অশান্ত বিশৃঙ্খলার পাঁয়তারা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৪ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ শনিবার

অশান্ত বিশৃঙ্খলার পাঁয়তারা

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বিরোধীতায় মাঠে নেমেছে তিনটি পক্ষ। এর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দদের কর্মকা- বেশ আলোচিত হয়েছে। কখনো শহরের ডিআইটি মসজিদ নিয়ে আবার কখনো চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মসজিদ মাদরাসা ইস্যুতে মাঠ কাপিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দরা। আর মাসদাইর মাদরাসা উচ্ছেদের ঘটনায় মেয়র আইভীকে দোষারোপ করলেও ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। মেয়র আইভী উচ্ছেদ করেনি বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে। এরপরও ঢালাওভাবে আইভী বিরোধী বক্তব্য রেখে আসছেন হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দরা। এতে করে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে হেফাজতের নেতা ফেরদাউসুর রহমান ১৯ ফেব্রুয়ারী ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে আগামীতে আইভীর বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনের হুংকার দিয়েছেন।

মহামারি করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি সামাল দিয়ে সারা বাংলাদেশ এগিয়ে নিতে আওয়ামীলীগ সরকার যখন প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে তখন দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে হেফাজতে ইসলামের নেতারা যারা বিগত দিনে সরকার বিরোধী আন্দোলন করেছে। করোনার সময়ে যখন বিশ্বের অনেক দেশ নাকাল তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার কারণে দেশ অনেক স্থিতিশীল। বিদেশীদের উপর ভর না করেই স্ব শক্তিতে দেশ বলীয়ান। বিশ্বের অনেক দেশকে তাক লাগিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে ভ্যাকসিন প্রদান। অর্থনৈতিক মন্দাও কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে।

১৯ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার জুমআর নামাজের খুতবার বয়ানে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও ডিআইটি রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়ালের বক্তব্যের বেশীরভাগ ছিল মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে কেন্দ্র করে। এছাড়া এমপি শামীম ওসমানের মাথায় শ্রীকৃষ্ণের একটি টুপি নিয়েও কথা বলেছেন।

আবদুল আউয়াল বলেন, কতদিন কতদিন! ক্ষমতায় আল্লাহ সবসময় রাখে না। আল্লাহ বলেন, আমি যাকে মসনদে রাখি যাকে ইচ্ছা মসনদ থেকে উষ্টা দিয়ে ফেলে দেই। আমি কাউকে ইজ্জত দেই কাউকে বেইজ্জত করে দেই। এ সমস্ত কিছুই আমার হাতে।

জানাগেছে, সম্প্রতি সিটি করপোরেশনের মেয়র আইভী বিরোধীতায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মাঠে নেমেছে হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দরা। চাষাঢ়া বাগে জান্নাত, মাসদাইর মাদরাসা ইস্যুতে মাঠে নেমেছে। এছাড়া শহরের ডিআইটি মসজিদ নিয়েও বক্তব্য দিয়ে আসছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। ইতোমধ্যে দুটি ইস্যুতে সুরাহা হলেও মাঠ ছাড়তে নারাজ তারা। আর বাগে জান্নাত মাদরাসার কমিটির লোকজন আন্দোলন প্রতিবাদ না করলেও হেফাজত প্রতিবাদ করে উল্টো তোপের মুখে পড়ছেন।

এর আগে হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দরা গত ১২ ফেব্রুয়ারী চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে মহানগর ওলামায়ে পরিষদের সমাবেশ। সেই সমাবেশে মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান মেয়র আইভীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘উনি ঘুমটা দিতে চায়না উনি ঘুমটা খুলে বেটা সাজতে চায়।’, ‘কাপড়ডারে তো সুন্দর কইরা ধরে আইসা।’ তিনি আরো বলেছেন, নামাজও পড়েন না, দুই হাতে কতগুলো আংটি আছে, কুরবানীও করেন না। কইরেন না আপনি। আপনার ধর্ম ভাল না লাগলে যানগা অসুবিধা কি?। আপনি যান কিন্তু ধর্ম নিয়ে খেলতে দিব না। ধর্ম ব্যবসা আপনি করেন।’ মহানগর উলামা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি রহমত উল্লাহ বুখারী বলেন, এখনও সময় আছে আব্দুল আউয়ালের কাছে ক্ষমা চান। নাহলে মেয়র তো দূরের কথা মেম্বারও হতে পারবেন না।

মহানগর হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, আপনার অবস্থান পরিস্কার করেন আপনি হিন্দু না মুসলিম অন্যথায় আপনাকেও জনগণ শীতলক্ষায় নিক্ষেপ করবে।

মহানগর উলামা পরিষদের সহ সভাপতি কামাল উদ্দিন দায়েমী বলেন, উলামা কেরামের বিরুদ্ধে যারা খেলতে আসে তাদের এই জমিনে জুতার বাড়ি খেতে হয়। আমরা দেখেছি আপনাদের একজন উলামায়ে কেরামের সঙ্গে খেলতে আসছিল কিন্তু খেলার আগেই উনি আউট হয়ে গেলো। মেয়র আপনি জুতা বাড়ি খাওয়ার আগে এই পাঁয়তারা বন্ধ করেন। নতুবা গদি ছেড়ে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দেয়া হবে।

এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার জুমআর নামাজের খুতবার বয়ানে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও ডিআইটি রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল মেয়রের বিরুদ্ধে কথা বলেন।

৬ ফেব্রুয়ারী বিকেলের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ‘এখানে যে সমস্ত হিন্দু মুসলিমদের ক্ষেপিয়ে আজকে নারায়ণগঞ্জে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির চেষ্টা করা হচ্ছে। যেকোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দায়ি থাকবে শামীম ওসমান।’

সূত্র বলছে, ২০১৩ সালের ৫মে ঢাকাতে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ও রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিবর্ষণের পরদিন ৬মে উত্তপ্ত ছিল রাজধানীর পাশের নারায়ণগঞ্জ জেলা। এদিন ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের শিমরাইলে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে হেফাজতে ইসলাম, স্থানীয় লোকজন ও হেফাজত লেবাসে থাকা জামায়াত শিবিরের ক্যাডারদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে টানা সাড়ে ৫ঘণ্টার ব্যাপক সংঘর্ষে ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর দুই সদস্য ও পুলিশের ২জন সদস্য ছিল। ওইসব ঘটনায় সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে ১৭টি মামলা হয়েছিল। ১৭টি মামলার মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জে ১১টি ও সোনারগাঁও থানায় ৬টি মামলা হয়। এখন পর্যন্ত ১৫টি মামলার চার্জশীট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।ওই মামলায় ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ৭৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেয় পুলিশ। মামলাটি এখনো বিচারাধীন। মামলায় ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৬ জনকে অব্যাহতি দিয়ে ৭৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ৬ জনের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। ২ জন ঘটনার সময় জেলে ছিল ও একজন দেশের বাইরে। ওই মামলায় আবদুল আউয়াল, ফেরদাউসুর রহমান, বশিরউল্লাহ চার্জশীটভুক্ত।

এছাড়াও ২০১৩ সালে যে হেফাজতের ভাষায় নাস্তিক ব্লগার শোভন হায়দার রাজীব চত্বর শামীম ওসমান ঘোষণা করে চাষাঢ়ায় ছবি স্থাপন করেছিলেন। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারী দুপুরে জুমআর নামাজের পর মুসল্লীদের একটি মিছিল থেকে শহরের চাষাঢ়ায় মানবতা বিরোধীদের ফাঁসির দাবীতে চলা আন্দোলনের একটি মঞ্চ ভাংচুর করা হয়েছে। এসময় মিছিলকারীরা শহরের চাষাঢ়া এলাকা অবরুদ্ধ করে প্রায় ২০ মিনিটি ধরে তান্ডব চালায়। হাজারো মুসল্লীর মিছিল চাষাঢ়া গোল চত্বর এসেই সেখানে সান্তনা মার্কেটের সামনে নির্মিত চেতনা মঞ্চে হামলা চালায়। তারা মঞ্চ ও এর আশেপাশে থাকা মাইক ভেঙ্গে ফেলে। সেখানে থাকা সাবেক এমপি শামীম ওসমানের বেশ কয়েকটি ফেস্টুনও ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ অ্যাকশনে গেলে মিছিলকারীরা পিছু হটে।

সেদিন জুমআর নামাজ শেষে ডিআইটি এলাকায় ইসালামী ঐক্য জোট নারায়ণগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ফেরদাউসুর রাহমানের পরিচালনায় একটি সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ডিআইটি রেলওয়ে জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আওয়াল। উপস্থিত ছিলেন মাওলানা আব্দুল কাদির, মাওলানা আব্দুর রহমান, মাওলানা আবু সায়েম খালেদ প্রমুখ।

এদিকে জিউস পুকুর নিয়েও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সবশেষ আইভী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে এবার শহরের দেওভোগে জিউস পুকুর পাড়ে গণসমাবেশ হয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারী বিকেলের ওই গণসমাবেশের পর প্রতিক্রিয়া এসেছে মেয়র আইভীর কাছ থেকে। ওই সমাবেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের চেয়ে বেশী ছিলেন এমপি শামীম ওসমানের অনুগামীরা। বিভিন্ন এলাকাতে বাস ট্রাকে করে লোকজন জড়ো করা হয়। রীতিমত শো ডাউন দেন শামীম ওসমানের অনুগামীরা।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও