মসজিদের মিম্বর রাজনীতির ঢাল

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৬ পিএম, ২ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার

মসজিদের মিম্বর রাজনীতির ঢাল

মসজিদ হচ্ছে আল্লাহর ঘর; আর মসজিদের মিম্বার হচ্ছে সবচেয়ে সম্মানিত স্থান। অথচ সেই মিম্বারকেরাজনীতিক ঢাল বানিয়ে কেউ কেউ স্ট্যান্টবাজি করছে, কেউ আবার ওয়াদা ভঙ্গের মত গুরুতর অপরাধ করছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আব্দুল আউয়াল ডিআইটি মসজিদের মিম্বরে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে কখনো আইভী বিরোধীতা করেছেন আবার কখনো হেফাজতের নানা কর্মকান্ড নিয়ে সমালোচনা করে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে একদিনের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দদের হস্তক্ষেপে পদত্যাগের ঘোষণা থেকে সরে এসেছেন এই নেতা। এতে কার্যত অর্থে ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন, মসজিদের মিম্বরে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসল্লীর বসে দেয়া কথা রাখতে পারেনি। বরং মুসল্লীদের অনুভূতি নিয়ে খেলা হয়েছে। মিম্বরে বসে ধর্মীয় বয়ানের সাথে রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলেছে। এতে করে মুসল্লিদের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

বোদ্ধামহল বলছে, মসজিদের মিম্বরে বসে রাজনীতিক বক্তব্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এটা নিছক স্ট্যান্টবাজি ও রাজনীতির অংশবিশেষ। বর্তমান যুগের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিকে বলা হয়ে থাকে ভিন্ন ইস্যু। আর সেই রাজনীতিক বক্তব্য দিয়েছেন মসজিদের মিম্বরে বসে। যেখানে শান্তির ধর্মের কথা শুনতে মুসল্লিরা ভিড় করে সেখানে রাজনীতি ঢুকিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চলছে। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, মসজিদের মিম্বরে বসে কথার বরখেলাপ করা। হেফাজতে ইসলামের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে পরবর্তীতে ঠিকই পদে রয়ে গেছেন। এতে করে ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। এতে করে ধর্ম আর রাজনীতিকে মিলিয়ে জগাখিচুরি করে ফেলছেন আলেম সমাজের একাংশ।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতে ইসলামের একটি বড় অংশের নেতৃবৃন্দরা স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন যাবত। তবে মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে এখন পর্যন্ত বশে আনতে পারেনি। তাই মাইনাস ফর্মূলায় ফেলার পরিকল্পনা আটে মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান ও তার অনুগামীরা।

এদিকে গত ২৮ মার্চ সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। নারায়ণগঞ্জেও হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দরা প্রস্তুত ছিল। তবে সকাল থেকে জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর আব্দুল আউয়ালকে মসজিদে ঘিরে ফেলে পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সেখানে প্রশাসন গুলি চালিয়ে হলেও প্রতিহত করার কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে। এতে বিশৃঙ্খলা সহ জানমাল রক্ষার্থে রাজপথে আন্দোলন করা থেকে বিরত থাকে এই নেতা। এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি হেফাজতে ইসলামের অনেকে। তারা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান সহ তার অনুগামীদের নেতৃত্বে সিদ্ধিগঞ্জে আন্দোলন করে ও আধা বেলা হরতাল পালন করে।

পরবর্তী দিন ২৯ মার্চ বিকেলে দেওভোগ মসজিদে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত সারা দেশে মোদি বিরোধী বিক্ষোভে আহতদের সুস্থতা কামনা ও নিহতদের স্মরণে দোয়া মাহফিলের কার্যক্রম শেষে নেতাকর্মীদের নিয়ে আলোচনায় মাওলানা ফেরদাউসুর বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রে অভিযোগ করব এবং ঢাকা মহানগরে অভিযোগ দিয়েছি যে এই সভাপতি আমাদের চলবে না। ওনার অতিতের ইতিহাস এরকম। উনি যখন হার্ডলাইনে দেখে তখন ব্যাকফুটে চলে যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলার আমীর আল্লামা আব্দুল আওয়াল সাহেব সকাল ১০টা বাজে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন এই ঘোষণার সাথে আমরা একমত ছিলাম না।’

ওই দিন রাতে শবে বরাত উপলক্ষ্যে ডিআইটি সমজিদে আলোচনায় প্রথমে শবে বরাত নিয়ে বয়ান করেন ও পরে হেফাজতে ইসলামের নানা কর্মকা- নিয়ে সমালোচনার এক পর্যায়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

সেদিন মসজিদের মিম্বর যেখানে বসে ঈমাম বয়ান করেন সেখানে বসে আবদুল আউয়াল বলেন, ‘২৮ মার্চ হরতালের দিন সকালে মসজিদে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছুটে আসেন। তারা মসজিদের গেটের সামনে তিনটি কামানা, সাজোয়া যান পুলিশের গাড়ি দিয়ে বেরিকেড দিয়ে রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় মিছিল বের করতে চাইলে অ্যাকশনে যাবে। তাদের উপরের নির্দেশেনা রয়েছে। প্রয়োজনে গুলি করবে। তখন আমি সকলের জানমালের স্বার্থে মসজিদের গেটের বাইরে যেতে বারণ করি। কারণ আমাদের তো অস্ত্র নাই। কিন্তু মহানগরের অতি উৎসাহী নেতারা মিছিল করতে চেয়েছিল। যদি সেদিন মিছিল করতে গিয়ে আমাদের উপর গুলি ছোড়া হতো, কেউ লাশ হতো তখন তো এ আবদুল আউয়ালকে দোষারোপ করা হতো। মসজিদে গুলি ছুড়লে ঝাঝরা হয়ে যেত। তখন আপনারাই বলতেন কেন লাশ হলো মানুষ। এ কেমন নেতৃত্ব। এসব নেতৃত্ব আমরা মানি না। তখন মেয়র আইভী সহ অনেকেই সুযোগ নিতেন আমাকে সরিয়ে দিতে। মামলা হয়েছে। যদি আমরা মিছিল করার চিন্ত করতাম তাহলে সবগুলো মামলার আসামী হতাম আমি সহ সকলে। এ কারণে আমাদের লোকজনও অনেকেই ক্ষুব্ধ। তারা আজকে (সোমবার) ডিআইটি মসজিদে বাদ আছর দোয়া না করে দেওভোগে করেছে। কারণ আমাকে তো বাদ দিয়েই দিছে। তাই আমি আর দল করবো না। ভবিষ্যতে আর নেতৃত্ব দিব না। মসজিদ মাদ্রাসা নিয়েই থাকবো। আমার এখন বার্ধক্য বয়স তাই আমি ভবিষ্যতে আর নেতৃত্বে থাকবে না। আমি আমার জিম্মাদারী ছেড়ে দিলাম। আমি হেফাজত ইসলামের নেতৃত্বে আর থাকবো না। আমার আমির পদ দরকার নাই। আমার পক্ষ থেকে আর কোন দিন ঘোষণা আসবে না। তোমরা যারা অতি উৎসাহীওয়ালা আছো, তোমরা বাবা হেফাজত ইসলাম করো।’

আব্দুল আউয়ালের পদত্যাগের ঘোষণার পর ৩১ মার্চ বিকেলে শহরের ডিআইটি মসজিদে কেন্দ্রীয় হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দরা প্রায় ২ ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আবদুল আউয়ালের মান অভিমান ভাঙায়। পদত্যাগ থেকে সরে আসেন। এতে করে তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন। মসজিদের মিম্বরে বসে যে কথা দিয়েছিলেন তা রাখতে পারেননি।

এর আগে মসজিদের মিম্বরে বসে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বিরোধীতা করে সমালোচনা করেছেন মাওলনা আব্দুল আউয়াল। গত ৫ ফেব্রুয়ারী ডিআইটি মজিদের জুমআর নামাজের খুতবার বয়ানে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, নারায়ণগঞ্জের এক মেয়র আছে। তার একটি ছবি দেখেছিলাম তিনি নাকি মন্দিরে গিয়ে সিঁদুর লাগিয়ে পূজা করতেছে। মন্দিরে মূর্তির সামনে নমো নমো এটা কি মুসলমান হিসেবে সহ্য করা যায়? তার অবস্থা বুঝতেছি না। মাসদাইর কবরস্থানে দীর্ঘদিন ধরে একটা মাদরাসা ছিল সেই মাদরাসাটা ভেঙ্গে দিয়েছে। মসজিদটি ভেঙ্গে দিয়ে মসজিদ করে তার মনমতো বিদআতী ইমাম ঢুকিয়েছে। হক ঈমামকে উচ্ছেদ করেছে। বলছিল মাদরাসা নিজস্ব অর্থায়নে করে দিবে। এখন পর্যন্ত মাদরাসা করে দেয়নি।

তিনি বলেন, আপনি ফুটপাত দখল করে বাবার নামে কোটি টাকা খরচ করে পাঠাগার করেছেন। মানুষগুলো হাটতে পারছে না। আসলে আপনার উদ্দেশ্য কি? আপনি কি চাচ্ছেন? আপনি মাজারওয়ালাকে জায়গা দিতে পারেন। তাদের সাথে এত ভাল আচরণ আর আমাদের সাথে খারাপ আচরণ কারণটা কি? আসল হলো আপনি মাজারপন্থী আপনি শিরকপন্থী আপনি ঠিকমতো নামাজ পড়েন না এই কারণে আপনি এই সমস্ত করতে পারছেন।

১৯ ফেব্রুয়ারী জুমআর নামাজের খুতবার বয়ানে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমীর ও ডিআইটি রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল বলেন, কতদিন কতদিন! ক্ষমতায় আল্লাহ সবসময় রাখে না। আল্লাহ বলেন, আমি যাকে মসনদে রাখি যাকে ইচ্ছা মসনদ থেকে উষ্টা দিয়ে ফেলে দেই। আমি কাউকে ইজ্জত দেই কাউকে বেইজ্জত করে দেই। এ সমস্ত কিছুই আমার হাতে। কেন আমাদের এভাবে কালারিং করছেন। কেউ যদি কোনো নোট পেয়ে থাকে তারা পেয়েছে। মিম্বরে বসে আল্লাহ স্বাক্ষী আমরা এসমস্ত ব্যাপারে খোদার কসম কোনো দিন একটা টাকা হাতের কাছে আনি নাই। বরং এসমস্ত প্রস্তাব এলে লাথি মেরে ফেলে দিতে চাই। টাকার গোলামী করি না আমরা আল্লাহর গোলামী করি।

আবদুল আউয়াল বলেন, আপনার এখানে মাজারওয়ালারা জায়গা পায় গাউসিয়াওয়ালারা জায়গা পায় স্কুলওয়ালারা জায়গা পায় শুধু মাদরাসাওয়ালারা জায়গা পায় না এখন বেতন নাই বিধায়। আসলে আপনার মনের উদ্দেশ্য খারাপ। আপনি আমাদেরকে সহ্য করতে পারেন না। এ কারণে আমাদের ভিন্নভাবে দেখছেন। কোনো কথা উত্তর দিলেন না। এমন একটা বিষয় নিয়ে এসে পুরো সাংবাদিকদের ক্ষেপিয়ে তুললেন। ফোনলাপ হয়েছিল আপনার সাথে আমার সাথে। এটা সাংবাদিকদের কাছে গেল কেমনে। উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবেই আপনি এটা তৈরি করেছেন। আপনিও তো বিরাট করে সন্ত্রাসী কায়দায় হুমকি দিলেন। আমি বারবার বলছি আমি কখনও বলি নাই আপনার কবর রচিত হবে। ডিআইটি মসজিদে হাত দিলে তার খবর রচিত হবে সে যে কেউই হোক না কেন। আপনারা এভাবে করে গত ১৫দিন নারায়ণগঞ্জে পত্রিকাগুলোর মধ্যে এটাই ছাড়ছেন। যেন আর কোনো বিষয় নাই। সরকারী জায়গা জনগণের হক। জনগণের জন্য পার্ক থাকতে পারে স্কুল থাকতে পারে তাহলে মসজিদ মাদরাসা মাদরাসা কেন থাকবে না। আমাদেরকে থ্রেড দিচ্ছে আপনারা। বড় আপসোস লাগে।

সাধারণ মুসল্লিরা বলছেন, মসজিদের মিম্বর কোন রাজনীতিক প্লাটফর্ম না। অথচ সেখানেও রাজনীতি ঢুকে গেছে। মুসল্লিরা মসজিদে যায় ধর্মীয় বাণী শুনতে। আলোর পথে আসছে। কিন্তু সেখানেও নোংরা রাজনীতি ঢুকে গেছে। রাজনীতিক দলের নেতাকর্মীদের নিয়েও বক্তব্য দেয়া হয়। আলেম ওলামারা কেন পচা শামুকে পা দিচ্ছেন বোদগম্য হচ্ছেনা। তার উপরে রাজনীতিবিদদের মত ওয়াদার বরখেলাপও করছেন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও