আইসক্রিম গলেছে জিউসপুকুরে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৬ পিএম, ৯ জানুয়ারি ২০২১ শনিবার

আইসক্রিম গলেছে জিউসপুকুরে

এমপি শামীম ওসমানের মনে বেশ কষ্ট। তেমন কিছু চাননি ছোট বোন ডা. আইভীর কাছে। খেতে চেয়েছেন শুধুমাত্র একটি আইসক্রিম। চার চারটি বছর পার হয়েছে। আজো আইসক্রিম খাওয়ার তৃষ্ণা মেটেনি প্রভাবশালী এই সাংসদের। মাঝখানে বয়ে গেছে লম্বা সময়। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার জল অনেক দূর গড়িয়েছে। শামীম ওসমান আইসক্রিম খেতে চেয়েছিলেন ৯ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে। চার বছর পার হল। আদরের ছোট বোন আইসক্রিম খাওয়াননি। কেননা ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্কটা কোমলতা ছাড়িয়ে কঠোরতায় পৌঁছে গেছে।

হকার, বিএনপি-জামায়াত কানেকশন অডিও এবং জিউসপুকুর ইস্যুতে চার বছরে ডা. আইভী বিরোধীতার পাহাড় গড়েছেন ভাইজান শামীম ওসমান। শহরের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিজ্ঞ লোকজন থেকে সাধারণ মানুষ মনে করেন, শামীম ওসমানের আইসক্রিম গলে মিশে গেছে জিউসপুকুরের জলে।

বোদ্ধামহলের মতে, কারো সাথে ভাল সম্পর্ক থাকলে তার কাছে কিছু খাওয়ার আবদার করা যায়। নইলে সেটা হয়ে যায় একতরফা। আপনি সারাবছর একজনের বিরোধীতা করে যাবেন আবার গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে রাজনীতি করবেন। শাড়ি উপহার পাঠিয়ে আইসক্রিম কেনো এক কাপ চা খেতে চাইলেও আপনাকে কেউ তা দিবে না। সম্পর্কটা এখানে বড় বিষয়। এমপি শামীম ওসমান যেভাবে মেয়রের বিরোধীতা করে আসছিল তাতে করে তাকে চার বছরতো কম চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলেও নিমন্ত্রণ করবে না। আইসক্রিম খাওয়ানোতো অনেক পরের বিষয়। আবারো হকার ইস্যুতে মামলার জালে জড়ানোর যে চেষ্টাটা চলছে তাতে করে মেয়র আইভী এমন ভাইয়ের নামটিও বোধ হয় মুখে আনতে চাইবে কিনা সন্দেহ নগরবাসীর। আর সবশেষ শামীম ওসমানের বন্ধু খোকন সাহার বিরুদ্ধে মেয়র আইভীর মামলার পর আইসক্রিম আর বাকি থাকছে না।

একাধিক সূত্রে জানাগেছে, দ্বিতীয় দফা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে জয়ের পর ‘ছোট বোন’ সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ‘ফাইন’ (জরিমানা) করে আইসক্রিম খাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। কিন্তু আইভীর নির্বাচনে জয়ের ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও আইসক্রিম ইস্যুতে কোনও সাড়া শব্দ পাওয়া যায়নি। তাই জনমনে প্রশ্ন,আইভীর কাছ থেকে ‘আইসক্রিম’ আর কবে খাবেন শামীম ওসমান? এই জনমে শামীম ওসমানের সাধ পুরণ হবে কী ?

নাসিক নির্বাচনে অনেক নাটকীয়কতার মধ্যে একটি ছিল, নৌকা প্রতীকে আইভীর বিজয়ের পর তাকে ‘জরিমানা’ করে আইসক্রিম খাবেন এমপি শামীম ওসমান। সংবাদ সম্মেলন করে সে কথা শামীম ওসমান বললেও আইসক্রিম খাওয়ার অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেনি। ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বরের ওই সংবাদ সম্মেলন শামীম ওসমান বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে আইভীর জয়ের পর আমি নেত্রীর সামনে গিয়ে আইভীকে একটি ফাইন করবো। আমি আইসক্রিম খেতে ভালোবাসি। আমার ছোটবোন আইভীকে সেদিন আমি আইসক্রিম খাওয়াতে ফাইন করবো।’ কিন্তু ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দলবল নিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দু’বার দেখা করলেও সেখানে দেখা মেলেনি শামীম ওসমানের।

এদিকে আইসক্রিম ইস্যুতে শুরুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা ছিল, যা এখন হারিয়ে গেছে। ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর থেকেই নারায়ণগঞ্জবাসীর কৌতুহল ছিল সে আইসক্রিম ইস্যুতে। তাদের ধারণা ছিল, যাই ঘটুক অন্তত শামীম ওসমান ও আইভীর সেই আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে বড় ধরনের কোনও পজেটিভ দিক থাকতে পারে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে।

আইসক্রিম খাওয়ার ইস্যু চাপা পড়েছে। কারণ ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনের পরদিনই সকালেই পরাজিত বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের বাসায় মিষ্টি নিয়ে যান আইভী। মিষ্টি বিনিময়ের পর সেদিন রাতেই গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন আইভী। সঙ্গে যান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানে শামীম ওসমান ছিলেন না। ফলে আইসক্রিম খাওয়ার পর্বটিও হয়নি।

অপরদিকে, ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বরের ওই সংবাদ সম্মেলনে আইভীকে নৌকা খচিত দুটি শাড়ি উপহার হিসেবে পাঠানোর আগে গণমাধ্যমের মাধ্যমে তা প্রদর্শন করেন এমপি শামীম ওসমান। যদিও আইভীকে সে শাড়ি এখনও পরতে দেখা যায়নি।

এর মধ্যে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান এক সভায় বলেছিলেন, আইভীকে আমি স্নেহ করি আর মেয়র পদকে সম্মান করি। আইভীর সঙ্গে আমার কোন ধরনের বিরোধ ছিল না। আমি আইভী ও শামীম ওসমানসহ সব জনপ্রতিনিধিদের বলবো, অতীতের মান অভিমান ভুলে আসুন, একসঙ্গে উন্নয়নের জন্য কাজ করি।

ওই বক্তব্যের দুইদিন পর ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সেলিম ওসমান ও আইভীকে দেখা গেছে। দু’জন মিলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবিও তুলেছেন। কথা বলেছেন নানা বিষয়ে।

এখানে উল্লেখ্য, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সেলিম ওসমানের কাছে ফোন করে দোয়া চেয়েছিলেন আইভী। ১৫ ডিসেম্বর আইভী তার ফোনে ওই দোয়া চান সেলিম ওসমানের কাছে, যা ১৯ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেই তিনি জানান।

শামীম ওসমানের ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র জানান, ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে নৌকার পক্ষে তথা আইভীর পক্ষে কথা বলা এবং সেদিন দুটি শাড়ি পাঠানোর পর শামীম ওসমান ধরে নিয়েছিলেন তাকে আইভী অন্তত ফোন দিবেন। তাছাড়া শামীম ওসমানের দেওয়া দুটি শাড়ির একটিও নির্বাচনী প্রচারণায় পরেনি আইভী। শামীম ওসমান শাড়ি উপহারের সময়ে বলেছিলেন ‘আইভী ভাইয়ের দেওয়া শাড়ি পরে প্রচারণায় গেলে মনে করবে এতে ভাইয়ের দোয়া আছে।’

শামীম ওসমানের একাধিক ঘনিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,আইভীকে দেওয়া উপহারের শাড়ি পরিধান না করায় ও ফোন না দেওয়ায় শামীম ওসমান মনে কষ্ট পেয়েছেন। সে কারণেই তিনি আইভীর সঙ্গে দেখা হউক এমন কোন অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত ছিলেন। এখনো আছেন। শামীম ওসমান চান না তিনি আইভীর মুখোমুখি হন। সে কারণেই ৫ জানুয়ারিও শামীম ওসমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যায়নি।

আইসক্রিম ইস্যুর বিষয়ে দ্বিতীয় দফা মেয়র নির্বাচিত হয়ে ডাঃ সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছিলেন, ‘আমি সিটি করপোরেশনে কাজ শুরু করেছি। আর এখন এসব নিয়ে কোন কথা বলতে চাই না। আমি চাই না কোন ইস্যুতে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিক।’

এদিকে সবশেষে ৪ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী খোকন সাহাকে আসামী করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। আদালত আইভীর আর্জি গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারী মামলার শুনানী অনুষ্ঠিত হবে। সম্প্রতি খোকন সাহা নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দরে বেশি কয়েকটি সভায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীকে সরাসরি নিশানা করে বক্তব্য রাখেন। যেখানে তিনি মেয়র আইভীকে দুর্নীতিবাজ, হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবোত্তর সম্পত্তি দখল সহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করে বক্তব্য রাখেন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও