জনপ্রিয়তায় কেন বল প্রয়োগ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৪৬ পিএম, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ মঙ্গলবার

জনপ্রিয়তায় কেন বল প্রয়োগ

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির জনপ্রিয় নেতৃত্ব হচ্ছেন অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েল ও অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া। তারা টানা দুই মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন। আর এর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির উন্নয়নে সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে দিয়েছিলেন। আর এই দুইজনের মধ্যে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী নেতৃত্বে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া। আর তার সাথে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান। তারা দুইজনেই মিলেই সমিতির সে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন।

কিন্তু অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া ও অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের এই অর্জনকে স্লান করে দিয়েছে বহিরাগতদের অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ। নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে তাদের জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে বহিরাগতদের বলপ্রয়োগ যেন তাদের ললাটে কলঙ্কের তিলক এটে দিলো। জনপ্রিয়তার বিপরীতে তারা সাধারণ আইনজীবীদের মাঝে তারা বিতর্কিত হিসেবেই স্মরণীয় করে রাখার সুযোগ করে দিলেন বহিরাগতরা।

আদালতপাড়া সূত্র বলছে, অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েল ও অ্যাডভোকেট মোঃ মোহসীন মিয়ার মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ৮ তলা বিশিষ্ট ডিজিটাল বার ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। আর এই কাজের শুরু করতে গিয়ে তাদেরকে বহু বাধা বিপত্তির মোকাবেলা করতে হয়েছে। একই সাথে আইনজীবীদের স্মার্ট, আইডি কার্র্ড ও ডাইরেক্টরি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এই দুই তরুণ আইনজীবীর উন্নয়নের মধ্য দিয়ে তারা নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ১২’শ সদস্যের কাছে ডাইনামিক লিডার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমানে নেতৃত্বে অনুপস্থিত রয়েছেন অ্যাডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েল। সেই সাথে সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়ার সাথে যোগ হয়েছেন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান। আর এই দুইজনের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিলো। তারাও ঠিক সমানভাবেই নিজেদের জনপ্রিয়তা করে ধরে রেখেছিলেন।

এরই মধ্যে গত ২৮ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয়ে যায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের পক্ষে ঘটে গেছে কলঙ্কিত ঘটনা।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায, এদিন ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই সকাল সাড়ে ৮টায় সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত প্যানেলের পক্ষে বহিরাগতরা সন্ত্রাসীরা এসে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া দখলে নেন। প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী আইনজীবীদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি দিতে থাকেন। বিএনপিপন্থী আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট আনোয়ার প্রধানকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

একই সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিনকে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া থেকে বের করে দেয়া হয়।

এরপর দিনজুড়ে দফায় দফায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাদের ক্যাডারবাহিনী নিয়ে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া টহল দিতে থাকেন। আদালতপাড়া জুড়ে মিছিল করতে থাকেন। এভাবে সকাল থেকে শুরু করে সারাদিনব্যাপী বহিরাগত সন্ত্রাসীদের মহড়া চলে। সেই সাথে বিকেলে ভোট গ্রহণের শেষ পর্যায়ে বিএপিপন্থী আইনজীবী ও সাংবাদিকদের উপড় চড়াও হন। বহিরাগতদের হামলায় কয়েকজন আইনজীবী ও সাংবাদিক আহতও হন। যা নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ইতিহাসে কখনও ঘটেনি।

ফলশ্রুতিতে এসকল ঘটনা নিয়ে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে নানা আলোচনা সমালোচনা। তাদের মতে, সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহসীন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত প্যানেল এমনিতেই জনপ্রিয় থাকার কথা। কারণ তাদের দ্বারা বারের যে উন্নয়ন সম্ভব অন্যদের দ্বারা সেটা হবে না। তাদের এমনিতেই জয়লাভ করার কথা। তাহলে এখানে বহিরাগতদের বলপ্রয়োগ করতে হবে কেন? বহিরাগতদের বলপ্রয়োগে বারকে কলঙ্কিত করা হলো কেন?

সাধারণত আইনজীবীদেরকে সমাজের বিবেকবান মানুষ হিসেবে বলা হয়ে থাকে। তাদের নামের আগে বিজ্ঞ শব্দটি যোগ করা হয়। তাদের উপর কেউ হাত তোলা তো দূরের কথা কেউ সাহসও করেন না। কিন্তু এবারের নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে কালো থাবা পরিলক্ষিত হয়েছে। কালো কোর্ট পরিধানকারী লোকদেরকে তাদেরই কর্মস্থানে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দ্বারা মারধরের শিকার হতে হয়েছে। তাদেরকে শারীরিকভাবে হেনেস্তার শিকার হতে হয়েছে। যা গত কয়েক বছরে কখনও পরিলক্ষিত হয়নি।

খোকন সাহা বলেছিলেন, বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা ক্ষমতায় থাকাকালিন সময়ে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবী অ্যাডভোকেট হবিবুর রহমান আরও কয়েকজন আইনজীবীর হাত পা ভেঙ্গে দেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই সাথে ওয়াজেদ আলী খোকন বলেছিলেন বিএপিপন্থী আইনজীবীরা তার চেম্বার ভাংচুর করা সহ কালো কোর্ট পুড়িয়ে দেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারা নিজেরা কিছু না করলেও তাদের দলীয় নেতাকর্মীরা আইনাঙ্গনে ঢুকে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের উপর হামলা করেছেন।

২৮ জানুয়ারী আদালতপাড়ায় বহিরাগতদের মহড়া চলমান থাকলেও আইনজীবী সমিতির ভিতরে ঠিকই সুষ্ঠু ও অবাধভাবে ভোট হচ্ছিল। ভিতরে কোন বিশৃঙ্খলা ছিল না। কিন্তু বিকেল ৫টায় ঘটে যায় অনাকাংখিত ঘটনা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে মারধর করা হচ্ছে, সভাপতি মোহসীন মিয়াকে মারধর করা হচ্ছে - এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বহিরাগত থাকা সত্ত্বেও আইনজীবী সমিতির ভবনের ভেতরে রণমূর্তিতে ছুটে যান আওয়ামী লীগের লোকজন। ছুটে যান ব্যবসায়ী নেতা খালেদ হায়দার খান কাজল।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, তিনি নিজেই একজন আইনজীবীকে লাথি দিতে। নেতার লাথির দৃশ্য দেখে সঙ্গে থাকা আরো ৪০-৫০ জন যেন আরো ক্ষেপে যান। নেতায় যখন লাথি দেন তখন অনুগামীরা যেন আরো বেশী বেশী করে লাথি কিল ঘুষি মারতে থাকেন। দেখা দেয় এক ভীতিকর পরিস্থিতি। যে ভবনে ভোট হয়েছিল সেখানে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ থাকলেও সেটা শুধু মানা হয়েছে বিএনপির ক্ষেত্রেই। বরং সেখানে সাদা প্যানেলের পক্ষে দফায় দফায় মিছিল হয়েছে। তাদের লোকজন যখন খুশী তখনই প্রবেশ করেছেন।

শুধু বিএনপির আইনজীবী না বরং ওই ন্যাক্কারজনক ঘটনার যখন ভিডিও আর সংবাদ সংগ্রহের জন্য উপস্থিত হন গোটা দশেক সংবাদকর্মী তাদেরও নিস্তার দেওয়া হয়নি। ‘কেন ভিডিও করেছিস’ বলেই হাতে থাকা মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া, কারো ক্যামেরা নেওয়ার সঙ্গে কিল ঘুষি আর থাপ্পর দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি। যারা নারায়ণগঞ্জ আইনাঙ্গনে কালো থাবা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা আইনজীবী সমিতির বিগত নির্বাচনগুলোতে অনেক বিতর্কিত ঘটনা ঘটলেও সেটা নিজেদের মধ্যেই ছিল। কিন্তু এখানে বহিরাগতরা কোনো প্রভাব দেখাতে পারেনি। নিজেরাই নিজেদের মধ্যে নানা বিতর্কিত ঘটনা ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যেই মিটমাট করে নিতেন। কিন্তু এবারের জেলা আইনজীবী সমিতিতে বহিরাগতরা নিজ কর্মস্থলে এসে নিজেদেরই স্বজাতীয় ভাইদেরকে পিটিয়ে গেছেন। যা জেলা আইনজীবী সমিতির জন্য কলঙ্কের তিলক হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে থাকবে।

আইনজীবী শেখ আঞ্জুম আহম্মেদ রিফাত বলেন, ‘এখানে আইনজীবীদের নির্বাচন কিন্তু বহিরাগত আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে আমাদের আইনজীবীদের মারধর করেছে। মারধরের পর এমপি শামীম ওসমানের উপস্থিতিতে তারা আদালত চত্ত্বরে স্লোগন দিচ্ছে, মিছিল করছে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে তারা এ হামলা চালিয়েছে। আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে তারা কেন আসবে। আমরা এর বিচার চাই।’


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও