ফের কাউন্সিলর হতে চান নূরের বান্ধবী নীলা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:২৪ পিএম, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ সোমবার

ফের কাউন্সিলর হতে চান নূরের বান্ধবী নীলা

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুনের মামলার প্রধান আসামী কাউন্সিলর নূর হোসেনের কথিত স্ত্রী কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস নীলার অবাধ বিচরণ ছিল সবার সঙ্গে। নিজের সৌন্দর্য্যকে পুঁজি করে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে গড়ে তুলেছিলেন সখ্যতা। সংসদ সদস্য, শামীম ওসমান, সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার, নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে প্রায়ই দেখা যেত। নূর হোসেনের স্ত্রী পরিচয়ে বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। কেন্দ্রীয় বেশ কয়েকজন রাজনীতিকের সঙ্গেও নীলার দহরম মহরম সম্পর্ক ছিল বলে শোনা গেছে। নূর হোসেনও নীলাকে ব্যবহার করে তার অনেক স্বার্থ হাসিল করেছিল। নূর হোসেনের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে একসময় মাদক ব্যবসাতেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল নীলা। তবে ৭ খুনের পরে নূর হোসেনের সা¤্রাজ্য তছনছ হয়ে পড়লে নীলার সেই আধিপত্য যেমন মুখ থুবড়ে পড়ে তেমনি কমে যায় অবাধ বিচরণ। ৫ বছর আগে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলর নির্বাচনে মনোনয়ন যুদ্ধেও ছিটকে পড়েছিল লাস্যময়ী নীলা। তবে আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আবারো কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চায় নীলা। ইতিমধ্যে স্থানীয় একটি আওয়ামীলীগের কর্মীসভায় তাকে শোডাউন করতে দেখা গেছে। এছাড়া বিতর্কিত সেই নীলাকে কাউন্সিলর দেখতে চেয়ে পোষ্টারও সাটানো হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর নাসিকের ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার আগে তেমন কোন প্রাচুর্য না থাকলেও আলোচিত গডফাদার কাউন্সিলর নূর হোসেনের সান্নিধ্যে অঢেল অর্থের মালিক বনেছিল নীলা। তার বাবা হাজী আবদুল মোতালেব ৩০ বছর ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে থাকলেও তেমন অর্থ সম্পদ গড়তে পারেননি। প্রাক্তন স্বামী সাদেক বাসস্ট্যান্ডের ইজারা নিলেও প্রাচুর্য তেমন একটা ছিল না। তবে বাবা কিংবা প্রাক্তন স্বামী না পারলেও নীলা মাত্র আড়াই বছরের ব্যবধানে গড়ে তুলেছিলেন অঢেল সম্পদ।

স্থানীয়রা জানান, নিজের সৌন্দর্য্যকে পুঁজি করেই মূলত কাউন্সিলর নীলা অল্প সময়ের মধ্যে নূর হোসেনকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করেন। প্রাক্তন স্বামীর বাসস্ট্যান্ডের ইজারা ও বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের বাহানায় নূর হোসেনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন নীলা। মূলত নিজের উচ্চাভিলাষী জীবনযাপনের কারণেই নীলা নূর হোসেনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন বলে অনেকের অভিমত।

জনশ্রুতি রয়েছে, সুন্দরী নীলাকে নিজের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে নূর হোসেন ব্যবহার করতেও দ্বিধাবোধ করতো না। কেন্দ্রীয় শীর্ষ অনেক নেতা ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পার্টিতে নীলা নিয়মিত ‘অতিথি’ থাকতেন। বিশেষ করে নূর হোসেন যাদের শেল্টারে সিদ্ধিরগঞ্জে ভিন্ন এক সা¤্রাজ্যের রাজা বনেছিলেন তাদেরকে খুশি করতেন নীলা। ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত পার্টি ও ফাইভ স্টার হোটেলে তাকে প্রায়ই দেখা যেতো। তার সাজসজ্জা, বেশভূষা ও কাউন্সিলর পরিচয়ের কারণে তার সম্পর্কে বিরূপ ধারনা পোষণ করতে পারতোনা কেউই। তবে হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে যাওয়ার পরে নীলার সম্পর্কে ধারনা পাল্টায় অনেকেরই।

৭ হত্যাকান্ডের মূল হোতা কাউন্সিলর নূর হোসেনের হাত ধরে ইয়াবা ও হেরোইনের ব্যবসাতেও জড়িয়ে পড়েছিলেন তার বান্ধবী আলোচিত নারী কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস নীলা। তার নির্দেশে এক লাখ টাকার চুক্তিতে খুন করা হয়েছিল জুয়েল নামের এক যুবককে। নীলার বিরুদ্ধে এক আসামী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বদলী করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ২৬ মে সেই আলোচিত নারী কাউন্সিলর নীলাকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় জুয়েল নামের এক যুবক হত্যা মামলায় নীলাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এর আগে গত ১৮ মে নারায়ণগঞ্জের সার্কিট হাউসে সুশীল সমাজের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠানে এসে সাক্ষ্য দিয়ে ফেরার পথে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন নীলা। তবে ডিবি কার্যালয়ে দুই ঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৬ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের আইউব নগর এলাকা থেকে জুয়েল নামের এক ব্যক্তির দেহ ও পরে মাথা উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনার পরদিন ২৭ অক্টোবর থানার এস আই জিন্নাহ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি আলাউদ্দিন জানিয়েছিলেন, মামলাটির প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন এসআই নজরুল। ওই মামলায় গ্রেফতারকৃত সোহাগ ও মনা নামের দুইজন আসামী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল এক আসামী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিল। এতে হত্যাকান্ডের সঙ্গে কাউন্সিলর নীলা জড়িত স্বীকার করে। কিন্তু তখন নূর হোসেনের প্রভাবের কারণে পুলিশ নীলাকে গ্রেফতার করেনি। নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করে নীলার সম্পৃক্ততার যথেষ্ট প্রমান পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করি।

ইয়াবা ও হেরোইন ব্যবসার চালানোর ৭০ লাখ টাকা লেনদেনে ঝামেলা করার কারণে কাউন্সিলর নীলার সঙ্গে ১ লাখ টাকা চুক্তিতে সিদ্ধিরগঞ্জের আইউবনগর আজিবপুর এলাকায় খুন করা হয় জুয়েলকে। মামলার পূর্বতন কর্মকর্তা তদন্তাকারী কর্মকর্তা এসআই নজরুল গণমাধ্যমকে জানান, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল আসামী মনা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। এতে মনা আদালতকে জানান কাউন্সিলর নীলার সঙ্গে ইয়াবা ও হেরোইনের ব্যবসার ৭০ লাখ টাকা নিয়ে জুয়েলের মধ্যে বিরোধ চলছিল। জুয়েল নীলার মাদকের ব্যবসা দেখাশোনা করতো। অর্থ কালেকশনেরও দায়িত্ব ছিল জুয়েলের ওপর। ওই বিরোধের জের ধরে কাউন্সিলর নীলার সঙ্গে ১ লাখ টাকা চুক্তি করে কিলার মনা, সোহাগ ও সোহেল। এসময় নীলার মামাতো ভাই শাহ আলম উপস্থিত ছিল। পরে জুয়েলকে অহিদ কসাইয়ের গোয়ালঘরে ঘরে জবাই করে হত্যার পর দেহ এখানে ফেলে দেয়। ওই ঘরের ১০ হাত দূর থেকে জুয়েলের মস্তকবিহিন লাশ উদ্ধার করা হয়। মাথা অন্যত্র ফেলে দিয়েছিল খুনীরা। মনার দু’মাস পূর্বে সোহাগ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে।

আলোচিত ৭ খুনের পরে গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নীলা বলেছিলেন, নূরের সঙ্গে আমার তেমন সখ্য ছিল না। বাবা হাজী আবদুল মোতালেবের রাজনীতির সুবাদে (৩০ বছর ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি) পরিচয়। কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর স্বামী সাদেকের শিমরাইল বাসস্ট্যান্ডের ইজারা নিয়ে নূর হোসেনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন নীলা। ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর দায়িত্ব নেয়ার পর যোগাযোগ বাড়ে। ওইসময় নূরের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে নীলার ওপর। নানা কৌশলে পরিকল্পনা আঁটে আমাকে ‘রক্ষিতা’ করার। নূরের কারনে স্বামীকে তালাক দিয়েছেন। নূর তাকে আলাদা বাড়ি গাড়ি দিয়ে ‘রাজার হালে’ রাখতে চেয়েছিল। এলাকার প্রায় সবাই তাকে নূরের স্ত্রী হিসেবে জানলেও তার সঙ্গে নূরের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এলাকার প্রায় সবাই আমাকে নূরের স্ত্রী হিসেবে জানলেও আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে হোটেল শেরাটনে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে রাতযাপন এবং একই সঙ্গে ভারত সফর করেছিলেন। দার্জিলিংয়ের একটি স্কুলে মেয়েকে ভর্তির সময় নূর হোসেন আমার সন্তানের অভিভাবক হিসেবে স্বাক্ষর করেন। এলাকার সম্পর্কে নূর হোসেনকে ‘চাচা’ ডাকতাম আমি।

নূর হোসেন বিয়ে করতে রাজী না হওয়ায় ২০১৩ সালের ২৮ মে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সামনে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল নীলা। কিন্তু ওই সময় পুলিশ দেখে ফেলায় আত্মহত্যা করতে পারেনি। পরে থানার তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার রেজাউল তাকে বুঝিয়ে বাসায় ফেরত পাঠিয়েছিলেন।

এদিকে সিদ্ধিরগঞ্জের জুয়েল হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের ২৬ মে গ্রেফতারের পর হাইকোর্ট থেকে জামিন প্রাপ্তি সাপেক্ষে ওই বছরের ৭ আগষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান নীলা। এরপর তাকে প্রকাশ্যে খুবই কম দেখা যেত। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পূর্বে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে আসেন নির্ধারিত সময়ের পরে। যে কারণে তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেনি রিটার্নিং অফিসার। দীর্ঘ এই ৫ বছর নীলাকে প্রকাশ্যে খুবই কম দেখা গেছে। এমনকি নিজেকে আওয়ামীলীগের নেত্রী দাবি করলেও আওয়ামীলীগের সভা সমাবেশেও তাকে খুব একটা দেখা যায়নি। তবে আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারো সরব হতে দেখা গেছে বহুল আলোচিত সেই নীলাকে।

এদিকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জে নাসিকের ৫নং ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগের কর্মী সভা প্রগতি সংসদে অনুষ্ঠিত হয়। যা নিয়ে চরম ক্ষোভ ও বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে। কর্মী সভায় নারায়ণগঞ্জ জেলা, মহানগর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের কেউ উপস্থিত না হওয়ায় গুরুত্ব হারিয়েছে ওই কর্মীসভা।

জানা গেছে, প্রগতি সংসদে অনুষ্ঠিত কর্মী সভার ব্যানারে লেখা ছিলো সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের নির্দেশনায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অথচ এ সভায় থানা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দরা যোগ দেননি। তবে সভায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা মহিলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদিকা ও সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম উপস্থিত হলেও অতিথির আসনে স্থান পাননি। উল্টো বিতর্কিত সাবেক নারী কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌস নীলাকে অতিথির আসনে স্থান দেয়ায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আবার অনেকে প্রতিবাদ স্বরুপ সভাস্থল ত্যাগ করেন।

যে কারণে খোদ আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরাই বলছেন ওসমান পরিবারের কাছে এখন হাইব্রীড ও বিতর্কিত নীলাদেরই কদর বেড়েছে।

এদিকে বিতর্কিত সেই নীলাকে আবারো কাউন্সিলর দেখতে চেয়ে পোষ্টার সাটানো হয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা জুড়ে। যা নিয়েও উঠেছে সরব সমালোচনার ঝড়। অনেকেই বলছেন লাস্যময়ী নীলা নিজের রূপ সৌন্দর্য্যের ঝলসানি দিয়ে আবারো আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের কুপোকাত করে কাউন্সিলর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চান। যে কারণে বর্তমান কাউন্সিলর ও মহিলা আওয়ামীলীগের নেত্রীও উপেক্ষিত হয়েছে অনেকের কাছে।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও