নারায়ণগঞ্জে কয়েকজন কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না : সেলিম ওসমান

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:২২ এএম, ১০ জুন ২০২১ বৃহস্পতিবার

নারায়ণগঞ্জে কয়েকজন কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না : সেলিম ওসমান

নারায়ণগঞ্জে নির্মিত ও নির্মাণাধীন তিনটি সড়ক স্থাপনার নামকরণ ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের তিন সদস্যের নামে করার পর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির সমালোচনার জবাব এসেছে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের কাছ থেকে। একই সঙ্গে ওই পরিবারের উত্তরসূরী এমপি সেলিম ওসমানও ওই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন।

ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ে তিনি এসব কথা বলেন। ৯ জুন বুধবার রাতে চেম্বার অব কমার্সের ভবনে ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, হোসিয়ারী অ্যাসোসিয়েশন, নিটিং অ্যাসোসিয়েশন এবং বিকেএমইএ’র সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে উপস্থিত ছিলেন সেলিম ওসমান।

মদনপুর-মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে বন্দর উপজেলায় নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুটির নামকরণ হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম নাসিম ওসমানের নামে। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত (মরণোত্তর) ভাষা সৈনিক এ কে এম সামসুজ্জোহার নামে নামকরণ হয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে চাষাড়া পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটি। আর এ কে এম সামসুজ্জোহা স্ত্রী ভাষা সৈনিক বেগম নাগিনা জোহার নামে নামকরণ হয়েছে খানপুর হয়ে হাজীগঞ্জ গোদনাইল হয়ে ইপিজেড পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়কটি।

৮ জুন আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তন প্রাঙ্গনে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের মাসিক কর্মসূচিতে রফিউর রাব্বী বলেন, ‘সরকারের কতিপয় মন্ত্রী এবং আমলারা টাকা খেয়ে এই নারায়ণগঞ্জের রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা বিভিন্ন জনের নামে তারা নামকরণ করছে। আমরা এ মন্ত্রী আমলাদের প্রশ্ন করতে চাই, যে দয়া করে আপনারা আমাদের জানান যাদের নামে নামকরণ করলেন তাদের এ নারায়ণগঞ্জে বা দেশে অবদানটা কি? লাশ ফেলা খুন-খারাবি এগুলো যোগ্যতার মধ্যে পরে কিনা এ বিষয়টুকু জানান? কারণ নারায়ণগঞ্জের মানুষ হিসেবে এ বিষয়টি জানার অধিকার আমাদের আছে। সরকার এ নামকরণ নিয়ে দেশে যে ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে বিশ্বে এমন নির্লজ্জ ঘটনা আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

এর একদিন পরেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে উঠে আসে রাব্বির ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা সামসুজ্জোহা নাগিনা ও নাসিম ওসমানের নামে নামকরণ নিয়ে কথা বলায় রফিউর রাব্বীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেন। কারণ দেশ ও নারায়ণগঞ্জের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা হচ্ছে।

পরে ব্রিফিংয়ে সেলিম ওসমান বলেন, কিছু কচুক্রি আজকে সরকারকে মন্ত্রীকে সচিবকে বলা হচ্ছে ঘুষের মাধ্যমে নাকি তারা নামকরণ করেছে। দেশকে অপমান করা হচ্ছে জাতিকে অপমান করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে কয়েকজন কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। করোনার মধ্যে আমরা পাঁচটি সংগঠন একসাথে বসেছি। সকলেই তিনঘণ্টা ধরে আমার কথা শুনেছেন। আমরা বিশ্বাস করি যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো বছরে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াবো। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রয়েছে। আমাদের প্রজন্ম দেশ স্বাধীন করেছে। একেকটা সমস্যার কারণে কাজ করা যাচ্ছে না। আমরা শান্তিরচর পেয়েছিলাম। কিন্তু যাতায়াতের কারণে সেটা আটকে রয়েছে। আজকে নারায়ণগঞ্জের যে যাতায়াত সুবিধা পেল লিংক রোড আদমজী রো ব্রীজ ব্যবসা আমাদের অনেকদূর চলে যাবে। যখন যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল হবে তখন ব্যবসা অনেকদূর এগিয়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জবাসী অনেক কিছু করেছি। কার নামে হচ্ছে এটা আমরা জানেন। আমার বাবা মা ভাইয়ের নামে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ বুঝতে পারছে কেন তাদের নামে হচ্ছে।

৮ জুন বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কুমুদীনীতে হাসপাতাল নির্মাণ নিয়ে সেখানকার শ্রমিকদের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শ্রমিকদের পক্ষে আন্দোলন করা শ্রমিক নেতা মাহাবুবুর রহমান ইসমাইলের সঙ্গে সেলিম ওসমানের বাদানুবাদ ঘটে।

৯ জুন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে ব্রিফিংয়ে সেলিম ওসমান বলেন, আজকে সামান্য এক শ্রমিকনেতা কাফনের কাপড় পড়ে নারায়ণগঞ্জের এক কোটি মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করছে। আমি আশা করবো নারায়ণগঞ্জের মানুষ সকলেই এই হসপিটালে চিকিৎসা করাতে হবে। তাদের চিকিৎসার কোনো সমস্যা হবে না। সকল পেশার মানুষকে এক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিহত করতে হবে। দুই একজন মানুষ যেন ঝামেলা করতে না পারে। আমাদের মধ্যে সবাই মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। রাজাকার আলবদর ছিল। কেন একজন কমিশনার তাদের আশ্বস্ত করলেন তোমরা জায়গা ছেড়ে যাবে না। তোমাদেরকে টাকা দেয়া হবে। তিনি কে? তিনি নারায়ণগঞ্জের মালিক? কোম্পানী তাদের শ্রমিকের সাথে কথা বলে আইনগতভাবে বিদায় করে দিয়েছে। সর্বশ্রেষ্ঠ হসপিটাল হবে নারায়ণঞ্জে। আমি সকলের সহযোগিতা চাই। কেউ আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।

সেলিম ওসমান বলেন, আমি সৌভাগ্যবান আমি নারায়ণগঞ্জের সংসদ সদস্য। সৌভাগ্যবান এই কারণে আমি কিছু বিদ্যালয় সৃষ্টি করতে পেরেছি। আমার লক্ষাধিক নাতি নাতনি রয়েছে। আমার একটি স্কুলে বাচ্চাদের বলেছিলাম আমার ছেলে নেই। আমাকে কেউ দাদু বলে ডাকবে না। আজকে লক্ষাধিক নাতি নাতনি। তারা আমাকে দাদু বলে ডাকে। তারা আমার বিপদে আপদে জন্মদিনে বলে দাদু তুমি কেমন আছ। আবার এমনও কেউ বলে আমি খাব কি? শ্রমিকের ছেলে মেয়েরা অনলাইনে পড়ালেখা করতে পারছে না। নারায়ণগঞ্জ কলেজে অনলাইনে পড়ালেখার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

এ ব্যবসায়ী নেতা আরো বলেন, টেক্সটাইল বিভাগের নির্বাচিত চারটি সংগঠন ইয়ান মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, হোসিয়ারী অ্যাসোসিয়েশন, নিটিং অ্যাসোসিয়েশন এবং বিকেএমইএ পাঁচটি সংগঠন টেক্সটাইল নিয়ে আলোচনা করেছি। নারায়ণগঞ্জের মানুষ জানে একসময় পাট এবং টেক্সটাইল এই দুই মিলে ছিল প্রাচ্যের ডান্ডি। আমাদের দাবিয়ে দেয়ার জন্য পৃথিবীর অষ্টম আশ্বর্চ আদমজীকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এখানে বিদেশীদের আনাগোনা ছিল। পাট এবং বস্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু আমাদের মনে হয় একটা অন্যায় ভাষা আন্দোলনের জন্য স্বাধীনতার জন্য যে কোনো আন্দোলনের জন্য ডাক দিলে মালিক শ্রমিক বেড়িয়ে পড়তাম। যে কোনো আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের মানুষ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু ইতিহাস থেকে আমাদেরকে মুছে দেয়ার চেষ্টা করেছে। একটি দল তাদের ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা আজ এখানে বসেছি আমরা যেন আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারি। আজকে আমরা ব্যবসা করতে পারি না। আমাদের ট্রাকস্ট্যান্ড নেই। আমরা লোড আনলোড করতে পারি না। আমাদের উপড় যত্রতত্র ভ্যাট ট্যাক্সের চাপ দেয়া হয়েছে। আমাদের অনেকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। বিসিকে ইন্ডাস্ট্রি জোন থাকলেও রাস্তাঘাটের উন্নয়ন নেই। আমাদের শিল্প পুলিশের ঘর নেই। প্রায় সময় থানায় ব্যবসায়ীদের গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা সহযোগিতা করে আসছি। করোনার সময় গত বছরে প্রণোদনা দিয়েছেন। কিন্তু আমরা কোনো প্রণোদনা পাই নাই। তারপরেও কোথাও শ্রমিক অসন্তোষ হয়নি আমরা স্ট্রং ছিলাম। শ্রমিকরা যেন কোনো অবস্থায় বিব্রতবোধ না করেন পরিবারের কাছে। কারণ কোনো শ্রমিক যদি না বাঁচে তাহলে ইন্ডাস্টি থাকবে না। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি রমজান মাসে তাদের বেতন বোনাস দিয়েছি। আমরাও খেঁটে খাওয়া মানুষ। আমরাও শ্রমিক। আমরা চাই টেক্সটাইল বাঁচিয়ে রাখতে। নারায়ণগঞ্জে করোনা পরিস্থিতি খারাপ ছিল। আমরা সেই জায়গা থেকে উঠে এসেছি। এখন আমাদের চিকিৎসার সমস্যা হবে না।

এসময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, বিএকেএমইর সহ সভাপতি এম এ হাতেম, মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল, ইয়ান মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন সাহা, বাংলাদেশ হোসিয়ারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল আলম সজল, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক শাহাদাত হেসেন ভূইয়া সাজনু ও এহসানুল হক নিপু সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও