দুই সন্ত্রাসীর দ্বন্দ্বেই ৭ খুন

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৩:১৯ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২১ মঙ্গলবার

দুই সন্ত্রাসীর দ্বন্দ্বেই ৭ খুন

‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক দুইজন কাউন্সিলর নূর হোসেন ও নজরুল ইসলামের মধ্যকার বিরোধ ও দ্বন্দ্বেই সাত খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর এখানে ‘সুশৃঙ্খল’ বাহিনী র‌্যাবের উচ্চ বিলাসী কয়েকজন জনতার সঙ্গে মিশে ঘৃণ্যভাবে হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে যেখানে শুধুমাত্র নজরুল একক টার্গেট থাকলেও প্রাণ হারাতে হয়েছে নিরীহ ছয় জনকে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকর্তাদের নিয়োগে আরো সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।’

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘একটি শৃঙ্খল বাহিনীর কিছু সংখ্যক দুস্কৃতিকারী এবং রাজনৈতিক তথা সন্ত্রাসীদের কাজ। এখানে একজন নূর হোসেন একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ভূমিদুস্য। অপরজন (নজরুল) সন্ত্রাসী পরিচিতি লাভ করেছেন। সিটি করপোরেশনের সাবেক দুইজন কাউন্সিলর নূর হোসেন ও নজরুল ইসলামের মধ্যকার বিরোধ ও দ্বন্দ্বেই সাত খুনের ঘটনা ঘটেছে। দুই জনেই সন্ত্রাসী ছিলেন, দুইজনের ছিল বিশাল বাহিনী। দুজনেই এলাকায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পরেন। নূর হোসেনের প্রধান টার্গেট ছিল নজরুল। কিন্তু এখানে একজন তথা নজরুলকে হত্যা করতে গিয়ে নূর হোসেন বাহিনী ও র‌্যাব সদস্যদের দ্বারা নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হতে হয়েছে নিরীহ ৬জনকে।’

পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ‘র‌্যাব একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। দেশের ক্রান্তিলগ্ন থেকে শুরু করে জঙ্গি দমন, সন্ত্রাস দমন, মাদক নির্মূল এসব কাজে র‌্যাবের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। র‌্যাব একটি প্রশংসিত বাহিনী। র‌্যাবের উচ্ছাভিলাষী কয়েকজন কর্মকর্তার কারণে পাবলিকের সঙ্গে মিশে এ হত্যাকান্ডের ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। এর দায় পুরো বাহিনীর উপর না। যারা ঘটিয়েছেন তাদের ব্যক্তিগত উপর দায় বর্তাবে। এর পেছনে তাদের ব্যক্তিগত লোভ লালসা, উচ্চভিলাসী ঘৃণ্য কাজেই ঘটনাটি ঘটেছে। এ সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের সাময়িক মর্যাদা কিছুটা নষ্ট হলেও সামগ্রিক র‌্যাবের সুনাম ক্ষুন্ন হয়নি।’

এদিকে নজরুল নিহত হওয়ার ৪৭ দিন আগেই আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেন তাকে মেরে ফেলবে আশংকা করে নজরুল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে যাদের কাছে আবেদন করেছিল তাদের হাতেই প্রাণ গিয়েছে তার!

২০১৪ সালের ৯ মার্চ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বরাবর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ১দিন পর ১০ মার্চ আবেদনটি পাঠানো হয় র‌্যাব ডিজির বরাবর। র‌্যাবের ডিজি র‌্যাব-১১ এর সিইও এর কাছে ১১ মার্চ পাঠায়। সেই র‌্যাব-১১ এর সিইও তারেক সাঈদের নেতৃত্বেই নজরুলসহ আরও ৬ জনকে খুন হয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে করা আবেদনে উল্লেখ করেন, ‘১৯৯৮ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে তৎকালীন বিএনপির নেতা ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নূর হোসেনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরপর সে আমাকে হত্যা করতে নানাভাবে চেষ্টা চালায়। এর কিছুদিন পর নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হলে নূর হোসেনের লোকজন মিজমিজি এলাকার নিরীহ জহিরকে গুলি করে হত্যা করে। ২০০০ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কার্যালয়ের সামনে আমাকে হত্যার জন্য ভাড়াটিয়া খুনী দিয়ে গুলি করলে আমার বাল্য বন্ধু যুবলীগের থানা কমিটির সদস্য আব্দুল মতিন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এ সময় এলাকায় নূর নানা অপকর্ম করে সন্ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ালী লীগ ক্ষমতায় এলে নূর হোসেন দেশে ফিরে এসে পুনরায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম, চাঁদাবাজি, নদী দখল, মাদক ব্যবসা পাশাপাশি শিমরাইল চৌরাস্তা ট্রাক স্ট্যান্ডে রাতের অন্ধকারে অশ্লীল নৃত্য ও জুয়ার আসর বসায়। ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে ২ নং ওয়ার্ডের চৌধুরীপাড়ার মৌচাক সড়কে সিটি কর্পোরশনের রাস্তা নির্মাণ কাজ তদারকি করার সময় ২০-২৫টি মাইক্রোবাস নিয়ে নূর হোসেন ও তার ২ শতাধিক সন্ত্রাসী সহকর্মী সশস্ত্র অবস্থায় আমাকে হত্যা করার জন্য জনসম্মুখে ১৫ থেকে ২০ রাউন্ড গুলি করলে মানুষ পালাতে থাকে। তখন সন্ত্রাসী দল এলোপাতাড়ি পিটিয়ে চৌধুরীপাড়া জামে মসজিদের মোয়াজ্জিমসহ ৫ জনের হাত ভেঙ্গে দেয়। ১০-১৫টি দোকান ভাংচুর করে চলে যায়। নূর হোসেনের উপস্থিতিতে এ তা-ব চলে প্রায় ১ ঘন্টা। আমি এসআই মোঃ শওকত এর উপস্থিতিতে কোন রকমে প্রাণে বেঁচে যাই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে উল্টো দোকান ভাংচুরের ঘটনার আমাকেসহ ১৭ জনের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রকাশ্যে অস্ত্রসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী মিজমিজি এলাকায় ঘুরাফেরা করছে আমাকে হত্যা করার জন্য। যে কারণে সেই ১৯৯৮ সালের মত চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছি। যে কোন সময় মৃত্যুর মুখে পড়ে যেতে পারি।’

জীবনের নিরাপত্তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাবরে আবেদন করেও শেষ রক্ষা হয়নি। আবেদনের দেড় মাসের মাথায় আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতেই খুন হতে হয় নজরুলসহ নিরপরাধ আরও ৬ জন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও