‘হেফাজত শামীম ওসমানের অনুগত, হত্যা মামলার আসামি’

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৫:৪২ পিএম, ৬ মার্চ ২০২১ শনিবার

‘হেফাজত শামীম ওসমানের অনুগত, হত্যা মামলার আসামি’

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহবায়ক ও নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী বলেছেন, শামীম তার অনুগত হেফাজতকে লাগিয়ে দেয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। হিন্দু কতিপয় নেতাদের লেলিয়ে দেয় তাদের বিরুদ্ধে। আমাদেরকে পিপড়ার মতো মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য তারা বলেছিল। এ নাসিম ওসমান বলেছিল। আমাদেরকে টুকরো টুকরো করে কেটে শীতলক্ষ্যায় ফেলে মাছ দিয়ে খাইয়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা করিয়েছে এ হেফাজতকে দিয়ে। আমার বিরুদ্ধে মিছিল করিয়েছিল কল্লা চাই ফাঁসি চাই বলে। এটা হেফাজতে ইসলাম করে। আরে ইসলামতো নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। যারা নাকি ইসলামের কথা তুলে তারা কিভাবে একটা নারীর হাত ভেঙে দেওয়ার কথা বলে, নারীকে শীতলক্ষ্যায় ফেলে দেওয়ার কথা বলে, কিভাবে এ নারীকে তারা তেতুলের সঙ্গে তুলনা করে। তারা কিসের ধর্মের মানুষ। তারা মিম্বরে বসে মিথ্যা কথা বলে অনাবরত। মিথ্যাচার করে। কেন করে সেটাও জানেন। শামীম ওসমান বাঁশিতে ফু দিলে তারা শুরু করে দেয়। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকায় শাপলা চত্ত্বরে যে ঘটনা ঘটেছে। এরপর দিন নারায়ণগঞ্জে যে ৭ থেকে ৮জনকে হত্যা করা হয়েছে, পুলিশ বিজিবি সহ। এ হত্যা মামলার আসামি হেফাজতের তারা। তারা রক্ষা পাওয়ার জন্য এ শামীম ওসমানের দারস্থ হয়। এরা হচ্ছে খুনের মামলার আসামি। মিম্বরে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলে, মিথ্যাচার করে। শামীম ওসমান যাই বলে তাই করে। এদের দ্বারা ইসলাম হেফাজত হবে।

৬ মার্চ শুক্রবার বিকেলে শহরের ডিআইটি এলাকায় সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের উদ্যোগে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ৮বছর উপলক্ষ্যে সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ত্বকী হত্যার এ তদন্ত যখন র‌্যাবের কাছে যায় র‌্যাব অত্যন্ত দক্ষতা, যোগ্যতার ও অভিজ্ঞতার সাথে এ তদন্ত কাজ তারা এক বছরের মাথায় শেষ করে। যেজন্য এখানে র‌্যাবের একটা কৃতিত্ব রয়েছে। যেহেতু র‌্যাব একটি সরকারি নিয়ন্ত্রিত সংস্থা সেহেতু সরকারের বাইরের যাওয়ার তাদের কোন এখতিয়ার নেই। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ আজ থেকে সাত বছর আগে তারা সংবাদ সম্মেলন করে যে অভিযোগপত্রটি তারা প্রেস করেছিলেন সেই অভিযোগপত্রটি তারা ফাইলবন্দি করে রেখেছেন। সেই অভিযোগপত্রে, এ ওসমান পরিবারের নির্দেশে, ওসমান পরিবারের লোকজন, তাদের টর্চার সেলেই ত্বকীকে হত্যা করেছে, কেন করেছে, এ সমস্ত কিছু সবাই জানে, দেশবাসীও জানে এবং আপনরাও জানেন। কিন্তু যখন নাকি এ ত্বকী হত্যা হলো সারা দেশের মানুষ জানলো নারায়ণগঞ্জের এ ওসমান পরিবার একটি ঘাতক পরিবার, খুনী পরিবার। তারা একটা শিশুকে হত্যা করেছে। তখন এ ওসমান পরিবার লজ্জিত হলো, ঘৃণীত হলো। তারা একে দমানোর জন্য বিভিন্ন পথ অবলম্বন করতে শুরু করলো।

শামীম ওসমানের নির্দেশে ত্বকীকে হত্যা : আজমেরী ওসমানের উপস্থিতিতে তার টর্চার সেলে হত্যা করা হয়েছে। আজমেরী ওসমানের সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নাই, বিরোধ নাই। র‌্যাব প্রতিবেদনে যে তিনটা কারণ উল্লেখ করেছে, সেই তিনটায় আমার সঙ্গে শামীম ওসমানের সঙ্গে সম্পর্ক। সেজন্য এ হত্যার নির্দেশ দাতা শামীম ওসমান। শামীম ওসমানের নির্দেশে তার ছেলে অয়ন ওসমান এবং তার ভাতিজা আজমেরী ওসমান এ হত্যাকান্ড সংঘঠিত করেছে তাদের অনুগত বাহিনী দিয়ে। এটা স্পষ্ট করতে হবে।

তিনি বলেন, সাত খুনের যে মামলা, এ মামলায় নূর হোসেনকে প্রধান করে অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়েছে। আমরা বিভিন্ন আলামতে দেখি সাত খুনের ঘটনায় শামীম ওসমানের কতটা সম্পৃক্ততা। এ যে সাতখুন মামলার হাজার পৃষ্টার নথি, এ নথির মধ্যে র‌্যাবের পুর্নেন্দু বালা স্পষ্ট করেছে হাইকোর্টে, এ সাত খুনের সঙ্গে শামীম ওসমান জড়িত। নথিতে সাত খুনের মামলায় শামীম ওসমান জড়িত পুর্নেন্দু বালার কথা লেখা আছে। যেহেতু পুর্নেন্দু বালা নি¤œ আদালতে এটা বলে নাই সেহেতু এটা তারা গ্রহণ করে নাই। যে জন্যে নি¤œ আদালতের শুরুতে অভিযুক্ত যারা তাদেরকে সঠিকভাবে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সায়াম প্লাজায় শামীম ওসমানের ক্যাাডারের অফিসে নেওয়া হয় ত্বকীকে : রাব্বি বলেন, এ শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের নাম তদন্ত প্রতিবেদনে এসেছে। আমরা সব সময়ই বলে আসছি, ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে শামীম ওসমানের নির্দেশে এবং এর সঙ্গে তার ছেলে অয়ন ওসমান জড়িত। তাদের পরিবারের বিভিন্ন লোকজন এর সঙ্গে জড়িত। র‌্যাবের যে অভিযোগ পত্র সেখানে বলা হয়েছে, রাত ৯টায় আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে উইনার ফ্যাশনে ত্বকীকে নেওয়া হয়েছে শ্রমকল্যান অফিস থেকে। ত্বকী বাসায় আমার সঙ্গে আলাপ করে বের হয় বিকেল ৪টায়। সুবিধজন পাঠাগার থেকে একটি বই নিবে। সুধীজন পাঠাগার থেকে বই নিয়ে ৪টায় বের হয় ৯টায় আজমেরী ওসমানের টর্চার সেলে তাকে নেওয়া হলো। ফলে এ যে, ৪টা থেকে রাত ৯টা এসময়টা সে কোথায় ছিল? অভিযোগপত্রে এটি স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আইন অনুযায়ী এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ত্বকী এ সময়টা কোথায় ছিল। ৯টার সময় কি কারনে, কিভাবে তাকে নেওয়া হল।

খুনের রাজনীতি ওসমান পরিবার করে : রাব্বি বলেন, এ খুনের রাজনীতিটা নারায়ণগঞ্জের একটি মাত্র পরিবার, ওসমান পরিবার করে। আজকে না, তারা শুরু থেকেই এ রাজনীতি করে। ১৯৭৩ সালে এ ওসমান পরিবারের লোকজনই, তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হেলালকে হত্যা করেছে। ১৯৮৮ সালে তারু সরদারের ছেলে কামালকে হত্যা করেছে। হেলালকে হত্যা করার পর নারায়ণগঞ্জে যখন বিক্ষোভ বেড়ে গেলো তখন এর থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য নিজেদের লোক কালামকে হত্যা করে তারু সরদারের পরিবারের বিভিন্ন জনের নামে মামলা দেয়। এবং তারা এটা রফা করার প্রস্তাব দেয়। এরা খুনের রাজনীতিটা আজকে না বহুদিন ধরে করে।

তারা খুন করলেও খুনি না : রফিউর রাব্বি বলেন, এ পরিবার যারা মনে করে নারায়ণগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার করতে হলে লাশ না ফেললে উপায় নাই। নারায়ণগঞ্জে ছাত্রলীগের মিঠুকে এ আজমেরী ওসমান দাঁড়িয়ে থেকে প্রকাশে জামতলায় কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ হত্যার মামলা ফতুল্লা থানায় নেয় নাই। যখন আজমেরী ওসমানের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তখন তারা মামলা নিয়েছে। এজন্য আমি বলি যে, তারা খুন করলেও খুনি না। কারণ তাদের নামে কেউ মামলা করার সাহস পায় না। কারণ মামলাবাজতো তারা। মামলা করলে তারা করবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল তারা করবে। তাদের বিরুদ্ধে কেন মামলা করা হবে।

তারা ক্ষমতার রাজনীতি, দল বদলের রাজনীতি করে : রফিউর রাব্বি বলেন, তাদের এক অনুগত লোক ইতিহাস শিখাতে চান। তিনি ইতিহাস বলে দিবেন। সোমে সোমে আটদিন যার বয়স আর তিনি নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস বলবেন। আছা আমি বলি আপনি বলেন, ১৯৬৫ সালে আওয়ামীলীগের কোন নেতা পিডিবিতে যোগ দিয়েছিল। আওয়ামীলীগ ত্যাগ করে। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে যে লুট হয়েছে ব্যংক, বীমা, বাজার, হাট, সেই লুটের শতকরা ৩০ ভাগ টাকা কোন নেতা নিয়েছে নাম বলেন? বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জিয়াউর রহমানের সময় যখন আওয়ামীলীগ প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসে তখন আওয়ামীলীগ দ্বিধা বিভক্ত। মালেক আওয়ামীলীগ, মিজাম আওয়ামীলীগ। যা ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা এসে সমাপ্ত করেন। তারা ক্ষমতার রাজনীতি, দল বদলের রাজনীতি আজকে না, স্বাধীনতার আগে থেকেই করে। তাদের কোন নীতি আদর্শ নাই।

তথাকথিত ধর্মীয় নেতাদের কথায় কান দিবেন না : নারায়ণগঞ্জে হিন্দু নেতারা যারা আছে তাদের শামীম ওসমান নির্দেশ দিলো তারা নেমে গেলো। তারা কি হিন্দুদের রক্ষার জন্য মাঠে নেমেছে? শ্যামল কান্তি ভক্তকে এ সেলিম ওসমান যখন কান ধরে উঠবস করিয়েছে তখন সারা বাংলাদেশে প্রতিবাদ হলো আমরা করলাম। এ নেতাদের মুখে টু শব্দও শুনলাম না। কেন যে, এ কান ধরিয়ে উঠবস করিয়েছে সেলিম ওসমান। এর বিরোধিতা করা যাবে না। সুতরাং আমাদের ভাইদের বলি এ তথা কথিত ধর্মীয় নেতাদের কথায় কান দিবেন না।

নারায়ণগঞ্জ তাদের জন্য নিরাপদ না : রাব্বি বলেন, এ শামীম ওসমান। আমরা যখন বাস ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিবাদে আন্দোলন করেছি সে এ বাস ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে ছিল। তখন র‌্যাবকে এ বন্ধন পরিবহনের মালিকেরা চিঠিতে উল্লেখ করেছিল তারা প্রতি মাসে শামীম ওসমানকে কত টাকা দেয়, নাসিম ওসমানকে কত টাকা দেয়। বলেছিলাম এ চাঁদা বন্ধ করলে আমাদের ভাড়া বাড়াতে হয় না। তারা বিভিন্ন পন্থায় নারায়ণগঞ্জ থেকে টাকা নেন। তারা নারায়ণগঞ্জে আসেন বক্তৃতা দিতে, চাঁদাবাজী করতে। রাতে ঢাকায় ঘুমান। নারায়ণগঞ্জ তাদের জন্য নিরপাদ না।

পরে সন্ধ্যায় ডিআইটি থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের উদ্যোগে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে মিছিলটি চাষাঢ়া শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।

প্রসঙ্গত ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বিকেলে ত্বকী শহরের শায়েস্তাখান সড়কের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরে ৮ মার্চ সকালে চাড়ারগোপে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। ত্বকী হত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে ৮জনই পলাতক। আর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্ধেহে ৫জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুইজন আসামি ইউসুফ হোসেন লিটন ও সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কিন্তু এ হত্যাকান্ডের ৮ বছর অতিবাহিত হলেও এখনও পর্যন্ত এ মামলার অভিযোগ পত্র দেয়া হয়নি।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও