দর্জিপট্টিতে নেই চিরচেনা রূপ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩২ পিএম, ২১ এপ্রিল ২০২১ বুধবার

দর্জিপট্টিতে নেই চিরচেনা রূপ

শরিফুল হোসেন। বয়স ৩৫ বছর। সে একজন দর্জি। সিনিয়র কারিগর হিসেবেই মার্কেটে তার পরিচয়। প্রতিবছর রমজান মাসে দিনরাত কাজ করতে হয়। রাত জেগে কাজ করতেই সে অভ্যস্থ। এবার চলছে কঠোর লকডাউন। শরিফুল বাসায় বসে থাকতে থাকতে তার সময় কাটে না। কারখানা মালিকের সাথে মাঝে মধ্যে কথা হয়। কারখানা খোলার কোন খবর নেই। শরিফ বাসায় একটি পুরনো সেলাই মেশিনে ঘরের জামাকাপড় সারাই করে সময় কাটায়। এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে শরিফুল জানায়, সে দেওভোগ কাটা মার্কেটে কাজ করে। এই মার্কেটে তার মত এক থেকে দুই হাজার কারিগর রয়েছে। লকডাউনের দরুন কারখানা বন্ধ। বেচাকেনা বন্ধ। আয়ের পথ বন্ধ। আমাদের সংসার চলবে কি করে। আমরাতো বেতনের কারিগর না। প্রডাকশনে কাজ করি। কাজ থাকলে পয়সা আছে। না থাকলে আয় বন্ধ। এখন সংসার চলবে কি করে ?

একই প্রশ্ন তরিকুলের। সে নয়ামাটির হোসিয়ারী শ্রমিক। তরিকুলও সিনিয়র কারিগর। তবে সে বেতনে চাকুরী করে। মালিকের সাথে তার বোঝাপড়া ভাল। গতবার করোনার সময় মালিক তাকে খুব সহায়তা করেছে। কিছু কম হলেও বেতনটা দিয়েছে। এবার মালিক তাকে নিয়মিত কারখানায় যেতে বলেছে। কাজ না থাকলেও তরিকুল কারখানাতে যায় নিয়মিত। মালিকও আসে। তারা ইফতার করে বাড়ি চলে যায়। কারণ মার্কেট এর কেহই কারখানা খোলেনি। ফলে তরিকুলের একার পক্ষে কারখানা চালু করা সম্ভব নয়। তরিকুল জানায়, নয়ামাটি হোসিয়ারী এলাকা রমজানে মাসে খুব জমজমাট থাকে। এত জমজমাট থাকে যে, রাতদিন বোঝা যায় না। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে। মেশিনের ধাতব শব্দ। রাস্তায় রিক্সার টুং টাং। কিছুই নেই। এখন সুনশান নিরবতা।

আহাদ-সামাদ হোসিয়ারী কারখানার মালিক বাবুল হোসেন জানালেন, রমজানের আগে কিছু অর্ডার ছিল কাজকর্ম করেছি। কারিগরগুলো ধরে রেখেছি। আমার কারখানায় দু’জন সিনিয়র কারিগর বেতনে কাজ করে। তিনজন প্রডাকশনে। দু’জন বয় আছে বেতনভুক্ত। গতবার লোকসান দিয়েছি। এইবার সারা বছর টুকটাক কাজ করেছি। ভেবেছিলাম রমজান মাসে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু লকডাউন সবকিছু ছাড়খার কইরা দিল। হাতে কাজ নাই। আমি নিজেই শীতের কিছু মাল বানাইতাছি। এই মাল বিক্রি করতে পারমু কিনা জানি না। কিন্তু কারিগরগো কিছু কাম দিয়া রাহোন লাগবো। নাইলে আমছালা দু’টাই যাবে। আমার মত অনেক মালিক কারখানা চালু রাখছে। সবার পক্ষে এইটা সম্ভব না। আমার কারখানাটা তিনতলায়। তাই সহজে কারো চোখে পড়ে না। আমরা লকডাউন চাই না।

এদিকে, নয়ামাটি, উকিলপাড়া, নন্দিপাড়া, লয়েল ট্যাংক রোড, দেওভোগ ও আশপাশ এলাকার হোসিয়ারী মালিকরা জানান, আমাদেরতো এটাই ব্যবসার সিজন। ঈদের সিজন মার খেলে পুরো বছরই মার যাবে। সরকার লকডাউন দিয়েছে। আমরা যারা পোষাক তৈরী করি ও বিক্রি করি তাদের ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। আমার কারখানার কারিগর আছে। শোরুমের স্টাফ আছে। তাদের বেতন আছে। বোনাস আছে। এ সবের কি হবে। আমাদের স্টাফদের নিয়ে কোথায় যাবো ? ওদেরওতো সংসার আছে। স্ত্রী পুত্র আছে। ওরাই বা সারাবছর হোসিয়ারীতে কাজ করে এই কঠিন সময়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তাদের সাহায্য করবে কে ? গতবার হোসিয়ারী এসোসিয়েশসন ক্ষতিগ্রস্ত হোসিয়ারী মালিকদের তালিকা সরকারের উপরের মহলে পাঠানো হয়েছে। সে বার কোন হোসিয়ারী মালিককে সরকারি সহযোগীতা পাওয়ার খবর শুনিনি।

প্রসঙ্গত, দর্জিপট্টিতে রমজানের এক মাস আগে থেকেই দিন রাত সেলাই মেশিনের চাকা ঘুরার শব্দ শোনা যেত। বর্তমানে নগরীর আলী আহাম্মদ চুনকা সড়কের পাশে দেওভোগ কাটা মার্কেট এর দর্জি পাড়ায় গত দুই রমজান ধরে মহামারির কারণে পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। এক সময় দর্জি কারিগরদের কাজের চাপে দম ফেলার ফুসরত থাকতো না। কিন্তু এখন তাদের হাতে যেন অফুরন্ত সময়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর রমজানের দুই মাস আগে সরকার লকডাউন দেয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি বিনিয়োগ করেনি। এবার করোনা পরিস্থিতি হঠাৎ অবনতি হওয়ায় দর্জিপট্টির ব্যবসায়ীরা খুব বেশি বিপাকে পড়েছেন। অনেকে গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে লোন করে ঈদের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। এখন কিছু কিছু কারখানায় টুকিটাকি কাজ চলছে, যা একেবারেই নগণ্য। কারণ এখানকার ব্যবসায়ীরা শার্ট, প্যান্ট, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা ও স্কাট তৈরি করে নগরী এবং নগরীর বাইরের বিভিন্ন মার্কেটে পাইকারীতে বিক্রি করেন। কিছু কিছু কারখানা অগ্রিম অর্ডার নিয়েও কাজ করতো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি বছর ঈদের আগেই দর্জিপট্টির দর্জিরা বাহারি ডিজাইনের কাপড়ের তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন। খলিফাপট্টির তিন চারটি মার্কেটসহ অনেক ভবনে রয়েছে পোশাক তৈরির কারখানা। কাজ না থাকায় এসব কারখানার অনেক মেশিনেও পড়েছে তাই ধুলোর আস্তরণ। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি কবারখানার দর্জি শ্রমিকরা পরস্পর খুনসুটি করে সময় পার করেছেন। আবার কেউ কেউ মেশিনের পাশে দিব্যি ঘুমাচ্ছেন। ইমন ফ্যাশনের দর্জি মো. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, রমজানের এ সময় কাজের ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকতো। অথচ এখন আমাদের হেলেদুলে কাজ করতে হচ্ছে। আমাদের কারখানায় এখন যে কাজ আছে, তা সর্বোচ্চ দুই তিন দিন চলবে। তারপর এমননিতে মেশিনের চাকা বন্ধ হয়ে যাবে। কারখানার মালিক আবদুর রহমান বলেন, এবারের অবস্থা গত বছরের চেয়েও খারাপ। মনে করেছিলাম এ বছর ব্যবসা করে গত বছর যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলাম তা পুষিয়ে নিতে পারবো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আরো বড় লোকসানের মুখে পড়লাম। এখন কর্মচারীদের বেতন কিভাবে দিবো সেটিই বুঝতে পারছি না। ১৫ রোজা থেকে মার্কেট খোলার অনুমতি দিলে আমরা কিছু ব্যবসা করতে পারবো।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও