের নিয়োজিত সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে অনেক বালুবাহী বাল্কহেডের চালকরা রাতে চালায়। তারা দিনের বেলায় লস্কর, বাবুর্চির হাতে স্টিয়ারিং দিয়ে ঘুমিয়ে নেয়। এতে করে দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নৌপথ সংকীর্ণ হওয়ার বিষয়ে এর আগে নিরাপদ নৌপথ চাইসহ একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গেল বছরে বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে অভিযান চালানোর পরে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। কিন্তু করোনার কারণে আবারো বিশৃঙ্খল শীতলক্ষ্যার নৌরুট।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও