হেফাজত নেতাদের ভন্ডামী ফাঁস

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১৮ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ শনিবার

হেফাজত নেতাদের ভন্ডামী ফাঁস

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বক্তব্য দিয়ে অস্বীকার করেছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। মূলত চারটি ইস্যুতে সরব ছিলেন হেফাজত ও ওলামা পরিষদের নেতারা। এগুলো ছিল মাসদাইর কবরস্থান মাদ্রাসা উচ্ছেদ, ডিআইটি মসজিদের সামনে সেতু নির্মাণ, সিদুর পড়ে আইভীর প্রণাম ও বাগে জান্নাত মসজিদ মাদ্রাসা ইস্যু। তবে মাসদাইর মাদ্রাসা নিয়ে এর পরিচালক আবু আহমেদ সিদ্দিকের বক্তব্যে প্রমাণিত হয়েছে প্রকৃত তথ্য। ডিআইটি মসজিদের সামনে কোন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল না জানান মেয়র। সিদুর পড়ার ছবিটিও বিকৃতভাবে উপস্থাপন হয়েছেন জানান আইভী। ফলে হেফাজতের সামনে এখন শুধু একটা ইস্যু সেটা হলো বাগে জান্নান মসজিদ মাদ্রাসা।

১৮ ফেব্রুয়ারী মহানগর ওলামা পরিষদের সংবাদ সম্মেলন করেন হেফাজতের নেতারা। এই আন্দোলনে বাগে জান্নাত মসজিদ ও মাসদাইর মাদরাসার কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। এতে করে সাংবাদিক সহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আর তাতে করে হেফাজতে ইসলামের এই আন্দোলন বেশ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এই মসজিদ মাদরাসা ইস্যুতে সবচেয়ে বেশ আলোচিত হয় ১২ ফেব্রুয়ারী চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মসজিদের সামনে মহানগর ওলামায়ে পরিষদের সমাবেশ। সেই সমাবেশে মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান মেয়র আইভীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘উনি ঘুমটা দিতে চায়না উনি ঘুমটা খুলে বেটা সাজতে চায়।’, ‘কাপড়ডারে তো সুন্দর কইরা ধরে আইসা।’ তিনি আরো বলেছেন, নামাজও পড়েন না, দুই হাতে কতগুলো আংটি আছে, কুরবানীও করেন না। কইরেন না আপনি। আপনার ধর্ম ভাল না লাগলে যানগা অসুবিধা কি?। আপনি যান কিন্তু ধর্ম নিয়ে খেলতে দিব না। ধর্ম ব্যবসা আপনি করেন।’ মহানগর উলামা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুফতি রহমত উল্লাহ বুখারী বলেন, এখনও সময় আছে আব্দুল আউয়ালের কাছে ক্ষমা চান। নাহলে মেয়র তো দূরের কথা মেম্বারও হতে পারবেন না।

মহানগর হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, আপনার অবস্থান পরিস্কার করেন আপনি হিন্দু না মুসলিম অন্যথায় আপনাকেও জনগণ শীতলক্ষায় নিক্ষেপ করবে।

মহানগর উলামা পরিষদের সহ সভাপতি কামাল উদ্দিন দায়েমী বলেন, উলামা কেরামের বিরুদ্ধে যারা খেলতে আসে তাদের এই জমিনে জুতার বাড়ি খেতে হয়। আমরা দেখেছি আপনাদের একজন উলামায়ে কেরামের সঙ্গে খেলতে আসছিল কিন্তু খেলার আগেই উনি আউট হয়ে গেলো। মেয়র আপনি জুতা বাড়ি খাওয়ার আগে এই পাঁয়তারা বন্ধ করেন। নতুবা গদি ছেড়ে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে দেয়া হবে।

অথচ ১৮ ফেব্রুয়ারী দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের নিচে সিনামন রেস্টুরেন্টে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ওলামা পরিষদের উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মহানগর উলামা পরিষদের ও হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান বলেন, ‘আমরা মেয়র আইভীকে ব্যক্তিগতভাবে কোন আক্রমণ করিনি। তার সাথে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কোন শত্রুতা বা বিরোধ নেই। এখানে রাজনীতিক কোন ইস্যু নেই।’

পরে অবশ্য মেয়র আইভীকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়ার বক্তব্যের কারণে ভুল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন হেফাজতে ইসলামের নেতারা। তবে ব্যক্তিগতভাবে মেয়র আইভীকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যের বিষয়টি স্পষ্ট করেননি এই নেতারা।

সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহ বলেছেন, আমাদের মেয়র দেবতার সামনে প্রণাম করেছেন মাথায় সিঁদুর দিয়েছেন। মাজারে গিয়ে সেজদা করেছেন। মূর্তির সামনে দাঁড়ানো যেমন শিরক তেমনি মাজারে গিয়ে সেজদা করাও শিরক। যিনি দেবতাকে প্রণাম করেছেন তিনি এখন মুসলমানদের কাতারে নেই। অতএব মেয়র আইভী ইসলামের গন্ডি থেকে শিরকের গন্ডিতে পৌছে গিয়েছেন। কেউ যদি হিন্দু হয়ে যায় তাহলে আমাদের কিছু আসে যায় না। কিন্তু আপনাকে ঘোষণা দিতে হবে আমি চলে গেলাম। মুসলমান নাম দিয়ে আপনি ক্ষমতায় থাকবেন এটা হতে পারে না। আপনাকে আহবান করবো তওবা করেন কালেমা পড়ে মুসলমান হোন।

একই সুরে এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার জুমআর নামাজের খুতবার বয়ানে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও ডিআইটি রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, নারায়ণগঞ্জের এক মেয়র আছে। তার একটি ছবি দেখেছিলাম তিনি নাকি মন্দিরে গিয়ে সিঁদুর লাগিয়ে পূজা করতেছে। সেই ছবিটা ভাইরাল হয়েছে। একজন মুসলমান নারী নারায়ণগঞ্জের মেয়র হিসেবে দাবী করেন। কিন্তু মন্দিরে মূর্তির সামনে নমো নমো এটা কি মুসলমান হিসেবে সহ্য করা যায়? তার অবস্থা বুঝতেছি না। মাসদাইর কবরস্থানে দীর্ঘদিন ধরে একটা মাদরাসা ছিল সেই মাদরাসাটা ভেঙ্গে দিয়েছে। মসজিদটি ভেঙ্গে দিয়ে মসজিদ করে তার মনমতো বিদআতী ঈমাম ঢুকিয়েছে। হক ঈমামকে উচ্ছেদ করেছে। বলছিল মাদরাসা নিজস্ব অর্থায়নে করে দিবে। এখন পর্যন্ত মাদরাসা করে দেয়নি।

তিনি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন ‘একটি ছবি নিয়ে নানারকমের মিথ্যাচার। কুচক্রী কিছু সনাতনী ও হেফাজতিরা জনগণের মাঝে মিথ্যাচার করছে। ছবিটি ২০১৬ নির্বাচন প্রচারের। ছবিটি নারায়ণগঞ্জ সদরের গলাচিপা গোয়ালপাড়ার হিন্দু এলাকার। আইভি আপাকে কাছে পেয়ে সনাতনী সম্প্রদায়ের মা বোনেরা ফুল ছিটিয়ে স্বাগত জানান। আইভি আপা তাহাদের দুহাত জোর করে তাহাদের অভিনন্দন গ্রহণ করেন। আসছে নির্বাচন তাই ৫ বৎসর পরে ছবিটি নিয়ে কুচক্রী মহল মিথ্যাচার করছে।’ এছাড়া সেই ছবিতে মেয়র আইভীর কপালে সিদুর দেখা যায়নি।

এছাড়া হেফাজতের নেতারা যখন বার বার বলে আসছেন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী মাসদাইরের মাদ্রাসা উচ্ছেদ করেছেন তখনই আবু আহমেদ সিদ্দিক জানিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, মেয়র আইভী কোন মাদ্রাসা উচ্ছেদ করেনি। আমরা নিজেরাই সেটা সরিয়ে নিয়ে এসেছি। আমার ব্যক্তিগত জায়গাতে মাদ্রাসা নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন।

সিদ্দিক আরো বলেন, ‘মাসদাইরে যেখানে মাদ্রাসা ছিল সেটা ছিল সিটি করপোরেশনের জায়গার উপরে। তাও কবরস্থানের বেষ্টনীর ভেতরে। সেখানে আধুনিক মসজিদ নির্মাণের সময়ে যেহেতু আমি সভাপতি ছিলাম সেহেতু মেয়রের সঙ্গে বসে একটি আলোচনার মাধ্যমেই মাদ্রাসা সরিয়ে নেওয়া হয়। কোন উচ্ছেদ হয়নি। নানা কারণে পরে আর মাদ্রাসাটি করা হয়নি। সেখানে আমার ৭ শতাংশ জায়গা রয়েছে। আরো কিছু জায়গা প্রয়োজন। আশা করছি ৬ মাসের মধ্যেই মাদ্রাসা আরো বৃহৎ আকারে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়র আইভীর সিদুর পড়া ও মাসদাইর মাদরাসা উচ্ছেদের বিষয়টি সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এই দুটো ইস্যুতে ভুল তথ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতারা পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছিল যা শেষতক সম্ভব হয়নি। উল্টো ভুল তথ্য সহ নানা কারণে হেফাজতে ইসলামের নেতারা সাংবাদিকদের তোপের মুখে পড়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও