জিডির পর হুমকি শেষে খুন

সাবিত আল হাসান,স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৫৬ পিএম, ৩ জুন ২০২১ বৃহস্পতিবার

জিডির পর হুমকি শেষে খুন

৮ মাস পূর্বেও প্রাণে বাঁচতে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করেছিলো ইয়াসিন দুলাল। অব্যাহত চাপ আর হুমকির মুখে বাধ্য হয়ে প্রথম স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তালাক দিয়েও নিস্তার পাননি অত্যাচারী এই নারীর হাত থেকে। শেষ পর্যন্ত তার হাতেই মৃত্যু বরণ করে চিরদিনের মত নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেলেন ইয়াসিন।

বলছি ফতুল্লার ভুইগড় এলাকায় অটোরিক্সা থেকে ধাক্কা দিয়ে কাভার্ডভ্যান চাপায় পিষ্ট হওয়া বেসরকারি চাকরিজীবী ইয়াসিন দুলালের (২৫) কথা। গত ৩১ মে ভূইগড় কড়ইতলা এলাকায় সাইনবোর্ডগামী একটি চলন্ত অটোরিক্সা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছিলো তাকে। পেছন থেকে দ্রুতগামী একটি কাভার্ডভ্যানের চাপায় প্রাণ হারান তিনি। এর নেপথ্যের কারিগর তারই প্রথম স্ত্রী এমনটাই অভিযোগ স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের।

ঘটনার ৩ দিনের মাথায় ফতুল্লা মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করে নিহত ইয়াসিন দুলালের পিতা আব্দুল হাফিজ রাড়ি। সন্ধ্যায় অভিযোগটি আমলে নিয়ে মামলা গ্রহণ করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। অভিযুক্ত আসামীকে গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিবুজ্জামান।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত বছরের ১৭ এপ্রিল ভুক্তভোগী ইয়াসিন দুলাল ও আসামী আয়েশা আক্তার কেয়া (২৬) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আয়েশার ইতোপূর্বেও ৩ টি বিয়ে হয়েছিলো। পূর্বের স্বামীর ঘরে তার সন্তানও রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই সে সংসারে মনযোগী না হয়ে পূর্বের স্বামীদের সাথে যোগাযোগ রাখতো। আর এনিয়ে প্রায়ই বিবাদ দেখা যেত দুজনার মাঝে। মানসিকভাবে ইয়াসিনের উপর অত্যাচার চালানোর কারণে একই বছরের সেপ্টেম্বরে তালাক প্রদান করে। তারপরেও আয়েশার অত্যাচার বন্ধ না হওয়ায় পরের মাসের ২৭ তারিখ ফতুল্লা মডেল থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করে।

ইয়াসিনের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ইয়াসিন দীর্ঘদিন ফতুল্লার লালপুর এলাকার হাওয়া কটেজে ভাড়া থাকতো। ৩/৪ মাস পূর্বে সে গ্রামের বাড়ি বরিশাল ফিরে যায়। ঘটনার ২ দিন আগে বরিশাল থেকে নারায়ণগঞ্জ ফিরে সে। ঠিক কোন কারনে তার প্রথম স্ত্রীর সাথে সাইনবোর্ডের দিকে যাচ্ছিলো তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথম স্ত্রীর সাথে দেখা হবার পরপরেই তারা অটোরিক্সায় করে সাইনবোর্ডের দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ শুরু হলে একপর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে ইয়াসিনকে রাস্তায় ফেলে দেয় আয়েশা। কাভার্ডভ্যানের চাপায় পিষ্ট হলে দ্রুত পালিয়ে যায় সে।

কোন কারণে এই হত্যাকান্ড? : ইয়াসিনকে হত্যার পর থেকেই বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে চলে এসেছে পুলিশের কাছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবদুর রউফ জানান, নিহতের পকেটে ইসলামী ব্যাংক ফতুল্লা শাখার একটি খালি চেক পাওয়া যায়। সেই চেকের সূত্র ধরেই তার পরিচয় শনাক্ত হওয়া সম্ভব হয়েছে। এছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আয়েশার সাথে ২০ লাখ টাকা কাবিনে বিয়ে হয় ইয়াসিনের। তালাকের সময় স্থানীয়দের সহায়তায় ৫ লাখ টাকা প্রদান করেছিলো আয়েশাকে। ইয়াসিন ছিল অত্যান্ত সুদর্শন এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল একটি ছেলে। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই নিজেকে বেশ প্রতিষ্ঠিত করে নিতে পেরেছিলো মুঠোফোন সেবাদানকারী সংস্থা এয়ারটেলে যুক্ত হয়ে। অপরদিকে আয়েশা ঢাকার মুগদা হাসপাতালে আয়া হিসেবে কাজ করে আসছিলো।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কারণ ধরে সামনে এগোচ্ছে পুলিশ, বিশেষ করে আয়েশাকে কোন টাকার অংক লিখে দিতেই ব্ল্যাংক চেক পকেটে নিয়েছিলো সে? বরিশাল থেকে ফিরে আয়েশার বাসস্থানে যাচ্ছিলো সে? বরিশালে ফিরে দ্বিতীয় বিয়ে করায় ক্ষুব্ধ ছিল আয়েশা? নাকি প্রবল চাপে পরে আয়েশার সাথে দেখা করতে বাধ্য হয়ে বরিশাল থেকে ছুটে এসেছিলো নারায়ণগঞ্জে? তবে আসামীকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত এর কোনটিই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

২ মাস আগে আয়েশার পরিবার থেকে হুমকি : নিহত ইয়াসিনের পিতা আব্দুল হাফেজ রাড়ি জানান, আয়েশা আর আমাদের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। ছেলের করোনা হওয়ায় পাশের গ্রামের মেয়ে নার্স সেই সুবাদে সহায়তা নিয়েছিলো আয়েশার। কিন্তু আয়েশা তার ছেলের প্রেমে পরে গেছে সেটি বুঝতে পারেনি। বিয়ের মাত্র ২ দিন আগে আয়েশা তার আগের স্বামী মাহবুবকে তালাক দেয়। পুরো বিষয়টি ইয়াসিনের কাছে ছিলো গোপনীয়। ইয়াসিন জেনে যাওয়ায় বিয়ের কয়েকমাস পরেই তাকে তালাক দেয়।

সম্প্রতি শবেবরাতের কয়েকদিন পূর্বে ইয়াসিনকে পুনরায় বরিশাল এনে বিয়ে করায় তার পরিবার। আর এতে ক্ষুব্দ হয় আয়েশার পরিবার। পুরো এলাকায় আয়েশা ও তার পরিবার ভালো নয় এমনটাই জানে সকলে। বিয়ের খবর পেয়ে আয়েশার ছোটভাই প্রকাশ্যে ইয়াসিনের বাবাকে বাজারে এসে ইয়াসিনকে হত্যার হুমকি দেয়। বিষয়টি সেভাবে আমলে নেয়নি সে।

নিহত ইয়াসিনের পিতার দাবী, পুরো পরিবার পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকান্ড চালিয়েছে। তার ছেলে আয়েশাকে তালাক দেয়ার কারনেই ক্ষুব্ধ হয় আয়েশা ও তার পরিবার। এছাড়া ভিন্ন কোন কারন দেখছেন না তিনি।

এ ব্যাপারে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিবুজ্জামান বলেন, আমরা আমাদের সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে আসামীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছি। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হবো। সম্ভাব্য সবকয়টি কারন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও