নারায়ণগঞ্জে এডভেঞ্জার ল্যান্ড ও সাইরা গার্ডেনে ভাড়া ২ লাখ টাকা

সাবিত আল হাসান,স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০১ পিএম, ৫ জুন ২০২১ শনিবার

নারায়ণগঞ্জে এডভেঞ্জার ল্যান্ড ও সাইরা গার্ডেনে ভাড়া ২ লাখ টাকা

ছুটির দিনে বন্ধু বান্ধব কিংবা সপরিবারে সুইমিংপুলের নীল পানিতে অবসর উদযাপন নতুন কিছু নয়। বছর দশেক ধরেই দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সুইমিংপুল। দীর্ঘদিন সুইমিংপুলের খরচ সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে না থাকলেও সম্প্রতি বিভিন্ন রিসোর্ট এবং পার্ক স্বল্পমূল্যে সুইমিংপুল উপভোগের সুযোগ করে দিয়েছে। কথায় আছে ‘বানরের হাতে মুক্তার মালা শোভা পায় না’। ঠিক তেমনই স্বল্পমূল্যে সুইমিংপুল উপভোগের সুযোগ পেয়ে সেখানে অশ্লীলতা আর নারী নিয়ে অসামাজিক বিনোদনের সুযোগের নামে পুল পার্টির আয়োজন করছে একটি চক্র। এর পেছনে রয়েছে ভিডিও ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘টিকটক সেলিব্রিটি’ নামক কিছু ব্যক্তিরা।

নারায়ণগঞ্জ কিংবা নারায়ণগঞ্জের বাইরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে গেলেই দেখা মিলবে একদল উঠতি বয়সী তরুন তরুণীকে। মোবাইল, ট্র্যাইপড হাতে নিয়ে বিভিন্ন কায়দা কসরত করে অভিনয়ের চেষ্টা চলছে। রঙ বেরঙের চুল আর উদ্ভট সব পোশাক দেখে বোঝাই যায় তাদের রুচির পরিচয়। আগত দর্শনার্থীরা চিড়িয়াখানার জীব জন্তু দেখার মতই তাকিয়ে উপভোগ করেন এদের তামাশা। তাদের পরিচয় ‘টিকটক সেলিব্রিটি’। তবে এদের সকলেই পুল পার্টি চক্রের সাথে জড়িত নয়। কিন্তু এদের প্রত্যেকেই এই চক্রের ফাঁদে আটকে যাবার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের কেরালায় একটি হোটেলে নারী নির্যাতন করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। কথিত টিকটক সেলিব্রিটি হৃদয় বাবুর হাত ধরে ভারতে গিয়ে নারী পাচারের শিকার হয়েছিলেন তিনি। দেহ ব্যবসায় রাজি না হওয়ায় জোরপূর্বক নির্যাতন ও গণধর্ষণ করে তার ভিডিও ছড়িয়ে দেয় এই চক্র। এভাবে অসংখ্য নারী তাদের হাতে ধর্ষিত ও পাচারের শিকার হয়েছে টিকটক থেকে পরিচয়ের মাধ্যমে। নির্যাতিতা সেই নারী বাংলাদেশে ফিরে পুলিশ প্রশাসনকে এমন তথ্য জানালে বেরিয়ে আসে চক্রের ভয়ংকর সব ঘটনা।

ভুক্তভোগী ওই নারী আরও জানায়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টিকটক হৃদয় ফতুল্লায় অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ডপার্কে `টিকটক হ্যাংআউট পুল পার্টি`র আয়োজন করে। তার আমন্ত্রণে ওই পার্টিতে যান তিনি। তখন হৃদয় অফার দেয়, বিদেশে ভালো বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে। সেটা না করলে টিকটক তারকা হওয়ার পথ খোলা আছে। এর পর একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের আফরিন গার্ডেন রিসোর্টে আরেকটি পুল পার্টির আয়োজন করে হৃদয়। সেখানে ৭০০-৮০০ তরুণ-তরুণী অংশ নেয়। পার্টিতে সবাইকে মদ সরবরাহ করা হয়েছিল।

এই তথ্য ধরে নারায়ণগঞ্জে পুল পার্টির খোঁজে নামে সময়ের নারায়ণগঞ্জ। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে পুল পার্টির আয়োজনের রহস্য। টিকটক ছাড়াও ডিজে ও পুল পার্টি ঢাকা নামে আরও একাধিক গ্রুপ রয়েছে যারা আয়োজন করে এই ধরণের ইভেন্ট চালু করে। অনলাইনে তরুণ তরুণীদের দেয়া হয় লোভনীয় সব অফার। উন্মুক্ত রাখা হয় অসামাজিকতার সব রকম সুযোগ। ফাঁদে পা দিয়ে বহু তরুণ তরুণীই যুক্ত হয় এই পার্টিতে। আর এখান থেকে প্রথমে পরিচিত হওয়া এবং ধীরে ধীরে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে শেষে দেশের বাইরে পাচার করে দেয়া হয়।

যেভাবে আয়োজন হয় পুল পার্টির : পুল পার্টিতে মূলত ২টি উপায়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একটি হচ্ছে টিকটক সেলিব্রিটিরা তাদের নিজ নিজ একাউন্টে পুল পার্টিতে অংশগ্রহণের আহবান জানায়। সেখানে তাদের নিজেদের অংশগ্রহণের কথাও তারা নিশ্চিত করেন তারা। সম্প্রতি ভারতে গ্রেফতার হওয়া হৃদয় বাবু এভাবেই তার ভক্তদের পুল পার্টিতে আমন্ত্রণ জানাতো। অপর উপায়টি হচ্ছে ফেইসবুকে বিভিন্ন প্রাইভেট গ্রুপ এবং পেইজ থেকে পুল পার্টির ইভেন্ট ডাকা হয়। সেখানে টিকেট এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের মাধ্যমে পার্টিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা একে অপরের ঘনিষ্ট সংস্পর্শ পেতে ছুটে আসে পুল পার্টিতে।

নারায়ণগঞ্জের এডভেঞ্জার ল্যান্ডের সুইমিংপুল সেকশনে ৭০-৮০ জনের পুল পার্টি আয়োজন করার কথা নিশ্চিত করেছে খোদ ভুক্তভোগী এক তরুণী। ফেইসবুকে খোঁজ নিয়েও এর সত্যতা মেলে। নারায়ণগঞ্জে আর কোথায় কোথায় এমন পুল পার্টি হয় এমন খোঁজ নিতে গিয়ে বেশ কিছু টিকেটের দেখা পাওয়া যায়। সেখানে ভেন্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয় সোনারগাঁও এর নাম। তবে সোনারগাঁওয়ে শুধুমাত্র রয়েল রিসোর্টে সুইমিংপুল রয়েছে এবং সেখানে এই ধরণের পুল পার্টি আয়োজনের অনুমতি দেয়া হয়না বলে জানা গেছে।

তবে একটি সূত্র জানায়, বন্দরের মদনপুর এলাকায় অবস্থিত সাইরা গার্ডেন রিসোর্টে সুইমিংপুল রয়েছে এবং সেখানে প্রায়ই বিভিন্ন গ্রুপ পুল পার্টির আয়োজন করে। টিকটক ব্যবহারকারীদের একজনের সাথে যোগাযোগ করে জানা যায়, সোনারগাঁ ভেন্যু হিসেবে মদনপুরের সাইরা গার্ডেনের নামই উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ মদনপুর এলাকাটি সোনারগাঁওয়ের কাছাকাছি হওয়ায় তাদের ভেন্যু লিখতে ভুল করে থাকতে পারে। তাছাড়া টিকটক পুল পার্টির একটি ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে এই প্রতিবেদকের নিকট। সেখানে সাইরা গার্ডেনে টিকটক পুল পার্টির আয়োজনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এর আগেও সাইরা গার্ডেনের রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে অসামাজিক কার্যকলাপ চালানোর একাধিক অভিযোগ উঠেছিলো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইরা গার্ডেনের পুল, মাঠ এবং খাবার সহ একদিনের রিজার্ভ খরচ প্রায় ২ লাখ টাকা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাইরা গার্ডেনে ডেস্ক এক্সিকিউটিভ কামরুস সায়েদীন। অপরদিকে এডভেঞ্জার ল্যান্ড পার্কের পুল জোনের রিজার্ভ ভাড়াও প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। তবে এডভেঞ্জার ল্যান্ড বর্তমানে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন পার্কের ইনচার্জ বাবুল। অপরদিকে করোনার লকডাউনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চালু রাখা রয়েছে সাইরা গার্ডেন। তারা করোনার ভেতরেও জনসমাগমের অনুমতি দিচ্ছেন আগত দর্শনার্থীদেরকে।

অসামাজিকতার সুযোগে ভরপুর পুলপার্টি : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ‘ডিজে পার্টি’স ইন ঢাকা’ নামক একটি পেইজে দেখা যায় আব্রাহাম হোসেইন ইব্রাহিম নামে এক ব্যক্তি পুলপার্টি কল করেছেন এবং তিনি অনলাইনে টিকেট কেনার অফার দিচ্ছেন। সেখানে সিংগেল ৯৯৯ এবং কাপল ১৭৯৯ টাকায় বিক্রি করছেন টিকেট। সুযোগ হিসেবে সামনে টোপ দিয়েছেন একাধিক অসামাজিকতার সুযোগ। এক্টিভিটিজের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, সেফটি রুম, স্মোকিং জোন, বেস্ট সিকিউরিটি, স্পেশাল পার্টি উইথ হট ডিজে এন্ড গার্লস!

টিকটক ব্যবহারকারী তরুণদের মতে, সেফটি রুম মূলত অবিবাহিত কাপলদের একান্ত সুযোগ করে দেয়ার একটি মাধ্যম। আর সুইমিংপুলের পানিতে জলকেলির নামে মেয়েদের সাথে বেহায়াপনার অফুরন্ত সুযোগ করে দেয় পুল পার্টি। কোন কোন পার্টিতে বাড়তি টাকায় মেলে মদ ও বিয়ার পানের সুযোগ। মেয়েদের কেউ কেউ বুঝে আবার কেউ না বুঝে চলে আসে পার্টিতে। এদের অধিকাংশই বিভিন্ন গার্মেন্টস, ফ্যাক্টরি এবং নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। অল্প টাকায় চোখের সামনে এত জাঁকজমক বিষয় দেখে অনেকেই নিজেকে সামলাতে পারে না।

এসব পুল পার্টির পেছনে সক্রিয় থাকে নারী পাচারকারীদের একটি চক্র। তারা বেছে বেছে কয়েকটি নারীকে টার্গেট করে। তার সাথে সখ্যতা জমিয়ে বিশ্বস্থতা অর্জন করে নেয়। এরপর বিভিন্ন অফার এবং ডিস্কাউন্টের প্রলোভন দেখিয়ে আরও বেশ কয়েকটি পার্টিতে ডাকে। বন্ধুতের সুযোগ নিয়ে দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেড়াতে যাবার কথা বলে ভারতে পাচার করে দেয়। এরপর তাদের জায়গা হয় ভারতের কোন হোটেল কিংবা দেহ ব্যবসায়ী চক্রের কাছে। এভাবে প্রতি বছর অসংখ্য নারী টিকটক ও পুল পার্টি চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে পাচারের শিকার হচ্ছে।

এই ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জকে বলেন, আমরা এর আগেও বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় টিকটক গ্রুপের পার্টির কথা শুনেছি। নারায়ণগঞ্জে আর যাতে কোন পার্টি এই টিকটক গ্রুপ করতে না পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি এবং আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যহত রয়েছে। এই ধরণের অপকর্ম বন্ধে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও