ধলেশ্বরী দখল ভরাট তদন্ত শুরু

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:২৪ পিএম, ৭ জুন ২০২১ সোমবার

ধলেশ্বরী দখল ভরাট তদন্ত শুরু

নদীর জমি লীজ, বন্দোবস্ত, বিক্রয় কিংবা অধিহণ করা যাবে না; উচ্চ আদালতের এমন নির্দেশনা থাকার পরেও নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগরে ধলেশ্বরী নদীর জমি গৃহহীনদের নামে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর হোসেন সওদাগরের নেতৃত্বে চলছিল নদী ভরাটের কার্যক্রম। নদীর জমি ভরাট ও ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রতিবাদে গত ৪ মে স্থানীয় এক ব্যক্তি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।

প্রায় এক মাস পরে এ বিষয়ে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও জেলা নদী রক্ষা কমিটির আহবায়ক মোস্তাইন বিল্লাহকে নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। গত ৩ জুন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সচিব মো: আমিনুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের বরাবরে চিঠিটি প্রেরণ করেন। যার অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও ঢাকা বিভাগীয় নদী রক্ষা কমিটির আহবায়ককে। আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক প্রতিবেদন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে প্রেরণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নদীর জমি লীজ, বন্দোবস্ত, বিক্রয় কিংবা অধিহণ করা যাবে না; উচ্চ আদালতের এমন নির্দেশনা থাকার পরেও গোগনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নদীখেকো নূর হোসেন সওদাগরের নেতৃত্বে চলছে নদী ভরাটের কার্যক্রম। গত ৪ মে নদীর জমি ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবর স্মারকলিপি করে সৈয়দপুর এলাকার দুই বাসিন্দা। এর অনুলিপি প্রদান করা হয়েছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও এসিল্যান্ড সদরকে। মহামান্য হাইকোর্টের রীট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ এর নির্দেশনা অনুযায়ী, নদী বলতে সিএস ম্যাপে উল্লেখিত যে স্থান নদী প্রদর্শণ করা হয়েছে, সেটা নদী হিসেবেই ধরা হবে। নদীর জমির শ্রেণির পরিবর্তন বা পরিবর্ধন যোগ্য নয়। কোনভাবেই বন্দোবস্ত, শ্রেণির পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের সৈয়দপুর এলাকার বাসিন্দা মো: মাহাবুব ও মো: সাহাবউদ্দিন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে আবেদনে উল্লেখ করেন, সৈয়দপুর মৌজায় সিএস ধলেশ্বরী নদী-৬০১, এসএ-১০৪৪, ১০৩৮, আর এস-১০০৪, ৯৯৮ নং দুই দাগে ৫৮ শতাংশ ভূমি যা ধলেশ্বরী নদীর অংশ হিসেবে বিদ্যমান। যাহা উক্ত জমির ম্যাপ কাগজপত্র থেকে যথার্থ স্পষ্ট। কিন্তু সেখানে গৃহহীন বা ভূমিহীনদের গৃহ নির্মাণ করে বন্দোবস্ত দেওয়ার লক্ষ্যে বিগত ২৯ এপ্রিল সাইনবোর্ড ও সীমানা নির্ধারণ করা হয় যা মহামান্য হাইকোর্টের রীট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ এর নির্দেশনার অমান্য। উক্ত রীট পিটিশনে নদী বলতে সিএস ম্যাপে উল্লেখিত যে স্থান নদী প্রদর্শণ করা হয়েছে সেই স্থানটিকে নদী বলে ধরে নিতে হবে এবং উক্ত স্থান কোনভাবেই বন্দোবস্ত যোগ্য নয়। এছাড়া যথাসম্ভব উহার শ্রেণির পরিবর্তন বা পরিবর্ধন যোগ্য না। কিন্তু বিগত ১ মে থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর হোসেন) সেখানে ভরাট কার্যক্রম চালাচ্ছেন। যা নদী সংশ্লিষ্ট জমির শ্রেণি পরিবর্তনও বটে। রীট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ এবং ১৩৯৮৯/২০১৬ এবং লিভ টু আপিল নং ৩০৩৯/২০১৯ এবং বঙ্গীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাতন্ত্র আইন ১৯৫০ এর ধারা ৮৭,৮৭ আওতাধীন নদীর জমির মালিক জনগণ রাষ্ট্র বা সরকার তার ট্রাষ্টি। সিএস রেকর্ডিয় নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য না এবং বন্দোবস্ত যোগ্য না। নদীর জমি কোন অবস্থাতেই ব্যক্তি মালিকানায় লীজ বা বন্দোবস্ত বা বিক্রয় করা যাবেনা কিংবা অধিগ্রহণও করা যাবেনা। নদীর জমির মালিক জনগণ এবং রাষ্ট্র বা সরকার তার আমানত গ্রহীতা। উক্ত রায়ের সকল কপি সংশ্লিষ্ট সকল জেলা, উপজেলা ও ভূমি অফিসে প্রেরণ করা হয়। কিন্তু দু:খের বিষয় একটি সুবিধাভোগী মহল সরকারি অফিসকে ভুল বুঝিয়ে যোগসাজসে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের বাধ্যতামূলক আদেশ ও নির্দেশনা অমান্য করে নদীর জমি বন্দোবস্ত দেওয়া ও ড্রেজার দিয়ে মাটি ভরাট করে গৃহনির্মাণের পায়তারা করছে যা আদালত অবমাননার শামিল। এখানে আরো উল্লেখ্য যে অকৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার আইনগত বিধি বিধান রয়েছে এবং উহা প্রতিপালন পূর্বক বন্দোবস্ত দেওয়া যায় কিন্তু অকৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা এর ৭ মার্চ ১৯৯৫ এর ৩ (ঘ) অনুযায়ী “নারায়ণগঞ্জ সহ ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় এই ধরনের বন্দোবস্ত দেওয়া যাইবেনা”। আইনে স্পষ্ট বারিত থাকায় উক্ত জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার আইনগত কোন সুযোগ নেই। তাই জনস্বার্থে নদী সংশ্লিষ্ট তফসিল ভুক্ত জমি হাইকোর্টের রীট পিটিশন নং ৩৫০৩/২০০৯ এবং লিভ টু আপিল নং ৩০৩৯/২০১৯ এর নির্দেশনা প্রতিপালন পূর্বক বেআইনী বন্দোবস্ত কার্যক্রম বন্ধ পূর্বক উক্ত জমি বনায়ন করণের আবেদন জানানো হয়েছে।

পরে গোগনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নূর হোসেন সওদাগর জানান, চর সৈয়দপুর একসময় পুরোটাই নদীর জায়গা ছিল। কিন্তু এখন সেখানে নদী নেই। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে আমি সদস্য মাত্র। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার। আপনারা চাইলে, তাদের সাথে কথা বলতে পারেন। তারাই ভালো বলতে পারবে।’

এ বিষয়ে তৎকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফা জহুরা জানান, সিএস পরিমাপে নদীর জায়গা থাকলেও আরএস পরিমাপে এটি খাস জমি হওয়ায় আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভূমিহীনদের নামে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছি। সেখানে এখন ভূমিহীনদের জন্য গৃহনির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে খাস জমি ভোগদখল করে আসছিল তারাই এখন প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রকল্পের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে।
এদিকে নদী কমিশনের সচিবের প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, নদ নদীর জমি (তীরভূমি, ফোরশোর, প্লাবনভূমি) অধিগ্রহন বা বন্দোবস্ত প্রদান কিংবা শ্রেণী পরিবর্তন বা উক্তরূপ জমিতে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী। জেলা প্রশাসক ও কালেক্টর বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কোনো নদীর (তীর, ফোরশোরসহ) বা খালের জমি বন্দোবস্ত বা ডিসিআর প্রদান করে থাকলে অবিলম্বে তাদের বন্দোবস্ত বা ডিসিআর বাতিল করবেন এবং এই শ্রেণীর পাবলিক সম্পত্তি কাউকেই (সরকারি-বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত কিংবা ব্যাক্তি মালিকানায়) হস্তান্তর না করে তার সংরক্ষণ নিশ্চিত করবেন। উল্লেখ্য যে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়-জলাধারের এসব জমির শ্রেণী কোনভাবেই পরিবর্তন করা যাবেনা, এমনকি অর্থনৈতিক জোন, আশ্রয়ণ, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রিসোর্ট, এমিউসমেন্ট পার্ক বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে কাউকেই বরাদ্দ বা বন্দোবস্ত দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ইতিমধ্যে দেয়া হলে তা বাতিল করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নদ-নদী সংরক্ষণ ও উন্নয়ন বিষয়ক নীতি-কৌশল ও দর্শন অনুসরণ ও বাস্তবায়ন জরুরী; সে অনুযায়ী কোন ক্রমেই উন্নয়নের অজুহাতে নদীর জমি কোনোভাবেই দখল, হস্তান্তর, লীজ বা অধিগ্রহণও করা যাবেনা। মহামান্য সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ৩৫০৩/২০০৯ নং রীট পিটিশন রায়ে প্রদত্ত নির্দেশনা, মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের সিভিল পিটিশন নং ৩০৩৯/২০১৯ রায়ে প্রদত্ত নির্দেশনা, ভূমি মন্ত্রনালয়ের পরিপত্র ও এসএটিএ ১৯৫০ এর ৮৬ ও ৮৭ ধারার বিধানবলি পর্যালোচনায় এটি সুস্পষ্ট যে, নদীর জমি পাবলিক প্রোপার্টি এবং এর মালিকানা সত্ত্ব ও স্বার্থ জনসাধারণের পক্ষে সর্বদাই রাষ্ট্র বা সরকার ও জেলা কালেক্টর। নদীর জমির শ্রেণি পরিবর্তনযোগ্য নয় কিংবা কোনভাবেই হস্তান্তরযোগ্য ও বন্দোবস্তযোগ্য নয়। প্রণিধানযোগ্য যে, নদ নদীর জমি, তীরভূমি ও ফোরশোর রক্ষা ও ব্যবস্থাপনা আইন ও বিধি বিধান খাস জমি বন্দোবস্ত দেয়ার বিধি বিধান বা নীতিমালার থেকে ভিন্ন যা অবশ্যই প্রতিপালনীয় ও অনুসরণীয়।
গত ৩ জুন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সচিব মো: আমিনুল ইসলাম জেলা প্রশাসকের বরাবরে প্রেরিত চিঠিতে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক প্রতিবেদন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে প্রেরণের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিটির যার অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও ঢাকা বিভাগীয় নদী রক্ষা কমিটির আহবায়ককে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও