সেলিম আইভীর ঐক্যের পথে বাধা!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪০ পিএম, ১৪ নভেম্বর ২০২০ শনিবার

সেলিম আইভীর ঐক্যের পথে বাধা!

ঐক্যের চালে ঢিল ছোঁড়া হলো। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিরুদ্ধে জিউস পুকুর দখলের অভিযোগ তোলা হলো। সেই মানববন্ধনে কড়া বক্তব্য রাখেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা ও সহ সভাপতি চন্দন শীল। তাদের বক্তব্যে আইভীর বিরুদ্ধে বিষোদাগার করা হয়। অথচ সম্প্রতি দূর্গাপূজার সময়ে পালপাড়ায় একটি মন্দিরের পুননির্মাণ অনুষ্ঠানে এ দুইজনকে পাশে রেখেই বক্তব্য রেখেছিলেন এমপি সেলিম ওসমান। সেদিন আইভীর পক্ষে কথা বলেছিলেন। ওই মঞ্চে সেলিম ওসমানে পাশেই বসা ছিলেন খোকন সাহা ও চন্দন শীল। সেলিম ওসমান সেদিন ও এর আগে পরে অনেকবার বলেছেন তিনি আইভীর সঙ্গে বসতে চান। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানববন্ধনের পর সেই ঐক্যের যে সুবাতাস বইছিল সেই চালে ঢিল মারা হলো।

২২ অক্টোবর নতুন পালপাড়ায় পুনরায় নির্মিত সার্বজনীন পূজা মন্দিরের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেলিম ওসমান বলেন, ইতোমধ্যে আমি সম্মানিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে আমি কথা বলেছি। মেয়র মহোদয়কে আহবান করেছি আমরা এক টেবিলে বসার জন্য। মুরুব্বিদেরও বলেছি। প্রয়োজনে আমরা দুই ভাই বসবো। করোনা আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের অনেকেই মারা গেছেন। এখন আমরা দ্রুত চেষ্টা করবো নারায়ণগঞ্জের মানুষের সুখ শান্তির জন্য একটেবিলে বসার জন্য। কারণ আমরা অনেক ঝগড়া করেছি, অনেক গালমন্দ করেছি। আমরা জানি না এর পরে আমরা কাকে আনবো। এমনো হতে পারে তাঁর ভালো কাজের জন্য তাকে আমরা অনুরোধ করবো আবারো মেয়র হওয়ার চেষ্টা করো। কারণ এত লং টাইম একটা চেয়ারে বসে অনেক কিছু শিখতে পারে।

এদিকে ১১ নভেম্বর আইভী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দেওভোগের জিউস পুকুর সহ লক্ষীনারায়ণগ জিউর মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন জেলার সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।

জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ এবং জেলা ও মহানগর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে এ স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়।

খোকন সাহা বলেন, স্মারকলিপি অনুযায়ী মেয়র আইভীর আত্মীয়স্বজন এই জায়গা দখল করেছেন এই বিষয়টা আমি নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার) কাছে তুলে ধরবো। আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, যারা হিন্দু সম্পত্তি দখল করে আমার নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই নমিনেশন দিবেনা। এটা অত্যন্ত পরিষ্কার। জননেত্রী শেখ হাসিনা এদেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষাকবজ। তিনি আবশ্যই আপনাদের বিষয় বিবেচনা করবেন। হুমকি ধামকি দিবেন না। যদি হত্যা করতে চান তাহলে আমাকে হত্যা করেন। আমি শেষ পর্যন্ত জিউস পুকুর নিয়ে কথা বলবো। জিউস পুকুর সহ সব জায়গা উদ্ধার করবো।

চন্দন শীল বলেন, শুধু দুঃখের সাথে বলতে চাই, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদেরকে আমরাই ভোট দিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসাতে আপনাদের অনুরোধ করেছি। একারণে দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু দখলের নামে কাউকে হুমকি দিবেন হত্যার হুমকি দিবেন এটা হতে পারেনা।

এর প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিন হায়াৎ আইভী সময়ের নারায়ণগঞ্জকে দেওয়া প্রতিক্রিয়াতে বলেছেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রোগ্রাম করা হয়েছে। মানুষকে মিথ্যা কথা বলে এখানে এনে। এবং এ প্রোগ্রামটা শামীম ওসমান সাহেব করিয়েছেন। তার নির্দেশে হয়েছে। কারণ হলো, এখানে খোকন সাহার বক্তব্যে স্পষ্ট যেন মনোনয়ন দেওয়া না হয়। তাহলে কি নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো। আর নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়েই কি আবার সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার জন্যই কি মাঠে নামানো হলো? এটা আমার প্রশ্ন?

তিনি বলেন, ‘জিউস পুকুরের সঙ্গে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। একজন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা এখানে নাই। আমার বাবা আলী আহম্মদ চুনকারও ছিল না। এ জায়গা যদি ক্রয় করে থাকে আমার নানা মাহাতাব উদ্দিন সাহেব। ওনার ক্রয়কৃত সম্পত্তি থেকে যদি তার ছেলে মেয়েরা ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাহলে কি অপরাধ আমার। এটা কখন কিনেছে মাহাতাব সাহেব এবং ও জামির আহমেদ? এটা খতিয়ে দেখা উচিত। যদি এটা ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালে ক্রয় করে থাকে তাহলে আজকে ৩৯ বছর পর এসে কেন এ প্রশ্ন করা হচ্ছে। তাহলে কোথায় ছিল সমাজপতিরা, হিন্দু সম্পত্তি রক্ষার্থে?

মানববন্ধনের পর থেকে দেওভোগ এলাকায় শুরু হয়েছে নানা কানাঘুষা। জিউসপুকুর পাড়ের হিন্দুরা বলছেন, আমরা এসব ঝামেলায় যেতে চাইনি। নেতারা বলে কয়ে নিয়ে গেছে। অনেকে বলেছে যে, তাদের ঐতিহ্যবাহী পুকুর রক্ষা করতে আন্দোলন করতে হবে। নইলে এই পুকুর আমাদের (হিন্দুদের) থাকবে না। পুকুরটি এখন আবর্জনার জঞ্জাল। ঘাটলাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। পুকুরের পানি যাচ্ছে তাই। তবুও কয়েকটি ঘাটলা চালু আছে। মাঝখানে কচুরিপানা ও নলখাগড়া গাছ-গাছালি। পুকুরের মাঝখানে যেন একটি নতুন চর ভেসে উঠবে। নল-খাগড়ার গাছবিছালির জঙ্গলকে দেখতে এমনি মনে হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বোঝানো হচ্ছে এই পুকুর থাকবে না। এটা দখল হয়ে যাবে। দখলের পর ভরাট করলেই পুকুর হারিয়ে যাবে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি নিয়ে চর্চা করেন এমন লোকজনের মতে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের মধ্যমনি এখন সেলিম ওসমান। বীরমুক্তিযোদ্ধা, ব্যবসায়ী নেতা আবার এমপি। সবচেয়ে তাঁর বড়গুণ হচ্ছে তিনি নিজেকে যে কোন অবস্থাতে ‘ইগো’ সমস্যার ঊর্ধ্বে রাখতে পারেন। এ কারণেই তাঁর কথা সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তিনি পারত পক্ষে নিজের স্বার্থ নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন না। তাঁর এই সকল বৈশিস্ট্যের কারণেই সিটি মেয়র উপমন্ত্রীর মর্যাদা পাওয়া ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী কিছুটা নমনীয় মনোভাব পোষণ করেছেন। ডা. আইভীকে মেয়র হিসেবে হোক বা আদরের বোন এর অধিকার নিয়ে হোক যতবার সেলিম ওসমান আহবান জানিয়েছেন যথাযথ সম্ভাষণের সাথে-নগরমাতা ডাঃ আইভী ইতিবাচক জবাব দিয়েছেন। এবং এক টেবিলে বসে আলোচনা করতে রাজি হয়েছেন। কোন অযুহাত তোলেন নি। এটা ওসমান পরিবারের জ্যেষ্ঠ (বর্তমানে) সন্তান হিসেবে সেলিম ওসমানের কৃতিত্ব হিসেবেই দেখছে নারায়ণগঞ্জবাসী।

বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা মনে করছেন, নগরমাতা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও এমপি সেলিম ওসমান সত্যিকার অর্থেই জনপ্রতিনিধি। তাঁরা রাজনীতি করেন জনগণের জন্য। এ জন্য জনতার স্বার্থে একসাথে কাজ করতে চাইছেন। বড় ভাই সেলিম ওসমান যথার্থই বড় ভাইয়ের কাজটি করেছেন। ছোটরা অনেক সময় রাগ গোস্যা বা অভিমান করতেই পারে। অনুযোগতো ছোটদের থাকবেই। তাই বলে বড়রা পিছিয়ে থাকলে চলেবে কেনো। এমপি শামীম ওসমান যা পারেনি। তা করে দেখাবেন সেলিম ওসমান। শামীম ওসমান আবেগের নিয়ন্ত্রণটা রপ্ত করতে ততটা শিখেনি বলেই তাঁর পরিবারের লোকজনই বলে থাকে। কিন্তু সেলিম ওসমান চান মানুষের জন্য কিছু করতে। চোখের সামনে ডাঃ আইভী দিনকে দিন নানান প্রকল্প এনে নারায়ণগঞ্জকে বদলে দিচ্ছেন। সেলিম ওসমান সেই উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চাইছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনারও তেমনি চাওয়া।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে। সিটি মেয়র মহানগরীতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইছেন তাকে সহায়তা করতে হবে। শামীম ওসমান ভালো কথা বলেও ইগো’র ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। মেয়রের সাথে তাঁর বনিবনা হয় না। একে অপরকে খোঁচা মেরে কথা বলেন।

কিন্তু তেমনটা দেখা যায় না সেলিম ওসমানের বেলায়। সেলিম ওসমান স্বীকার করেন যে, ডা. আইভীর মাথার উপর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছায়া রয়েছে। আইভী যে প্রতিকূল সময়টাতে দলের ও পৌরসভার হাল ধরেছিল-সেটা তাকে আজকে এতদূর এগিয়ে দিয়েছে। আইভী তাঁর যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। সে উপমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত। আমাদের উচিৎ প্রয়োজনে তাঁর নেতৃত্বে উন্নয়ন কাজ করা। কারণ একটি সীটে দীর্ঘদিন থেকে ডাঃ আইভীর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে-তা অনেকেরই নেই।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও