ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়ের গুরুকে অপমান

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১০ পিএম, ২০ নভেম্বর ২০২০ শুক্রবার

ওসমান ভ্রাতৃদ্বয়ের গুরুকে অপমান

নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দুই সহোদর এমপির গুরু বলে খ্যাত মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন যিনি বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি পদে আসীন রয়েছেন। ক্লীন ইমেজের কারণে রাজনীতিতে বর্ষীয়ান এই নেতাকে সমীহ করে থাকেন ছোট বড় সকলেই। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের এই সুদীর্ঘ প্রায় এক যুগের শাসনামলে যারা এখনো নেতাকর্মীদের কাছে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন আনোয়ার হোসেন তাদেরই একজন। অথচ ওসমান পরিবারের দুই সহোদর এমপির গুরুকে অপমান করতে কার্পন্য করলেন না জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা।

১৭ নভেম্বর দুপুরে সোনারগাঁ জি আর ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল ফটকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের নামফলক ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাঁকে (আনোয়ার হোসেন) অপমান করেছেন নারায়ণগগঞ্জ-৩ আসনের (সোনারগাঁ) জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা এমনটিই বলছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। যা নিয়ে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

জানা গেছে, সত্তুরের দশক থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে পদার্পণ ঘটে আনোয়ার হোসেনের। পচাত্তুরের ১৫ আগষ্ট সেই কালো রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পরে যেকজন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন জেল জুলুমের শিকার হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন তাদের একজন। ৪ দশকের বেশী সময় ধরেই আওয়ামীলীগের রাজনীতি করতে গিয়ে অসংখ্যবার নির্যাতন জেল জুলুমের শিকার হলেও আনোয়ার হোসেন তার রাজনৈতিক আদর্শের থেকে পিছু হটেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে বুকে ধারন করে তিনি সর্বদাই রাজনীতি করে গেছেন। কখনোই সময়ের ¯্রােতে গা ভাসাননি। অদ্যাবধি ধরে রেখেছেন নিজের ক্লীন ইমেজ। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগ তথা জাতীয় পার্টির রাজনীতিতেও প্রভাবশালী ওসমান পরিবার। এই পরিবারের দুই সহোদর নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর ও বন্দর) আসনের জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি সেলিম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমানের রাজনৈতিক গুরু হিসেবেও খ্যাত মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। ওসমান ভ্রাতৃদ্বয় অসংখ্যবার বিভিন্ন সভাসমাবেশে আনোয়ার হোসেনকে তাদের গুরু বলে অভিহিত করেছেন যা রাজনৈতিক নেতাকর্মী সকলেরই জানা। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী ওসমান পরিবার ও আওয়ামীলীগের বৃহদাংশ তখন দাবি জানিয়েছিলেন আনোয়ার হোসেনকে নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বর্তমান মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মনোনয়ন দিলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি হাসপাতালে গিয়ে আনোয়ার হোসেনকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন দেওয়ার সুখবর জানান। পরে আনোয়ার হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার এই প্রায় ৪ বছরেও আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে তেমন কোন বিতর্ক দেখা যায়নি। নিজের ক্লীন ইমেজ ধরে রেখেছেন তিনি বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কার্যক্রম করে আসছেন। জেলা পরিষদ সাধারণত বিভিন্ন মসজিদ মাদরাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুদান দিয়ে থাকে। আর ওইসকল অনুদানের সরকারী নিয়মানুযায়ী নামফলক রাখতে হয়। এটা শুধু জেলা পরিষদের ক্ষেত্রেই নয় যেকোন সরকারী সংস্থার উন্নয়ন কাজের নামফলক থাকবেই সেটা সিটি করপোরেশন, এলজিইডি, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথসহ যেকোন সংস্থার। কিন্তু কোন সরকারী সংস্থার নামফলক থেকে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নাম ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা হতবাক।

স্থানীয় সূত্র বলছে, মঙ্গলবার ১৭ নভেম্বর দুপুর ২টায় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা সোনারগাঁ জি আর ইনস্টিটিউশন স্কুল এন্ড কলেজে প্রবেশের পরে স্কুলের মূল ফটকের পাশে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের নাম দেখে বেশ রাগান্বিত হন। এসময় উপস্থিত শিক্ষকদের উপর চটে যান। আর আনোয়ার হোসেনের নাম কেন লেখা হয়েছে সেটা জানতে চান। আশেপাশের অনেক লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে তিনি চলে গেলে তার ছাবিক নামে এক অনুগামী সেই ফলক ভেঙে ফেলে।

সোনারগাঁ জি আর ইনস্টিটিউশন স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুলতান বলেন, এমপি সাহেব স্কুলে এসে করোনাকালীন সময়ে যাতে শিক্ষার্থীদের কাছে কম টাকা রাখা হয় এটা গভর্নিং বডির কাছে জানানোর কথা বলেন। পরে স্কুলের গেটের পাশে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের নামের ফলক দেখে তিনি বেশ রাগান্বিত হয়ে উঠেন। এসময় তিনি আমাকে অনেক ধমকা ধমকি করেছে।

এক পর্যায়ে তিনি ধমক দিয়ে বলেছেন, নাম ফলক (জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন) এখন ভাঙেন। রাজস্বখাতের টাকায় নাকি স্কুলের গেইট নির্মিত হয়েছে। তাই তিনি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। পরে তিনি চলে গেলে তার লোকজন এসে এই ফলক ভেঙে দেয়।

স্কুলের গভর্নিংবডির সভাপতি ফারুক ভূইয়া বলেন, আমার এক আত্মীয় মারা গিয়েছে। একারণে আমি ব্যস্ত ছিলাম। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের নামের ফলক ভেঙে দেয়ার কথা আমি শুনেছি। তবে এ ব্যাপারে আমি বিস্তারিত জানিনা। তবে এই কাজটা খুব খারাপ হয়েছে। যে বা যারা করেছে কাজটা ভুল করেছে। এটা করা ঠিক হয়নি।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, জেলা পরিষদের ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে জিআর ইন্সটিটিউটের স্কুলের গেইট ও দেয়াল নির্মাণের জন্য। উদ্বোধনে জেলা পরিষদের নাম ফলক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সব উপজেলায় সেটি হচ্ছে। সে জাতীয় পার্টির এমপি হয়ে যে ঔদ্ধত্ব আচরণ করেছে তার নিন্দা করছি। এই বিষয়টা আমি সর্বমহলে জানাচ্ছি।

এদিকে আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান এই নেতার নামফলক ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্দ স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে যেমন ক্ষোভের আগুন জ¦লছে তেমনি সেটা ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হচ্ছে মহানগরের নেতাকর্মীদের মধ্যে। আর এই ক্ষোভের আগুন দাবানলে পরিণত হলে সেটা এমপি খোকার জন্য অভিশাপে পরিণত হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও