ভাগ্যবতী আইভী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪২ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০২০ রবিবার

ভাগ্যবতী আইভী

নারায়ণগঞ্জে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব কোন্দল দীর্ঘদিনের। তবে সেই সাথে এবার নতুন করে রাজনীতিতে ভুল পদক্ষেপের চিত্র দেখা গেছে। দেওভোগের জিউর মন্দির সহ জিউস পুকুর দখল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে আওয়ামীলীগ নেতা সহ সংখ্যালঘু নেতারা। তবে এই মামলার বাদী বলছে উল্টো কথা। এতে করে পাল্টে যাচ্ছে আন্দোলনের দৃশ্যপট। আর এসব কারণেই আইভী ভাগ্যবতী মনে করা হচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য বিগত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে নানা অভিযোগ তুলে মেয়র আইভীর মনোনয়ন ঠেকাতে চেয়েছিল একটি পক্ষ। আওয়ামীলীগের তৃণমূল থেকে মেয়র আইভীর নাম বাদ দিয়ে তিনজনের নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়। তবে কেন্দ্র থেকে প্রধানমন্ত্রী মেয়র আইভীকে উল্টো পুরষ্কৃত করে তার হাতে নৌকা তুলে দিয়েছিলেন। এবারো জিউস পুকুর ও জিউর মন্দির নিয়ে আন্দোলনে আওয়ামীলীগ নেতারা মেয়র আইভীর নমিনেশন না দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আর তাতে করে প্রেক্ষাপট সেই একই দিকে ধাবিত হচ্ছে।

জানা গেছে, ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী ও তার পরিবার স্বজনদের বিরুদ্ধে দেওভোগের জিউস পুকুর সহ লক্ষীনারায়ণগ জিউর মন্দিরের দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন জেলার সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা। সেসময় আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দরাও সেখানে উপস্থিত থেকে ঝাঁজালো বক্তব্য রাখেন। পরে মানববন্ধন শেষে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। সেই স্মারকলিপিতে মেয়র আইভী সহ তার পরিবার স্বজনদের বিরুদ্ধে দেবোত্তর সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তোলা হয়। এর পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতে ইসলামে সাথে কানেকশনের কথা উল্লেখ করা হয়। মহানগর জামায়াতে ইসলামের আমির মাঈনুদ্দিনের বক্তব্যের অংশ তুলে ধরেন।

সেই মানববন্ধনে সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতৃবৃন্দদের সাথে আওয়ামীলীগের দুই বর্ষিয়ান নেতা অংশগ্রহন করে বক্তব্য রাখেন। নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা তার বক্তব্যে বলেন, স্মারকলিপি অনুযায়ী মেয়র আইভীর আত্মীয়স্বজন এই জায়গা দখল করেছেন এই বিষয়টা আমি নেত্রীর (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার) কাছে তুলে ধরবো। আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, যারা হিন্দু সম্পত্তি দখল করে আমার নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই নমিনেশন দিবেনা। এটা অত্যন্ত পরিষ্কার। জননেত্রী শেখ হাসিনা এদেশের সংখ্যালঘুদের রক্ষাকবজ। তিনি আবশ্যই আপনাদের বিষয় বিবেচনা করবেন। হুমকি ধামকি দিবেন না। যদি হত্যা করতে চান তাহলে আমাকে হত্যা করেন। আমি শেষ পর্যন্ত জিউস পুকুর নিয়ে কথা বলবো। জিউস পুকুর সহ সব জায়গা উদ্ধার করবো।

এর প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিন হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রোগ্রাম করা হয়েছে। মানুষকে মিথ্যা কথা বলে এখানে এনে। এবং এ প্রোগ্রামটা শামীম ওসমান সাহেব করিয়েছেন। তার নির্দেশে হয়েছে। কারণ হলো, এখানে খোকন সাহার বক্তব্যে স্পষ্ট যেন মনোনয়ন দেওয়া না হয়। তাহলে কি নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেলো। আর নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়েই কি আবার সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়ার জন্যই কি মাঠে নামানো হলো? এটা আমার প্রশ্ন?

তিনি বলেন, ‘জিউস পুকুরের সঙ্গে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। একজন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতা এখানে নাই। আমার বাবা আলী আহম্মদ চুনকারও ছিল না। এ জায়গা যদি ক্রয় করে থাকে আমার নানা মাহাতাব উদ্দিন সাহেব। ওনার ক্রয়কৃত সম্পত্তি থেকে যদি তার ছেলে মেয়েরা ওয়ারিশ হিসেবে প্রাপ্ত হয়ে থাকে তাহলে কি অপরাধ আমার। এটা কখন কিনেছে মাহাতাব সাহেব এবং ও জামির আহমেদ? এটা খতিয়ে দেখা উচিত। যদি এটা ১৯৮০ বা ১৯৮১ সালে ক্রয় করে থাকে তাহলে আজকে ৩৯ বছর পর এসে কেন এ প্রশ্ন করা হচ্ছে। তাহলে কোথায় ছিল সমাজপতিরা, হিন্দু সম্পত্তি রক্ষার্থে?

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৮৪ সালের আলী আহম্মদ চুনকাকেও একই ভাবে একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে (তখন তিনি বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন) তখন এ অভিযোগ উৎথাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। আজকে পুনরায় ৩৬ বছর পর এসে একই অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে করা হচ্ছে। তাহলে এ ষড়যন্ত্রকারী কারা? এবং তারা সময় সময় তারা সময়কে ও মানুষকে ব্যবহার করে এক সাম্প্রদায়কে উত্তেজিত করার জন্য এবং আমার নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের চক্রান্তমূলক মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার জন্য এ কাজটি করছে। তবে সত্য কোন দিনও মিথ্যা হয় না। সত্য প্রমাণিত হবেই। এ জায়গার মালিক নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নয় অথবা মেয়রের বাবাও নয়। এ জায়গা ক্রয় করেছে কারা সেটা খুঁজে দেখা হোক। এবং সেই ক্রয়টা বৈধ না অবৈধ সেটাও বের করা হোক।’

এদিকে এই জিউস পুকুর ও জিউর মন্দিরের মামলার বাদীর চাঞ্চল্যকর তথ্যে পুরো আন্দোলন ভেস্তে গেছে। মামলার বাদী শ্রী শ্রী রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর বিগ্রহ মন্দিরের সেবায়েত গোবিন্দ ঘোষ দাবি করেছেন, মামলা দায়েরের পর থেকে এই পর্যন্ত তিনি কোন হুমকি ধামকির শিকার হননি। তাকে এসব নিয়ে কোন হুমকি এখনও পর্যন্ত কেউ দেয়নি।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আন্দোলনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। মূলত মেয়র আইভীর নমিনেশন ঠেকানোর জন্য দীর্ঘদিন পরে এই প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু বাদীর বক্তব্যে সবকিছু পানির মত পরিষ্কার হয়ে গেছে। এতে করে গোয়েন্দা সংখ্যাগুলো সব ধরণের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে। আর তাতে করে ফের বিগত নাসিক নির্বাচনের মত নৌকার মনোনয়ন সহ বিভিন্ন ইস্যুতে মেয়র আইভীকে পুরষ্কৃত করতে পারে। কারণ যখনই আওয়ামীলীগের একপক্ষের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ হেনস্থার শিকার হয়েছে তখনই কেন্দ্র থেকে এই বিষয়গুলোকে নোট করে পরবর্তীতে নানা ভাবে পুরষ্কৃকত করা হয়েছে।

নগরবাসী বলছে, উন্নয়নের কারণে মেয়র আইভীর জনপ্রিয়তায় কখনো ভাটা পড়েনি। তবে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের এই জিউস পুকুর দখলের অভিযোগ এবার আন্দোলনের রুপ নিয়েছে সংখ্যালঘু নেতা ও আওয়ামীলীগ নেতাদের মাধ্যমে। তবে অবশেষে এই অভিযোগের সব উত্তর পরিষ্কার হওয়ার এখন সংখ্যালঘু জনগণের মধ্যেও আর কোন প্রশ্ন নেই। তারাও এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করবে। তাছাড়া কেউ যখন একজন ব্যক্তিকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হেয় করতে চায় তখন স্বাভাবিকভাবে তার প্রতি ভালবাসা ও ¯েœহ বেড়ে যায়।

রাজনীতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন ইস্যুটি কার্যত অর্থে একটি ভুল রাজনীতিক চাল ছিল। তার উপরে বিগত সময়ে উত্তর মেরু কেন্দ্রীক যেসকল অভিযোগ আইভীর বিরুদ্ধে তোলা হয়েছিল তার রেশও টানা হয়েছে। এতে করে একটি বিশেষ মেরুর ইন্দন কিংবা যোগসাজস্য রয়েছে তা কারো বুঝতে বাকি থাকেনা।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও