৪৯ মানুষ পুড়ে কয়লা

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৫:১৩ পিএম, ১০ জুলাই ২০২১ শনিবার

৪৯ মানুষ পুড়ে কয়লা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডে বৃহস্পতিবার বিকেলে অগ্নিকান্ডের পর রাতে যখন তিনজনের মৃত্যুর খবর আসে তখন কারখানার ভেতরে আটকে ছিল শত শত নারী পুরুষ শ্রমিক যাদের একটি অংশ ছিল শিশুও। রাতভর ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টার পর শুক্রবার ভোরে আলো ফোটার আগেই কারখানার আশেপাশে তখন স্বজনদের ভীড়ে চলছিল আহাজারি। লকডাউন উপেক্ষা করেই অটো রিকশা সহ বিভিন্ন যানে করে যখন জড়ো হয় তখনো কারখানার ভেতরে আগুন জলছিল। আর সেই দৃশ্যে স্বজন হারাদের আর্তনাদে সেখানে এমন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় যা দেখে আশেপাশের লোকজন থেকে শুরু করে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিসের লোকজনের চোখের কোনে জল ছল ছল করছিল। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টার পর থেকে যখন একে একে মরদেহ বেরা করা হতে থাকে তখন আর কেউ চোখের জল আটকাতে পারেনি। কারো জল পড়েছে অঝোরে, কেউ বার কেঁদেছেন ঢুকরে। আর স্বজন হারাদের কান্নায় কেঁদে উঠে আশপাশ এলাকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলত আর টিভির পর্দায় সেই দৃশ্যে সারাদেশের মানুষই আতকে উঠে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন বলছেন অগ্নিকান্ডে নিহত কারো চেনা যায় না। তারা মূলত আগুনে পুড়ে নিঃশ্বেস হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া কারো পরিচয় শনাক্ত করা যাবে না।

রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ লিমিটেডের সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনার ২০ ঘণ্টা পর কারখানার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরো ৪৯ জন হতভাগ্য শ্রমিকের মরদেহ। কারখানাটির ৪র্থ তলা থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে এই ৪৯টি মরদেহ। দুপুরে মরদেহগুলো ফায়ার সার্ভিসের ৫টি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে। এতে করে সেজান জুসের কারখানায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, শুক্রবার দুপুরে ৪৯টি মরদেহ ফায়ার সার্ভিসের ৫টি অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেখানে পরিচয় শনাক্তের পর লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর আগে বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনার দু’জন শ্রমিক মারা যায়। হাসপাতালে নেওয়ার পরে আরো একজনের মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকরা জানান, কর্ণগোপ এলাকায় সেজান জুস কারখানায় প্রায় সাত হাজার শ্রমিক কাজ করেন। সাত তলা ভবনে থাকা কারখানাটির নিচ তলার একটি ফ্লোরের কার্টন থেকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এক পর্যায়ে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় কালো ধোয়ায় কারখানাটি অন্ধকার হয়ে যায়। শ্রমিকরা ছোটাছুটি করতে শুরু করে। কেউ কেউ ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। আবার কেউ কেউ ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়তে শুরু করেন।

ছাদ থেকে লাফ দিতে গিয়ে প্রাণ হারান কারখানার দুই শ্রমিক। নিহতরা হলেন সিলেট জেলার যতি সরকারের স্ত্রী স্বপ্না রানী (৩৪) এবং রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল নতুন বাজার এলাকার হারুন মিয়ার স্ত্রী মিনা আক্তার (৩৩)। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর আরেকজনের মৃত্যু হয়। তার নাম মোরসালিন (২৮) বলে জানিয়েছেন মেডিকেল পুলিশ ফাড়ির পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া। মোরসালিনের বাড়ি দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার উত্তর সুবেদপুর গ্রামে। বাবার নাম আনিসুর রহমান। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড় ছিলেন।

আগুনে দগ্ধ ও ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত স্বপ্না, মানিক, আশরাফুল, সুমন, সজিব, মেহেদী, মুন্না, মাজেদা, রুমা, মনোয়ারা, নাদিয়া, আছমা, মারিয়া, রুজিনা, সুমা, শফিকুল, সুফিয়া, সুজিদা, পারুল, রওশন আরা, শ্যামলাকে রূপগঞ্জের কর্ণগোপ ইউএস-বাংলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া নাহিদ, মঞ্জুরুল ইসলাম, মহসীন হোসেন, আবু বকর সিদ্দিক, আমেনা বেগম ও ফাতেমা আক্তারকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। আহত আবু বকর জানান, কারখানায় আগুন লাগার পর বাঁচার জন্য ভবন থেকে লাফ দিয়েছিলেন তিনি, তখনই আহত হন।

নিখোঁজদের তালিকায় ছিলেন: নারায়ণগঞ্জের হাকিম আলীর মেয়ে ফিরোজা বেগম, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ফিরোজা, তার মেয়ে সুমাইয়া, উপজেলার গোলাকান্দাইল আফজালের স্ত্রী নাজমা বেগম, গোলাকান্দাইল খালপাড়ের রাজিবের স্ত্রী আমেনা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার গোলামের ছেলে মো. মহিউদ্দিন, একই উপজেলার ফখরুল ইসলামের ছেলে শামীম, ভোলা জেলার ইসমাইলের মেয়ে হাফেজা, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার তাহের উদ্দিনের ছেলে নাঈম, একই জেলার নিতাই উপজেলার স্বপনের মেয়ে শাহিদা, মৌলভীবাজারের পরবা বরমনের ছেলে কমপা বরমন, ভোলার তাজুদ্দিনের ছেলে রাকিব, কিশোরগঞ্জের কাইয়ুমের মেয়ে খাদিজা, নেত্রকোনার জাকির হোসেনের মেয়ে শান্তা মনি, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার সেলিমের স্ত্রী উর্মিতা বেগম, কিশোরগঞ্জের কাইয়ুমের মেয়ে আকিমা, নেত্রকোনার কবির হোসেনের মেয়ে হিমা, রংপুরের মানসের ছেলে স্বপন, কিশোরগঞ্জের মাহাতাব উদ্দিনের স্ত্রী শাহানা, কিশোরগঞ্জের আব্দুর রশিদের মেয়ে মিনা খাতুন, পাবনার হাঠখালির শাহাদত খানের ছেলে মোহাম্মদ আলী, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ফজলুর ছেলে হাসনাইন, জামালপুরের মো. শওকতের ছেলে জিহাদ রানা, কিশোরগঞ্জের মো. সেলিমের মেয়ে সেলিনা, নরসিংদীর শিবপুরের জসিম উদ্দীনের স্ত্রী রিমা, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুজনের মেয়ে রিনা আক্তার, চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার হাছান উল্লাহর ছেলে পারভেজ, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার গোকুলের ছেলে মাহাবুব, গাজীপুরের সেলিম মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া (ইয়াসিন), ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মান্নান মাতাবরের ছেলে নোমান মিয়া, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার আবল কাশেমের ছেলে রাসেদ, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার এনায়েতের ছেলে বাদশা, ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার ইউসুফ, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার আবুল বাসারের ছেলে জিহাদ, শাকিল, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের খোকনের স্ত্রী জাহানারা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কবিরের ছেলে মো. রাকিব, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার সুরুজ আলীর মেয়ে ফারজানা, কিশোরগঞ্জের চানমিয়ার ছেলে নাজমুল, কিশোরগঞ্জের বাস্তু মিয়ার ছেলে তাছলিমা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মো. রাকিব, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মো. বাহারের ছেলে মো. আকাশ, কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়ার মেয়ে তাছলিমা, কিশোরগঞ্জের আজিজুল হকের মেয়ে মোছা. রহিমা, গাইবান্ধার প্রফেসর কলনির হাসানুজ্জামানের মেয়ে নুসরাত জাহান টুকটুকি, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি থানার চান্দু মিয়ার মেয়ে রাবেয়া, কিশোরগঞ্জের মালেকের মেয়ে মাহমুদা, নেত্রকোনার খালিয়াঝুড়ি উপজেলার আজমত আলীর মেয়ে তাকিয়া আক্তার, হবিগঞ্জের আব্দুল মান্নানের মেয়ে তুলি, কিশোরগঞ্জের নিজামউদ্দিনের মেয়ে শাহানা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ফয়জুল ইসলামের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন সজীব, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার লালচু মিয়ার ছেলে লাবণ্য আক্তার।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও