ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০২:৪৮ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২১ শনিবার

ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস

নারায়ণগঞ্জে সোনারগাঁও উপজেলায় থ্রি স্টার মানের অভিজাত রয়েল রিসোর্টে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক নারী সহ অবরুদ্ধের ঘটনার পর ওই কক্ষেই ছুটে যান ছাত্রলীগের জেলা কমিটির সাবেক সহ সভাপতি সোহাগ রনি, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু সহ যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজন। রনি নিজেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। রিসোর্টের ৫০১ নাম্বার রুমে প্রায় ৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধের এক পর্যায়ে ছুটে যান প্রশাসনের লোকজন। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টায় যখন হেফাজতের লোকজন মিছিল নিয়ে রয়েল রিসোর্টে হানা দেয় তখন বেরিয়ে এসেই মহড়া দেন মামুনুল হক সহ অনুগামীরা। পরে ব্যাপক তান্ডব চালায় হেফাজতের লোকজন। ভাঙচুর করে সোহাগ রনি ও যুবলীগ সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নুর ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের অফিস। এ ঘটনার পরে সোহাগ রনি ও নান্নুর উপর চটে যান হেফাজতপন্থীরা। তারা চেয়েছিল সোহাগ রনি ও নান্নুকে হত্যা করবে। প্রথম টার্গেট ছিল ঘটনার রাতেই। কিন্তু সেদিন বাড়িঘর ও বাসায় ব্যাপক লুটতরাজ চালালেও সেখানে ছিলেন না নান্নু ও রনি। সেটা ব্যর্থ হওয়ার পরেও টার্গেট ছিলেন তারা। সেই পুরো পরিকল্পনা এখন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অনুসন্ধানে বের করেছেন চাঞ্চল্যকর তথ্য। হেফাজতপন্থী কয়েকজনের ফোন কল, ফেসবুকের স্ট্যাটাস, মেসেঞ্জার আর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ওইসব তথ্যে রীতিমত গা শিউরে উঠার মত। তাদের পরিকল্পনা ছিল মামুনুল হক ইস্যুতে সোহাগ রনি ও নান্নুর উপর আঘাত। এবং সেটা হত্যা পর্যন্ত। এ জন্য যাবতীয় পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সেটা আর বাস্তবায়ন করতে দেয়নি নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনজনকে। ডিবির একাধিক টিমের অভিযানে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন খালেদ সাইফুল্লাহ সাইফ, হেফাজতে ইসলামের কর্মী কাজি সমির, আব্দুল ওয়াহেদ। তাদের মধ্যে অহিদ তাবলীগ জামাতের সদস্য ও করোনায় কাজ করা এহসান পরিবারের সদস্য। শহরের মাসদাইর ও আশপাশ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আবদুল ওয়াহেদ শেরেবাংলা রোড মাসদাইর এলাকার শহীদুল্লাহজ মিয়ার ছেলে, খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে সাইফ উত্তর মাসদাইর এলাকার নোয়াব আলীর ছেলে ও কাজি সামির উত্তর মাসদাইর এলাকার কাজী সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম জানান, যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের ব্যাপারে গোয়েন্দাদের তথ্য ছিল। তাদের তথ্য মতে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। আমরা এসব তথ্য উপাত্ত আরো যাচাই বাছাই করে দেখছি। তার পরে নিশ্চিত হওয়ার পরে আমরা গণমাধ্যমকে ব্রিফিং করবো।

এদিকে যুগান্তরে সংবাদে বলা হয়, হেফাজত নেতা মামুনুল হককে অবরুদ্ধ করার ইস্যুতে সোনারগাঁয়ের কয়েকজন সরকারদলীয় নেতাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হেফাজতের একটি গ্রুপ। সেই পরিকল্পনায় সোনারগাঁ যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি সোহাগ রনি, সোনারগাঁ ছাত্রলীগের সদস্য ও জার্নালিস্ট ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক রাকিবুল হাসানকে টার্গেট করা হয়েছিল।

এই পরিকল্পনার প্রাথমিক অংশ হিসেবে হেফাজতের হামলার শিকার হয়েছিলেন সোনারগাঁয়ের সাংবাদিক হাবিবুর রহমানও। ওই তিন নেতাকে হত্যা করতে ইতোমধ্যেই হেফাজতের কয়েকজন তাদের ফেসবুকের মাধ্যমে নিজেদের গ্রুপ পোস্টে বার্তাও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

তারা জানিয়েছেন, ছাত্রলীগের নেতা সোহাগ রনিকে হত্যার করতে নিজেদের মধ্যে পরিকল্পনার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও হাতে এসেছে তাদের। সুনির্দিষ্ট এসব প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়েছে এই পরিকল্পনার মূল হোতা হেফাজতে ইসলামের নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ সাইফ, হেফাজতে ইসলামের কর্মী কাজি সমির ও তাবলীগ জামাতের সদস্য আব্দুল অহিদকে।

জেলা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, মামুনুল হকের অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনার পর হেফাজতের ম‚ল টার্গেটে পরিণত হন সোনারগাঁয়ের জনপ্রিয় ছাত্র নেতা সোহাগ রনি। মামুনুল হকের কথিত স্ত্রী ঝরনার ছবির সঙ্গে রনির ছবি জুড়ে দিয়ে তাকে ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী বানিয়ে প্রোপাগান্ডাও চালানো হয়। এই অপকর্ম থেকে রক্ষা পাননি যুবলীগ নেতা নান্নুও।

ওই সূত্র জানান, হেফাজতের এই সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিশাল সাইবার সেলের সদস্যরা। এসব কান্ড ঘটিয়ে তারা রনি ও নান্নুর বিরুদ্ধ জনরোষ সৃষ্টি ও হেফাজতের কর্মীদের খেপিয়ে তুলতে চেয়েছিল যা হত্যা পরিকল্পনার অংশ বলেই মনে হচ্ছে।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, যে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা সোনারগাঁয়ের সরকারদলীয় নেতা সোহাগ রনিকে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত ছিল। আমাদের হাতে একাধিক তথ্য প্রমাণ ও অডিও রেকর্ড এসেছে। তবে তদন্তের খাতিরে এখন কিছু বলা যাবে না।

৩ এপ্রিলের ঘটনার পরদিন মুফতি ফয়সাল মাহমুদ হাবিবী বাদী হয়ে সোনারগাঁও থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘মামুনুল হক ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ে রয়েল রিসোর্টে সম্পূর্ণ নিয়মকানুন মেনে স্ত্রী সহ অবস্থান করেন। হোটেল মালিক সাইদুর রহমান নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হন। এলাকার কতিপয় সন্ত্রাসী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি সোহাগ হোসেন রনির নেতৃত্বে কতিপয় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মামুনুল হকের উপর হামলা চালায়। তার জামার কলার ছিড়ে ফেলে, দাড়ি ধরে টান দেয়, শারিরীক ভাবে লাঞ্ছিত করে, অশ্লীল, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, গাড়ির চাবি, ম্যানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।’

পরদিন সোনারগাঁ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইয়াউর রহমান সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলা ও রয়্যাল রিসোর্ট ভাঙচুরের ঘটনায় ৪১ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মামুনুল হককে।

এসআই আরিফ হাওলাদার বাদী হয়ে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আরও একটি মামলা করেন। এ মামলায় ৪২ জনের নাম উল্লেখ ও ২৫০-৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। এ মামলায় আসামি করা হয়েছে হেফাজতে ইসলাম, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের।

অপর মামলাটি করেন হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের হামলায় আহত স্থানীয় এস এ টেলিভিশনের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান। এ মামলায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ ও ৭০-৮০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

৩ এপ্রিল বিকেল ৫টায় সোনারগাঁয়ের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নাম্বার কক্ষে মামুনুল হককে নারী সহ অবরুদ্ধ করে রাখে উপজেলা যুবলীগের, ছাত্রলীগ সহ স্থানীয় কয়েকজন। খবর পেয়ে সোনারগাঁও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যান। সন্ধ্যা ৭টায় মামুনুল হককে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে খবর পেয়ে স্থানীয় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা রয়েল রিসোর্টের সামনে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা রিসোর্টের প্রধান ফটক ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর করতে শুরু করে। এসময় রিসোর্টের বাইরে থাকা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। আর একদল বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মী উপজেলার মোরগাপাড় মোড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাশ, কাঁঠে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। কয়েকটি গাড়িতে হামলা চালিয়ে গ্লাস ভাঙচুর করে। রাত পৌনে ৯টায় পুলিশ গিয়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে সরিয়ে দেয়। ওই রাতে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি সোহাগ রনির বাড়িতে তান্ডব চালায়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) টিএম মোশাররফ হোসেনকে বদলি করা হয়েছে।

রে ৭ এপ্রিল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। সেদিন ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এর সঙ্গে জড়িতদের দ্রæত চিহ্নিত করে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।

সেদিন তাঁরা সোনারগাঁয়ে এসে প্রথমে আওয়ামী লীগ কার্যালয়, ভাঙচুরের শিকার উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি সোহাগ রনির বাড়িতে যান। তারা ভাঙচুরের চিত্র দেখে হতবাক হয়ে পড়েন।

পরে ৮ এপ্রিল উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম নান্নু, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি সোহাগ রনির বাবা হাজী শাহ জামাল তোতা ও মোগড়াপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের প্রচার সম্পাদক নাছির উদ্দিন পৃথকভাবে তিনটি মামলা করেছেন। হাজী শাহ জামাল তোতার মামলায় ২০ জনের নাম উলে­খ ও অজ্ঞাত আরও ৩০ থেকে ৪০ জনকে আসামী করা হয়। এর মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত হেফাজতের আন্দোলনকে বেগমান করতে লাশ চেয়েছিল হেফাজতের নেতাকর্মীরা। হরতাল চলাকালে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা ছিল হেফাজতের নেতাকর্মীদের। শহরের ডিআইটি রেলওয়ে জামে মসজিদের বাইরে ওই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু জেলা হেফাজতের আমীর মাওলানা আবদুল আউয়াল সেটাকে সায় দেয়নি। একই দিন দুপুরের পর থেকে রাত অবধি মহাসড়কে সাইনবোর্ড থেকে শিমরাইল পর্যন্ত চলে ব্যাপক তান্ডব।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও