কথায় কথায় খুন

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০০ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২১ রবিবার

কথায় কথায় খুন

বন্দরের মদনপুরে আবারও যুবক খুন হয়েছে। বন্দরের মদনপুর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও ড্রেজার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দু`পক্ষের সংঘর্ষে জুয়েল মিয়া নামের (২৫) যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত জুয়েল মিয়া মদনপুর ইউনিয়নের আন্দিরপাড় এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে। বুধবার রাত আনুমানিক ১০টার দিকে মদনপুর ইউনিয়নের সাইরাগার্ডেন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

জানাগেছে, নারায়ণগঞ্জ বন্দরের উত্তরাঞ্চল খ্যাত মদনপুর জন সাধারণের কাছে এক আতংকের নাম। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পরিবহন সেক্টর, জমি দখল সহ মাদক ব্যবসা, ড্রেজার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মত ঘটনা এমনকি মানুষ হত্যা যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন একটা সময় গেছে মদনপুরের মুরাদপুর, চাঁনপুর, ফুলহর, হরিপুর এলাকায় সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে সাহস পেত না। ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজি সহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনার ফলে বন্দরের উত্তরাঞ্চল সন্ত্রাসী ও অন্ধকার নগরীতে পরিণত হয়েছিল। নতুন করে সে মদনপুর আবার খবরের শিরোনামে এসেছে।

গত বছর পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বন্দরের মদনপুরে ইউপি সদস্য খলিলুর রহমানকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনার রেশ না কাটতেই তার বাহিনী মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশের উপর হামলা করে। সংঘর্ষের এই ঘটনায় পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময় হয়। এতে শাকিল নামের এক যুবক নিহত হয় ও বাবু নামের আরেকজন গুলিবিদ্ধ হয়। তবিয়তে ঘটনার মূলহোতা খলিল ওরফে বরকি খলিল মেম্বার। এককালের সন্ত্রাসের জনপদ খ্যাত বন্দরের উত্তরাঞ্চল তথা মদনপুরে খলিল বাহিনীর উত্থানের পর পুনরায় আতংকের জনপথে পরিণত হযয়েছে। কামু-সুরত আলী বাহিনীর অবসান হলেও নব্যগডফাদার রুপে নিজেকে জাহির করতে বেপোরয়া হয়ে উঠেছে খলিল মেম্বার ওরফে বরকি খলিল।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে চাঁনপুর ও ফুলহর গ্রামের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডের নেতৃত্বের লড়াইয়ে গত দেড়যুগে অনেক ঘটনা ঘটেছে। একসময়ে আতঙ্কের নাম ছিল মদনপুর। মদনপুরের নাম শুনলেই আঁতকে উঠতো সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। বন্দর উত্তরাঞ্চলের মদনপুর এলাকার ভয়ঙ্কর শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান কামরুজামান কামু ও সুরুত আলী মারা যাওয়ার পর গত ৫-৭ বছর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মদনপুর এলাকার এক শিল্পপতির পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁনপুর গ্রামের মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে কাবিলা এক সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে। আস্তে আস্তে সে পরিবহন সেক্টর ও স্থানীয় রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা দোকানপাটের চাঁদাবাজি তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এসব সেক্টর থেকে প্রতিমাসে ৭০-৮০ লাখ টাকার চাঁদার ভাগ বসাতে খলিল মেম্বার চাঁনপুর এলাকায় এক বাহিনী গঠন করে।

এরপর থেকে চাঁদার টাকা উত্তোলন নিয়ে দুই গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এ নিয়ে খলিল ও কাবিলা গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তারা দুই গ্রুপই ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট। খলিল মেম্বার মদনপুর ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডে দুইবার নির্বাচিত হন। তিনি ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের স্ব-ঘোষিত সভাপতি। অন্যদিকে কাবিলা বন্দর উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে জানা যায়।

এলাকাবাসী জানান, ২০০০ সালের আগে উপজেলার মদনপুর মুরাদপুর গ্রামের কামাল উদ্দিনকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। এ হত্যাকান্ডের পর থেকে কামাল উদ্দিনের ছেলে কামরুজ্জামান কামু বদলা নিতে সন্ত্রাসী কার্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। তার কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপ সন্ত্রাসী কামুকে না পেয়ে তার মা ফুলবিবিকে কুপিয়ে হত্যা করে। পিতা ও মাতার হত্যার বদলা নিতে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে কামু। তার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যোগ দেয় তার ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা, মনিরুজ্জামান মনু, বড় ভাই বাবুল আক্তার ও আবুল হোসেন। পুরো মদনপুর এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তার ও পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির ভাগ বসাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নেয় চাঁনপুর গ্রামের স্বর্ণ মিয়ার ছেলে সুরুত আলী। এ নিয়ে কামু বাহিনী সুরুত আলীর ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে।

এরপর থেকে মদনপুর এলাকায় একের পর হত্যাকান্ড রক্তপাতের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের এক রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। সুরুত আলী ও কামু দুই বাহিনীর মধ্যে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। যাকে যেখানে পাওয়া যেত সেখানেই হত্যা করা হতো। সুরুত আলী বাহিনীর হাতে কামরুজ্জামান কামুর ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা ও বড় ভাই বাবুল আক্তার খুন হয়। ওই হত্যাকান্ডের কয়েক মাস পর কামুর বড় বোন নিলুফা বেগমকে তুলে নিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় সুরুত আলী বাহিনী। এরপর কামুর ছোট বোন রেহানা বেগমকে তুলে নিয়ে লাশ টুকরা টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। এখনো লাশের সন্ধান মেলেনি। এভাবে কামু বাহিনীর সদস্য ঘোড়া দেলোয়ার, ফুলহরের শাহজাহান ও তার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাসুদকেও খুন করা হয়। সর্বশেষ খুন করা হয়েছে ফুলহর গ্রামের ব্যবসায়ী রিপনকে।

একইভাবে সুরুত আলী বাহিনীর সদস্য জুলহাস, সামছুল হক, সুমন ও তার ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে কামু বাহিনী। এ ছাড়াও কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন ও ফুলহর গ্রামের আলী আহম্মদের ছেলে মুকবুল পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। কামুর দুই ভাই ও দুই বোনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সুরুত আলীকে নয়াপুর এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যা করে শরীর থেকে মাথা কেটে নিয়ে যায় কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন। কামু স্বাভাবিক মৃত্যু ও সুরুত আলী নিহত হওয়ার পর মদনপুরের নেতৃত্ব চলে আসে চাঁনপুর এলাকার মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে বিএনপির সক্রিয় নেতা কাবিল ওরফে কাবিলার হাতে। কাবিলা উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে পুলিশ প্রশাসন থেকে রক্ষা পায়। সরকারী দলের ব্যানার সাটিয়ে খলিল ওরফে বরিশাইল্লা খলিল মেম্বার কাবিলার স্থলাভিষিক্ত হয়। কাবিলার পুরো বাহিনী খলিলের হয়ে কাজ করে। কাবিলা অন্তরালে থাকলেও খলিল মেম্বার মদনপুরের পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, মাদক পাঁচার ও বিক্রির সিন্ডিকেট, ডাকাতির একটি দলও গঠন করে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও