‘ভাইয়া বাচাঁন, আঙ্কেল বাঁচান’ আর্তনাদ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০০ পিএম, ৯ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার

‘ভাইয়া বাচাঁন, আঙ্কেল বাঁচান’ আর্তনাদ

নারীরা চিৎকার করছিলো ‘ভাইয়া আমাকে বাচাঁন। শিশুরা চিৎকার করছিলো আঙ্কেল আমাকে বাঁচান।’ কিন্তু যখন আমরা সবাই তলিয়ে গেছি তখন তো আর আমার কিছুই করার ছিল না। এভাবেই লঞ্চ ডুবার সময় লঞ্চের মধ্যে থাকা চোখের পলকে নদীর গর্ভের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া মানুষগুলোর বেঁচে থাকার আর্তনাদের কথার বর্ণনা করলেন লঞ্চ ডুবির ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা জাকির হোসেন।

বৃহস্পতিবার ৮ এপ্রিল গণশুনানিতে সাক্ষী দেওয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে ওই দিনের ঘটনার বর্ননা তুলে ধরেন। সেই সাথে মুন্সিগঞ্জবাসীর জন্য উন্নয়ত যাতায়াত ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবী জানিয়েছেন জাকির হোসেন।

দুর্ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে জাকির হোসেন বলেন, ঘটনার দিন আমি ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসছি। মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চে উঠি। টার্মিনাল থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে লঞ্চটি ছেড়ে আসে। ৬টার দিকে কয়লাঘাটের এখানে আসে। লঞ্চটি এখানে আসার সাথে সাথে পেছন থেকে বিশাল বড় একটি কার্গো জাহাজ, যার কালার ছিল নিচ দিয়ে লাল এবং উপরের অংশ নীল। সেই কার্গোটি আমাদের লঞ্চের ডানপাশ দিয়ে ডুকে যায়। কিন্তু ডান পাশে ওই কার্গোটির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। ডান পাশে ছিল সেতুর পিলার। কার্গোটি সেতুর পিলারের সাথে ধাক্কা খাবে, চালক পিলার বাঁচাতে গিয়ে আমাদের লঞ্চের উপর দিয়ে উঠিয়ে দেয়। ওই ধাক্কায় আমাদের লঞ্চটি জাহাজের সাথে ঘষাঘষি খেয়ে জাহাজের সামনের মুখে পড়ে। তারপর জাহাজটি আমাদের লঞ্চটির মধ্যখান দিয়ে লঞ্চটিকে ডুবিয়ে চলে যায়। এই স্পটে যেকোন লঞ্চ বা কার্গো আসুক তাদের গতি কমিয়ে দেয়। কিন্তু ওই কার্গোটি হাইস্পিডে ছিল। সে গতি কমায়নি। নিজের গতি বজায় রেখে আমাদের লঞ্চটিকে ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দিয়ে চলে যায়।

তিনি আরো বলেন, ‘‘লঞ্চটির সাথে আমিও ডুবে যাই। লঞ্চটি নদীর তলে মাটিতে গিয়ে ঠেকে। লঞ্চটি যখন ডুবতে থাকে তখন লঞ্চে থাকা নারীরা, শিশুরা চিৎকার করে বলতে থাকে ভাইয়া আমাকে বাঁচান, আঙ্কেল আমাকে বাচাঁন। কিন্তু আমরা যখন সবাই তলিয়ে গেছি তখন তো তাদের বাঁচানোর ক্ষমতা আমাদের কারো নাই। আমি লঞ্চের কেবিন থেকে বারান্দায় আসছি। বারান্দা থেকে লঞ্চের বাইরে বের হইছি। আমি প্রায় দেড় থেকে ২ মিনিট পানির নিচে ছিলাম। লঞ্চ থেকে অবশ্যই এতোটুকু সময় লাগবে। আনুমানিক ২ মিনিট পর আমি ভেসে উঠি। ভেসে উঠে আমি নদীর পূর্ব পাড়ে চলে যাই। ওই পাড়ে আমার ছোট বোনের বাসা আসে আমি সেখানে চলে যাই। বোনের বাড়িতে গিয়ে আমি ফেসবুকে লাইভে এসে মুন্সিগঞ্জ সোসাইটি পেইজে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছি।’’

তিনি বলেন, আমার একটাই আকাঙ্খা আমাদের মুন্সিগঞ্জবাসীর জন্য সরকার উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করুক। যাতে করে আমরা নিরাপদে যাতায়াত করে স্ত্রী সন্তানের কাছে ফেরত যেতে পারি। এভাবে যদি প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে আর কিছু দিন আলোচনা হয় পরে ধামাচাপা পরে যায় এটা কোন সমাধান হলো না। আমরা এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। আমরা মুন্সিগঞ্জ শহরে যারা বসবাস করি আমাদের একমাত্র যাতায়াত পথ হচ্ছে লঞ্চঘাট। এই লঞ্চগুলো সেই ৪০-৫০ বছর আগের ভাঙাচোরা লঞ্চ। ছোট লঞ্চ যেগুলো নদীতে আসলেই কাতচিৎ হতে থাকে। এই লঞ্চগুলো অনতিবিলম্বে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে আমাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে নতুন লঞ্চের ব্যবস্থা করার দাবী জানাচ্ছি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জের সাথে আলাপ কালে জাকির হোসেন আরো জানান, পত্রিকায় দেখেছি একটি মা তার সন্তানকে কোলে জড়িয়ে রেখে মৃত্যুবরন করেছেন। আমি ওই মা মেয়ের সাথেই ছিলাম। লঞ্চে ওই বাচ্চাটি অনেক ছোটাছুটি করছিলো। বাচ্চা মেয়েটি অনেক চঞ্চল ছিল। লঞ্চটি ডুবার সময় ওই বাচ্চার মা আমাকে বলেছিল ভাইয়া আমাকে বাঁচান, আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান। কিন্তু লঞ্চ ডুবে সবাই তলিয়ে যাওয়ার পর আমার কিছুই করার ছিল না। আমি নিজে কিভাবে বেঁচে ফিরলাম তাও জানিনা।

এ সময় তিনি নিজের মোবাইল থেকে মায়ের কোলে সন্তানকে জড়িয়ে রাখা মা মেয়ের লাশে ছবিটি দেখিয়ে বলেন পরবর্তীতে আমি পত্রিকা থেকে এই ছবিটি তুলে রেখেছি। ওই দিনে তাদের আর্তনাদ আমি ভুলতে পারবো না।

প্রসঙ্গত গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে সৈয়দপুর কয়লাঘাট এলাকায় কার্গো জাহাজ ধাক্কা দিয়ে ‘সাবিত আল হাসান’ নামে লঞ্চটি অর্ধশতাধিক যাত্রীসহ ডুবিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এসময় সাঁতরে ১৫ থেকে ২০জন তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ ছিল ৩৬জন। পরে রোববার রাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ৩৪জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে এখনও নিখোঁজ রয়েছে দুইজন। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটিকে ৭ কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এ ঘটনায় ৬ এপ্রিল রাতে বন্দর থানায় অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও