নারী যখন ঘাতক

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:১২ পিএম, ৪ জুন ২০২১ শুক্রবার

নারী যখন ঘাতক

মাত্র ২ দিনের ব্যবধানে ২টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড নারায়ণগঞ্জ জেলা ও জেলার বাইরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুটি হত্যার সাথেই ঘাতকের ভূমিকায় ছিলেন নারী। একজন মা তার ছেলেকে হত্যা করেছেন, অন্যটি তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী তার স্বামীকে। আলোচিত এই দুটি হত্যাকান্ডের পর সামাজিক নিরাপত্তা এবং পারিবারিক সহনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৩০ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মায়ের হাতে আপন ছেলেকে শিলপাটা দিয়ে আঘাত করে হত্যার অভিযোগ উঠে। আহত ছেলে নাবিল আহমেদকে বাসার ভেতর তালাবদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে বাবা সগির আহমেদ। গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলো মা নাসরিন আক্তার। ঘটনার পরদিন নরসিংদির একটি হোটেল কক্ষ থেকে নাসরিন আক্তারের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

নিহতের বাবা সগীর আহমেদ বলেন, আমি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করি। আমরা একটি ভাড়া বাসায় থাকি। ঘটনার দিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে দেখি দরজায় তালা মারা। স্ত্রীকে অনেকবার ফোন দেই কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাসায় ঢুকে দেখি আমার একমাত্র ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার মাথায় শিলপাটার আঘাত এবং বুকে ছুরিকাঘাতের একাধিক চিহ্ন দেখতে পাই। পরে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় রাত সাড়ে ৩টায় চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নাবিলের মা নাসরিন আক্তার দীর্ঘদিন ধরেই মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।

ঘটনার পর থেকে পালিয়ে থাকা মা নাসরিন আক্তারের লাশ নরসিংদির একটি হোটেলের কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশের দাবী তিনি আত্মহত্যা করেছেন। হোটেল রেজিস্ট্রারে তার নাম ঠিকানা লেখা হয় রেহানা আক্তার (৩০), পিতা আবু তাহের, মাতা ফাতেমা জোহরা, গ্রাম ডৌকাদি, নরসিংদী। এদিন দুপুর থেকে তার কক্ষের দরজা বন্ধ থাকায় নরসিংদী সদর থানায় সংবাদ দেয় হোটেল কর্তৃপক্ষ। সংবাদ পেয়ে বিকাল সাড়ে ৩টায় পুলিশ কক্ষের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে জানালার গ্রীলের সাথে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে।

৩১ মে ফতুল্লার ভূইগড়ে চলন্ত অটোরিক্সা থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে কাভার্ডভ্যানে স্বামীকে পিষ্ট করে হত্যা করে স্ত্রী আয়েশা। রাত ৯টার দিকে একসাথে সাইনবোর্ড যাবার পথে প্রথমে বাকবিতন্ডা এবং পরে হাতাহাতি শুরু হলে এক পর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়া হয় স্বামী ইয়াসিন দুলালকে। পেছন থেকে দ্রুতগামী একটি কাভার্ডভ্যান নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ইয়াসিনের উপরেই চাকা তুলে দেয়। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ইয়াসিন এবং পালিয়ে যায় আয়েশা।

ঘটনার ৩ দিনের মাথায় নিহতের পিতা বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় আয়েশার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত বছরের ১৭ এপ্রিল ভুক্তভোগী ইয়াসিন দুলাল ও আসামী আয়েশা আক্তার কেয়া (২৬) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। আয়েশার ইতিপূর্বেও ৩ টি বিয়ে হয়েছিলো। পূর্বের স্বামীর ঘরে তার সন্তানও রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই সে সংসারে মনযোগী না হয়ে পূর্বের স্বামীদের সাথে যোগাযোগ রাখতো। আর এনিয়ে প্রায়ই বিবাদ দেখা যেত দুজনার মাঝে। মানসিক ভাবে ইয়াসিনের উপর অত্যাচার চালানোর কারনে একই বছরের সেপ্টেম্বরে তালাক প্রদান করে। তারপরেও আয়েশার অত্যাচার বন্ধ না হওয়ায় পরের মাসের ২৭ তারিখ ফতুল্লা মডেল থানায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে একটি সাধারণ ডায়েরী দায়ের করে।

ইয়াসিনের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ইয়াসিন দীর্ঘদিন ফতুল্লার লালপুর এলাকার হাওয়া কটেজে ভাড়া থাকতো। সম্প্রতি ৩/৪ মাস পুর্বে সে গ্রামের বাড়ি বরিশাল ফিরে যায়। ঘটনার ২ দিন আগে বরিশাল থেকে নারায়ণগঞ্জ ফিরে সে। ঠিক কোন কারনে তার প্রথম স্ত্রীর সাথে সাইনবোর্ডের দিকে যাচ্ছিলো তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথম স্ত্রীর সাথে দেখা হবার পরপরেই তারা অটোরিক্সায় করে সাইনবোর্ডের দিকে রওনা হন। পথিমধ্যে উভয়ের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ শুরু হলে একপর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে ইয়াসিনকে রাস্তায় ফেলে দেয় আয়েশা। কাভার্ডভ্যানের চাপায় পিষ্ট হলে দ্রুত পালিয়ে যায় সে।

তবে ঘটনার ৪ দিন পরেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি অভিযুক্ত আয়েশাকে। এ ব্যাপারে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিবুজ্জামান বলেন, আমরা আমাদের সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে আসামীকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছি। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম হবো। সম্ভাব্য সবকয়টি কারন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও