আইভীর আত্মসমর্পণ!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৯ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০২০ বুধবার

আইভীর আত্মসমর্পণ!

মহানগরীর ফুটপাত দেখলে মন খারাপ হয় নগরমাতার। তিনি একটা অনুশোচনায় ভোগেন। নগরীর উন্নয়নের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক কিছুই তিনি করতে পারছেন না। মনের মত সাজাতে পারছেন না প্রিয় নারায়ণগঞ্জকে। সবকিছু তার হাতেও নেই। তিনি নগরীর পুঞ্জিভূত সমস্যাগুলো দেখে আজকাল অসহায় বোধ করেন। তাঁর মন কেঁদে উঠে। প্রিয় নগরীতে তাঁরই চোখের সামনে মানুষ ফুটপাতে হাঁটার অধিকার হারিয়েছে। ফুটপাতে হকারের দাপট। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারাতে বসেছিলেন। তবুও একচুল ছাড় দিতে চাননি। এবার করোনা মহামারিকালে মানুষ ৫/৬ মাস আয় রোজগার করতে পারেননি বিধায় ছাড় দিয়েছিলেন অটোরিক্সাকে। এই সুযোগে মহানগরী এখন মহাজঞ্জালে পরিণত হয়েছে। করোনার ফাঁক-ফোকর গলিয়ে হকার, অবৈধ দখলদার ও রাজনৈতিক পান্ডারা নগরীর নকশা বদলে দিয়েছে। নগরীতে এখন হেঁটে চলার অধিকার হারিয়েছে সাধারণ মানুষ। এটাই নগরমাতা আইভীর অনুশোচনার কারণ। তবে তিনি বলেদিয়েছেন শীঘ্রই মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিবেন। ব্যবস্থা নেয়া হবে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে। মেয়রের সত্যভাষণে আশ্বস্ত হয়েছে সুধীমহল।

ঘড়ির কাটায় সময় সকাল সাড়ে ৯ টা। মঙ্গলবার। শহরের ২নং রেলগেইট চত্বর। বিশাল যানজটের জঞ্জাল। কেন্দ্রীয় টার্মিনাল থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী বাস ঘুরবে। ডিআইটি থেকে রিক্সা যাবে চাষাঢ়া। কিছু রিক্সা আটকা পড়েছে অটোরিক্সার মাঝে। যে অটোরিক্সাগুলো ডায়মন্ড চত্বর থেকে পশ্চিম দেওভোগ মাদ্রাসা ও ভোলাইল পর্যন্ত চলাচল করে থাকে। এরই মধ্যে রং সাইডে ঢুকে গেছে একটি প্রাইভেটকার। সবমিলিয়ে ২নং রেলগেইট মোড়ে যানজটের জঞ্জাল

সবকিছু থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। পেছনে আলী আহাম্মদ চুনকা পৌর পাঠাগারের সামনে অনবরত সাইরেন বাজিয়ে যাচ্ছিল রোগী বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স।

যানজটের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে একজন রিক্সাযাত্রী বললেন, ‘প্রতিদিন যানজট সহ্য হয়না। ট্রাফিক পুলিশ করেটা কি ! মনটায় চায় বলেই ভদ্রলোক দাঁত মুখ খিচিয়ে ধমক দেন একজন সিএনজি চালককে। সিএনজি চালক শর্টকাট মারতে চেয়েছিল। ধমক শুনে ভয় পেয়ে আগে বাড়তে চেয়ে বাড়েনি সিএনজি চালক। কিন্তু যানজটে আটকা পড়া মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এভাবে পেরিয়ে যায় ২০ মিনিট। কেনো এমন হল।

এর জন্য দায়ী কে ? সে প্রশ্নের উত্তর নেই। ‘এই শহরের কোন মা-বাপ নাই। কেউ নিয়ম মানে না। সবাই আগে যেতে চায়।’ পাশ থেকে এ কথা বলে উঠলেন বিরিয়ানীর দোকানের সামনে বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার পাশে বসা মাঠা বিক্রেতা। কেননা, যানজটের কারণে তার মাঠা বিক্রি লাটে উঠেছে। সত্যি এই শহরের বাপ-মা নেই বলে মনে করেন বোদ্ধামহল। তাদের মতে, এই শহরে বিশেষ করে মহানগরীতে গুরুত্বপূর্ণ ৪টি পয়েন্টে নিত্য যানজট চোখে পড়ে।

পয়েন্টগুলো হল; ২নং রেলগেইট চত্বর, চাষাঢ়া মোড়, শিবুমার্কেট ও সাইনবোর্ড মোড়। শহরের যততত্র সিএনজি, প্রাইভেটকার, লেগুনা ও অটোস্ট্যান্ড।

খোদ নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, শহরের বাপ-মা নেই। যার যা খুশি তাই করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সিটি মেয়র অন্তত ১০০ পুলিশ চাইলেন। যাতে সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়। সিটি কর্পোরেশন থেকেই পুলিশের বেতন দেয়া হবে।

এদিকেসিটি মেয়র ডা. আইভী বলেছেন, ‘আমি অনুরোধ করব আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পুলিশ দেওয়া হোক। আমরা বেতন দিব। অন্তত ২০০ বা ১০০ পুলিশ আমাদের হস্তান্তর করা হোক। আমরা তাঁদেকে বেতন দিব এবং আমরা যেভাবে বলব শহরটাকে তাঁরা সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, সহযোগীতা করবে। এর বাইরে আর কিছু দেখছি না। নারায়ণগঞ্জতো একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে শহরের কোনো মা বাপ নাই।’

৫ অক্টোবর বিকেলে গঞ্জেআলী খালের সৌন্দর্য বর্ধণের জন্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর বিরক্তি প্রকাশ করেন এসব কথা বলে। তবে মেয়র এও বলেন যে, ‘সিটি করপোরেশনেরও সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদের পুলিশ নাই ম্যাজিস্ট্রেট নাই। রাস্তায় বের হলে মাইর খেতে হয়। এভাবে এক সময় আমরা চলতেও পারব না। এটার একটা সুরাহা হওয়া উচিৎ। এখন শহরে অটোরিকশা ঢুকছে আমরাও একটু ছাড় দিচ্ছি। কারণ কোভিড-১৯ এর জন্য। আপনারা জানেন যে প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস অতিবাহিত হচ্ছে। অনেকে কাজকর্ম ঠিকমত করতে পারছে না। কিন্তু এখন অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত যেহেতু হয়ে যাচ্ছে আমরা এগুলো ধরার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেছি।’

তিনি অটোরিক্সার ব্যাপারে বলেন, অটো যেমন বেড়েছে তেমিন অবৈধ স্ট্যান্ডের সংখ্যাও বেড়েছে। আমরা কিন্তু কয়েকবার পুলিশ সুপারের কাছে চিটি দিয়েছি অবৈধ স্ট্যান্ডের ব্যাপারে, অবৈধ গাড়ির ব্যাপারে। রিকশা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। ধরলাম আর ভেঙ্গে ফেললাম। কিন্তু এগুলো গরিব মানুষের জিনিস। এছাড়া বাস, লেগুনা, সিএনজি এগুলো কে নিয়ন্ত্রণ করবে? এগুলো তো আমি লাইসেন্স দেই না। সেই ব্যাপারেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিৎ। আমি তো মনে করি নারায়ণগঞ্জ শহরটা এখন বাস এবং ট্রাকের নগরী হয়ে গিয়েছে। মানুষের হাঁটার পথ নাই। চাষাঢ়াতে সড়কের উপর যে বাঁশটি দেওয়া হয়েছিল ওইটা কে সরিয়েছে বলতে পারব না। সেটা ট্রাফিক তত্ত্বাবধায়ন করতো। ট্রাফিক বলতে পারকে কেন তাঁরা ট্রাফিক উঠিয়ে দিল। আমাদের কাছে যখন যে ধরণের সহযোগীতা চায় ট্রাফিক কিংবা পুলিশ। আমরা কিন্তু সেই সহযোগীতা সবাইকে করে থাকি। অবৈধ স্ট্যান্ডগুলোর দায় দায়িত্ব হলো ট্রাফিকের। হাঁটার জন্য যুদ্ধ করেছি মৃত্যু হতে পারতো সেদিন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আপনাদের দোয়ায় আমি বেঁচে গিয়েছি। এখনো যে আমি আসলাম বঙ্গবন্ধু সড়ক দিয়ে। দেখে মনটা ভীষণ ভীষণ খারাপ হয়। দুইপাশে যেভাবে মানুষের হাঁটার অধিকার কেঁড়ে নিয়ে হকার বসেছে তা ন্যাক্কার। একইভাবে দুইপাশে সিএনজি অটো লেগুনা বিভিন্ন ধরণের স্ট্যান্ড। চাষাঢ়া, মেট্রো সিনেমা হলসহ সব জায়গায়। আমার মনে হয় এই জায়গায় আমরা অনেক বার মিটিং করেছি ডিসি অফিস ও এসপি অফিসে। কিন্তু কয়েকদিন কাজ চালু থাকে এরপর আবার ভেস্তে যায়।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নারায়ণগঞ্জ মহানগরী দিনে দিনে জঞ্জালের শহরে পরিণত হচ্ছে। এই সকল জঞ্জাল দেখলে চলতি পথে মেয়র আইভীর নিজেরই মন খারাপ হয়। তিনি অনুতাপ করেন। হায়রে ! এই আমার স্বপ্নের নগরী। এই নগরীতে আজকে মানুষের হাঁটার অধিকার নেই। অথচ নগরীর মানুষগুলো কত আশা নিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করেছেন। একা তিনি আর কত সামলাবেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০২০-২১ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিদের ইঙ্গিত করে বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু তিনি কারো নাম বলেনি। তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে শামীম ওসমানকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কারণ তাঁর নির্বাচনী আসন ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ।

১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। করোনার কারণে এবার সুধী সমাবেশ না করে আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার মিলনায়তনে ওই বাজেট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, যারা ফুটপাত দিয়ে মানুষের হাঁটাচলা প্রতিবন্ধকতা করছে তাদের পৃষ্ঠপোশকতা করছে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। তাদের প্রতি আমি ধিক্কার জানাই। এ ফুটপাত রক্ষা করতে গিয়ে আমরা মার খেয়েছি। রক্ত ঝরিয়েছি। আমরা সেইসব পৃষ্ঠপোশক জনপ্রতিনিধিদের ধিক্কার জানাই যারা শহরের ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষকে জিম্মি করে রাখছে। তারা আমাদের হাঁটার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, হকাররা যদি থানা ঘেরাও করতে পারে তাহলে আমাদের যে মারবে না সেটার কি নিশ্চয়তা আছে। কাউন্সিলররা যদি হকার উচ্ছেদ করতে যায় তাহলে হয়তো সব কাউন্সিলরদের মারবে না। কিন্তু ১৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে তো রাস্তায় মারধর শুরু হবে। তাদের এসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও সাহসের পেছনে কারা সেটা খুঁজে বের করা উচিত। তাঁকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে সাথে নিয়ে হাঁটতে চায় নারায়ণগঞ্জের মানুষ। কিন্তু তাঁর এলাকা নারায়ণগঞ্জ না। তাঁর এলাকা ফতুল্লা। সেখানে গিয়ে মাতুব্বরী করুক, নারায়ণগঞ্জ শহরে না।

আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহরের যত্রতত্র স্ট্যান্ড গড়ে তোলা হচ্ছে। শহরের খানপুরে সিটি করপোরেশনের রশিদ ছাপিয়ে টাকা আদায় করা হয়। অবৈধ রশিদসহ গোয়েন্দা সংস্থাকে একাধিকবার দেয়া হয়েছে। কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। চাষাঢ়া রাইফেল ক্লাবে এমপি সাহেব বসে থাকেন। সেখানে ক্লাবের সামনেই ২৪ ঘণ্টা অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। আমি চাই ট্রাক স্ট্যান্ড নির্ধারিত স্থানে থাকুক। কিন্তু অন্য একজন জনপ্রতিনিধি চান ট্রাক স্ট্যান্ড মন্ডলপাড়াতেই থাকবে। কারণ চাঁদাবাজি করতেই হবে। এই চাঁদাবাজির পেছনে কারা আছে তা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু মুখ খুলি না।’

আইভী বলেন, রাজউকের সঙ্গে মামলা চলাকালেই তারা জায়গা বিক্রি করে দিয়েছে। এ শহরের জনপ্রতিনিধিরা রক্ষক হয়ে ভক্ষক হয়ে গেছে। রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগসাজশ করে শহরের একজন জনপ্রতিনিধি যিনি জনগণের জন্য কাজ করবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি তার এক বন্ধুর নামে জায়গা কিনে। ৭ কোটি টাকায় জমিটি কিনে পরেই আবার ১৪ কোটি টাকায় পপুলারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমি নিজের নামে কোন প্লট নেইনি রাজউকের কাছ থেকে। নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য জমি রক্ষা করতে গিয়ে উল্টো আমাদের মামলা খেতে হচ্ছে।

তিনি অতীত স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০০৩ সালে পৌরসভা নির্বাচনের পর আমি রাজউকের জায়গাগুলো ফেরত চেয়েছিলাম। তখন আমরা চাষাঢ়া সভা সমাবেশ করেছি। ঢাকায় গিয়ে নারায়ণগঞ্জের লোকজন রাজউক ঘেরাও করেছিল। সেখানে আমাদের কয়েকজন কাউন্সিলর বেশ বেশ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই আমি নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে বিচার রেখে যেতে চাই।

আইভী বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে। সব সংস্থা যার যার মত কাজ করছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন কিছু করতে গেলেই বিপত্তি ঘটে। রেলওয়ে ডাবল লেনের কাজ করছে। আমি বলেছিলাম সবাই সমন্বয় করে কাজ করি। ট্রেন, রিকশা বাস সব চলুক। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ডাবল লাইন হলে নারায়ণগঞ্জের উত্তর-দক্ষিণ সারা জীবনের জন্য বন্ধ থাকবে। বরফকল কন্টেইনার পোর্ট করতে চেয়েছিল। আমি বলেছি আগে রাস্তা করতে হবে। তারা বিষয়টি বুঝেছে। সে কারণে তারা আগে রাস্তা করতে চায়।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও