ফতুল্লা ইউনিয়নবাসী অভাগা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৬ পিএম, ১ অক্টোবর ২০২১ শুক্রবার

ফতুল্লা ইউনিয়নবাসী অভাগা

দ্বিতীয় ধাপে দেশের ৮৪৮ টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যেখানে নারায়ণগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়ন রয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী সদস্যপদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ আগামী ১৭ অক্টোবর। মনোনয়নপত্র বাছাই ২০ অক্টোবর ও প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৬ অক্টোবর। ভোট গ্রহণ হবে ১১ নভেম্বর। কিন্তু এবারও তালিকাতে নাই ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর থেকে অদ্যাবধি নির্বাচন হচ্ছে না। গত কয়েকদিন ধরেই এ ইউনিয়নের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যাপক তোড়জোড় করলেও নির্বাচনের তালিকাতে নাম না থাকায় তারাও হতাশ।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ ফতুল্লা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের মধ্যে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কার্যালয়সহ নারায়ণগঞ্জ আদালত ও জেলা কারাগার রয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এমনকি জেলা পরিষদ, এলজিডিআর ও উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ও রয়েছে এই ইউনিয়নে।

অভিযোগ উঠেছে, ১৯৯৬ সালে ফতুল্লা ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান নূর হোসেন ও ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মালেক মিলে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পর্দার আড়ালে থেকে তাদের নিজস্ব লোক দিয়ে হাইকোর্টে ইউনিয়নের পক্ষে ও বিপক্ষে দুইটি মামলা দায়ের করান। এতে ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত রাখতে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন। ফলে এ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হওয়া এখনো অনিশ্চিত। তবে মামলার বাদীরা নির্বাচন চালানো নিয়ে আপত্তিসহ মামলা তুলে নেয়ার চেষ্টা করলেও বর্তমান ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন ও ৫নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল মালেক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা চায় তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন না হয়।

এদিকে ইউনিয়নের পক্ষে ও বিপক্ষে দায়ের করা পৃথক দুইটি রিট মামলার দুই বাদীর নাম পরিচয় এখনো অনেকেই জানেন না। আর কি কারণে ২৬ বছর যাবত ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয় না তারও কোনো খোঁজ খবর নেয়নি কেউ। এতে করে চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা নির্বাচন ছাড়াই পরিষদের সকল ধরনের সুবিধা গ্রহণ করছে। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের তেমন কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না। ইউনিয়নের জনগণ ভোটের কথা ভুলেই গেছেন। বেশির ভাগ লোকই বলতে পারছে না শেষ নির্বাচন কত সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মামলার বাদীর মধ্যে একজন হলেন ফতুল্লার কুতুবআইল (ইরান গার্মেন্ট সংলগ্ন) এলাকার মৃত হাসান আলী মাতবরের ছেলে কদর আলী মাতবর অপরজন একই এলাকার পার্শ্ববর্তী বাড়ির মৃত সোহরাফ মাতবরের ছেলে হানিফ মাতবর। এদের মধ্যে কদর আলী মাতবর ফতুল্লা ইউনিয়নকে পৌরসভা করার দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে রিট মামলা করেছিলেন। আর হানিফ মাতবর ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ বহাল রাখার দাবি জানিয়ে রীট মামলা করেছিলেন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার পদেও প্রার্থী হয়েছিলেন।

কদর আলী মাতবর জানিয়েছিলেন, আমি কোনো রিট মামলা করিনি। নূর হোসেন চেয়ারম্যান ও আব্দুল মালেক মেম্বার আমাকে ও হানিফকে বেড়ানোর কথা বলে বাসা থেকে ডেকে গাড়িতে উঠিয়ে ঢাকা হাইকোর্টে নিয়ে যায়। ঘনিষ্টতার কারণে তাদের সব কথাই শুনতাম আমি ও হানিফ। হাইকোর্টে একজন নারী আইনজীবীর চেম্বারে নিয়ে দুইটি কাগজ বের করে দুইজনকে দিয়ে স্বাক্ষর করান। তখন আমরা দুজনেই জিজ্ঞেস করি কিসের কাগজে স্বাক্ষর করালেন। তারা আমাদের বলেছে একটি মামলা করবো। সেখানে তোমরা দুইজন সাক্ষী দিবে। পরে সব বুঝিয়ে বলবো। এরপর শুনি তারা দুজন আমাদের দুজনকে দিয়ে দুইটি মামলা করিয়েছে। ওই নারী আইনজীবীর নাম বলতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর নূর হোসেন চেয়ারম্যানের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর ১৫ দিন পর মালেক মেম্বারকে নিয়ে আমি ও হানিফ হাইকোর্টে যাই। এরপর সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিতে অনুরোধ করি আইনজীবীকে। এতে তিনি দুইটি কাগজে স্বাক্ষর রেখে বলেন, এটি আদালতে জমা দেয়ার পর আপনাদের মামলা প্রত্যাহার হয়ে যাবে। আর আদালতে আসতে হবে না। একই কথা বলেন হানিফ মাতবর। তার অভিযোগ, আব্দুল মালেক মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করেছেন।

২০১১ সালের ৫ অক্টোবর নূর হোসেন চেয়ারম্যানের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের নেতা ও ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার লুৎফর রহমান স্বপন।

জনভোগান্তি চরমে : এদিকে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়েও ফতুল্লা ইউনিয়নের বাসিন্দারা উন্নয়ন বঞ্চিত রয়েছেন। জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলেও কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায়। অত্র ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা বর্তমানে প্রধান সমস্যা। এছাড়া ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ সিস্টেম নিয়েও সমস্যা প্রকট। জবাবদিহিতা না থাকায় যেকোন সমস্যায় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হতে গিয়েও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

এ বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার লুৎফর রহমান স্বপনের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও