চাষাঢ়ায় উল্টে থাকা একটি রিকশার আত্মকথন

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৮ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২১ সোমবার

চাষাঢ়ায় উল্টে থাকা একটি রিকশার আত্মকথন

‘আমি রিকশা। থাকি মাসদাইর শফির গ্যারেজে। আমারে যে চালায় তার নাম দেলোয়ার। খুব সকালে দেলোয়ার আমারে ধোয়ামোছা করে, আমার চাক্কার হাওয়া পরীক্ষা করে, সিট মুইছা (পরিষ্কার করে) দেয়, হেরপর সামনের হ্যান্ডেলে ভক্তি কইরা আমারে নিয়া বের হয়।’

‘সকাল থেইকা সন্ধ্যা, এই শহরের অলিগলি, রাজপথ, ভাঙাচোরা রাস্তা কিংবা থাকুক ময়লা কি বৃষ্টির পানিÍ এর উপর দিয়াই পেসেঞ্জাররে (যাত্রী) জায়গা মতো পৌঁছাইয়া দেয় দেলোয়ার। অনেক রিকশার ড্রাইভাররা ভাড়া নিয়া ‘কেঞ্জাল’ (ঝামেলা) করলেও দেলোয়ার করে না। এইটা ৩ বছর ধইরা (ধরে) আমার আর দেলোয়ারের রুটিন।’

‘কিন্তু তার চেয়েও বড় জিনিস হইলো, দেলোয়ার আমার শক্তি। আমি তো জড় পদার্থ, আমার জীবন ছিল না। দেলোয়ার আমারে জীবন দিতে না পারলেও অনুভূতি দিছে।’

‘কড়া রইদে (রোদে) দেলোয়ারের শরীরের কাপড় ভিজ্জা বাইয়া (বেয়ে) পড়া ঘাম আমারেও যখন ভিজাইয়া দিছে, তখন আমার অনুভূতির জন্ম হইছে। আমি দেখছি রইদের ঘামে দেলোয়ারের জামা ভিজতে আবার বাতাসে ঐ ঘাম শুকাইতে।’

‘দেলোয়ারের ঘাম আর ঘামের গন্ধে আমার অনুভূতি জন্মাইছে। বৃষ্টির দিনেও দেলোয়ার ভিজে, আমিও ভিজি কিন্তু পেসেঞ্জাররে দেলোয়ার ভিজতে দেয় না। পেসেঞ্জারই নাকি দেলোয়ারের লক্ষ্মী, রিজিকের উছিলা (মাধ্যম)।’

‘একদিন এক পেসেঞ্জার দেলোয়াররে থাবর (থাপ্পড়) দিছিলো, কিন্তু দেলোয়ার কান্দে নাই। অভিশাপও দেয় নাই। বৃষ্টিতে ভিইজা সারা রাইত দেলোয়ার জ্বরে কাঁপে, কাশিতে বুক ফাইটা যায় কিন্তু হেরপরেও দেলোয়ার বাইর হয় আমারে নিয়া। শুনি, পেটের জ্বালা বড় জ্বালা।’

‘কিন্তু দেলোয়ার তো খায় না। সবাই দুপুরে পেট ভইরা ভাত খায়, কিন্তু দেলোয়ার খায় না। সে চা আর বিস্কুট খাইয়া পয়সা বাঁচায় তার বউ-বাচ্চা, বুড়া বাবা-মার লেইগ্যা। ঐ খাওন খাইতে গিয়াও দেলোয়ারের চোখে হাসি দেখছি আমি।’

‘কয়দিন আগে শুনলাম, লকডাউন দিবো। লকডাউন নিয়া পেসেঞ্জাররা নানা কতা (কথা) কয়। কেউ ভালা কয়, কেউ মন্দ কয়। মাঝে মাঝে দেলোয়ার একলাই কথা কয়, মনে করে আমি শুনি না।’

‘আমি ঠিকই শুনি। লকডাউনের লেইগা (কারণে) দেলোয়ারের চোখে মুখে বিপদ দেখি আমি। অনেকে কইলো, আমারে নিয়া না-বাইর হইতে। কিন্তু দেলোয়ার কয়, রিকশা না-বাইর করলে খামু কী? বউ-বাচ্চা বুড়া বাবা-মা খাইবো কী?’

‘পরদিন সকালে দেলোয়ার আমারে নিয়া চাষাড়া এলাকায় আসার পরপরই পুলিশ আমারে ধইরা (আটক করে) দেলোয়াররে দূরে নিয়া গেল। আর দুজনে ধইরা, আমারে উল্টাইয়া দিল। কোনোদিন আমি এমনে থাকি নাই, খুব কষ্ট হইতাছিল।’

‘অনেক পেসেঞ্জারগো হাসপাতালে নেওয়ার সময় যেমন দম বন্ধ হইয়া আহে, আমারও তেমন দম বন্ধ হইয়া আইতাছিলো। কিন্তু আমি এইটা কী দেখলাম! আজকা এই প্রথম দেলোয়াররে আমি কানতে (কাঁদতে) দেখছি।’

‘না, দেলোয়ার নিজের জন্য কান্দে নাই, বউ-বাচ্চার লাইগাও (জন্যেও) কান্দে নাই। দেলোয়ার আজকা কানতেছিল আমার জন্য। বারবার কানতে কানতে পুলিশের কাছে যাইতাছিল, যেন আমারে ছাইড়া দেয়।’

‘শেষ পর্যন্ত সে কইলো, না ছাড়লেও উল্টাইয়া রাইখেন না। পুরা ৩ ঘণ্টা দেলোয়ার খালি (শুধু) কানছে আর কানছে। আমি ভাবতাম দেলোয়ার জানে না আমার অনুভূতি আছে।’

‘কিন্তু আজকাই প্রথম বুঝলাম, দেলোয়ার জানে আমার ভেতরে খালি অনুভূতিই না, জীবনও আছে। ৩ ঘণ্টা পর দেলোয়ারের কাছে আমারে দিয়া দিল। কিন্তু রাইত পর্যন্ত দেলোয়ারের কান্না থামে নাই।’


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও