স্বল্প বেতনে কাজ করানো হতো শিশু কিশোরদের

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:৪৯ পিএম, ১০ জুলাই ২০২১ শনিবার

স্বল্প বেতনে কাজ করানো হতো শিশু কিশোরদের

শিল্পকারখানায় শিশু শ্রম নিষিদ্ধ হলেও নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের সেজান জুস কারখানায় অল্প বেতনের বিনিময়ে শিশু কিশোরদের দিয়ে কাজ করানো হতো। এছাড়া শ্রমিকদের নিরাপত্তায় কোন ধরনের সরঞ্জামও ছিলনা। অগ্নিকান্ড প্রতিরোধমূলক সরঞ্জামও ছিলনা। শুক্রবার কারখানাটিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধারের পরে এ চিত্র দেখা গেছে। মালিকপক্ষকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও এবিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি কাজকে চিহ্নিত করেছে সরকার। শ্রম আইনের ৩৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে কারখানাতে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেয়া যাবেনা। আবার ৪৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে ১২ বছরের উপরের শিশুদের হালকা কাজে নিয়োজিত করা যাবে। অনেক কারখানার মালিক এ সুযোগটি নেয়। রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের সেজান জুস কারখানাতেও কাজ করানো হতো শিশু কিশোরদের।

নিখোঁজের সন্ধানে আসা দুই বোন লিমা ও ঝুমা জানান, তাদের নিখোঁজ ছোট বোনের নাম ইসরাত জাহান ফুলি, বয়স ১৬ বছর। সে সেজান জুস কারখানায় কাজ করতো। তাদের গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায়। মহামারীর মধ্যে পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় ছোট বোনটিকেও তারা কারখানার কাজে পাঠাতে বাধ্য হন। লিমা জানান, পোশাক কারখানাগুলোতে কম বয়সীদের নেয় না। তবে হাসেম ফুডসে সেই সুযোগ ছিল বলে স্থানীয় অনেক কিশোর-কিশোরীই সেখানে কাজ করত।

ঝরনা বেগম জানান, তার ১৪ বছর বয়সী মেয়ে ফারজানা গত তিন বছর ধরে পাঁচ হাজার টাকায় এ কারখানায় কাজ করছিল।

ফারজানার সহকর্মী ১৬ বছর বয়সী মৌমিতা জানালেন, হাসেম ফুডস কারখানায় সেজান জুস, চানাচুর, সেমাই, চকলেটসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি হত। তবে বৃহস্পতিবার বিকালে যখন আগুন লাগে তিনি তখন কাজে ছিলেন না। মৌমিতা আরো জানান, তার বয়সী অনেক কিশোর-কিশোরী ছিল কারখানার কর্মীদের মধ্যে। তবে কম বয়সীদের সাধারণত রাতের পালায় রাখা হত না।

নিখোঁজ শ্রমিক কিশোরী তাসলিমা (১৬) এর মা ফিরোজা বলেন, তাসলিমার জন্ম কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। বাবা বাচ্চু মিয়া দিনমজুর। সংসারের অভাব ঘোচাতে পাঁচ বছর আগে মাত্র ১১ বছর বয়সে হাসেম ফুডের কারখানাটিতে শ্রমিকের কাজ নেয় তাসলিমা। পাঁচ বছর পর এসে তাসলিমার বেতন দাঁড়িয়েছিল ৫ হাজার ৬০০ টাকা। ফিরোজা নিজেও এই কারখানার শ্রমিক। মেয়ের আগে থেকেই কারখানার দোতলায় টোস্ট শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। বৃহস্পতিবার আগুন লাগার সময়েও মামেয়ে কারখানাটির আলাদা দুটি তলায় কাজ করছিলেন।

দুপুরে সে কথা বলেই বিলাপ করছিলেন ফিরোজা। বিলাপের সুরে তিনি জানান, কারখানায় আগুন লাগার পর জীবন বাঁচাতে কারখানার দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি। তখনই কারখানার চারতলায় আটকেপড়া মেয়ে তাসলিমার কথা মনে পড়ে। ছুটে যেতে চান কারখানার চারতলায়। কিন্তু কারখানার নিচের ফটক বন্ধ পেয়ে হালিমার আর কারখানার ভেতরে যাওয়া হয় না।

তাসলিমার চাচি আমিনা বেগম অভিযোগ করেন, আগুন লাগার সময় কারখানার নিচের ফটকটি বন্ধ ছিল। এ কারণে অনেক শ্রমিকই কারখানাটি থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি।

আহত শ্রমিক হালিমার মা শাহানা জানিয়েছেন, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। এর মধ্যে বড় মেয়ে সাদিয়া ও ছোট মেয়ে হালিমা একই কারখানায় কাজ করেন। বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় বড় মেয়ে সাদিয়া বের হওয়ার পরই ছোট মেয়ে হালিমা কাজে যোগ দেন। তিনি বলেন, এর কিছুক্ষণ পরই একজন ফোনে কল দিয়ে আগুন লাগার খবর জানান। এরপর তাঁরা রাতভর হালিমাকে খুঁজেছেন। অবশেষে না পেয়ে ঢাকা মেডিকেলে আসেন। সেখানে তাঁর ছোট মেয়েকে অচেতন অবস্থায় পান, অচেতন এখনো। তিনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন।

শাহানা জানান, তাঁর দুই মেয়েই চার মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন, বেতন পান প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা। শাহানা নিজেও একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। আর তাঁর স্বামী আলমগীর কাজ করেন আরেকটি কারখানায়। তাঁরা থাকেন রূপগঞ্জ শহরের গাউছিয়া এলাকায়। ১৯ মাস আগে এই পরিবার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ আসে জীবিকার সন্ধানে।

শ্রমিকনেতা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল জানান, শ্রম আইন ও আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী যেকোন কারখানা কিংবা প্রতিষ্ঠানে ১৪ বছরের নিচের কোন শিশুকে কাজে যুক্ত করা যাবেনা। আর ১৪ বছরের উপরের কোন শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা যাবেনা। তাদেরকে হালকা কাজে নিয়োজিত করলেও লেখাপড়া ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যার ন্যূনতম সাজা ৬ মাসের জেল।

শ্রমিকনেতা জাহাঙ্গীর আলম গোলক জানান, কারখানাগুলোর মালিকপক্ষ অধিক মুনাফার জন্য আইন অমান্য করে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে। তারা সবসময়ই চেষ্টা করে শিশু শ্রমিকদের কত কম মজুরীতে কাজে নিয়োগ দেয়া যায়। একজন শিশু শ্রমিককে সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়ে অল্প বেতন দেয়া হচ্ছে। কারখানা মালিকরা ও তাদের নিয়োজিত এজেন্টরা সাধারণত দুর্গম এলাকাগুলোতে টার্গেট করে শিশু শ্রমিকদের এনে কাজ দিয়ে থাকে।

এদিকে কারখানার বহুতল ভবনগুলোতে হাইড্রেন্ট পয়েন্ট রাখতে হয়। প্রতিটি তলায় ফায়ার স্টিংগুইসার, হ্যান্ড গ্লাভস, ফার্ষ্ট এইড বক্স থাকতে হয়। ফায়ার লিফট, এমারজেন্সী এক্সিট থাকতে হবে। তবে সেজান জুস কারখানায় সেগুলো কিছুই ছিলনা। সেজান জুস কারখানার ভেতরে প্রচুর ভোজ্যতেল পাওয়া গেছে, যার কারণে আগুন বেশি সময় ধরে জ্বলেছে বলে মনে করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বৃহস্পতিবার রাত থেকে সজীব গ্রুপের ওই কারখানায় আগুন নেভানোর কাজ করেছেন ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মনির হোসেন ও পরিদর্শক ফখর উদ্দিন। তারা জানান, কারখানার ভেতরে অগ্নিনির্বাপনের তেমন কোনো সরঞ্জাম তারা দেখেননি।

কর্মশালায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ মহা পরিদর্শক সোমেন বড়–য়া বলেন, নারায়ণগঞ্জে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক পেশায় যাতে শিশুদের নিয়োগ দেয়া না হয় সেজন্য মালিকদের নিরুৎসাহিত করণের লক্ষ্যে আমরা ইতিপূর্বে একাধিক কর্মশালার আয়োজন করেছি। আমরা মালিকদেরকে আইনের বিষয়টি জানানো ছাড়াও তাদেরকে সতর্ক করেছি। শিশু শ্রম ও শ্রমিকদের নিরাপত্তায় আমরা একাধিকবার নোটিশ দিয়েছি। যাতে মালিকরা ভবিষ্যতে শিশুদের এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক পেশায় নিয়োগ না দেয়। তবে শ্রম আইনের ৩৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে কারখানাতে শিশু শ্রমিক নিয়োগ দেয়া যাবেনা। আবার ৪৪ ধারায় উল্লেখ রয়েছে ১২ বছরের উপরের শিশুদের হালকা কাজে নিয়োজিত করা যাবে। অনেক কারখানার মালিক এ সুযোগটি নেয়।

শিশু কিশোরদের এভাবে কারখানায় কাজ করানো এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে হাসেম ফুডসের কর্মকর্তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর কারখানার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরো ৪৯ জন হতভাগ্য শ্রমিকের মরদেহ। কারখানাটির ৪র্থ তলা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে এই ৪৯টি মরদেহ। ৪র্থ তলা ও ছাদের গেইট বন্ধ থাকায় এত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটেছে বলে মন্তব্য ফায়ার সার্ভিসের। দুপুরে মরদেহগুলো ফায়ার সার্ভিসের ৫টি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে। এতে করে সেজান জুসের কারখানায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাড়িয়েছে ৫২ জনে। আহতদের করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রূপগঞ্জের কর্ণগোপে ইউএস বাংলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও