ফতুল্লাবাসীকে কি দিলেন শামীম ওসমান!

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩০ পিএম, ১২ জুন ২০২১ শনিবার

ফতুল্লাবাসীকে কি দিলেন শামীম ওসমান!

নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে একাধিক সমস্যায় জর্জরিত। রয়েছে মৌসুমি জলাবদ্ধতা, বছর ব্যাপী প্রধান প্রধান সড়কে যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং নাগরিক সুবিধার সর্বনিন্ম দশা। প্রায়ই তার অনুসারীরা নাসিক মেয়র আইভীর কার্যক্রমের সমালোচনা করে চললেও তাদের নেতা শামীম ওসমান নিজ এলাকায় কি দিয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র।

বছর তিনেক পূর্বে ফতুল্লার বেশ কিছু রাস্তা আরসিসি ঢালাই দিয়ে মেরামত করা হয়। প্রতিটি সড়কের মুখে স্থাপন করা নামফলকে লেখা থাকে সাংসদ শামীম ওসমানের নাম। কিন্তু এসকল সড়কে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় তা বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকে প্রায়ই। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং সেবা প্রদানের নমুনা দেখে রীতিমতো হতাশ ফতুল্লাবাসী। বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। সরকারের মেয়াদ বাড়লেও দুর্ভোগ থেকে উত্তরণ মেলে না ফতুল্লাবাসীর। শামীম ওসমানের ঘোষিত সেই স্মার্ট সিটির দেখা আর কত বছর অপেক্ষা করলে পাওয়া যাবে তা এখন সমালোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাংসদ শামীম ওসমান শুধু নারায়ণগঞ্জ বা ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জের নেতা নন। তিনি একই সাথে আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের আলোচিত নেতাদের মধ্যে একজন। বিভিন্ন টকশো, সভা, সমাবেশ এবং আলোচনায় মেয়র আইভীর সমালোচনা করেছেন। নিজ এলাকার বাইরে এসে হকার নিয়ে মায়াকান্না দেখিয়েছেন। কিন্তু তার এলাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হওয়া বাসিন্দাদের কান্না কতটা অনুভব করেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। ইদানীং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মেয়রের সমালোচনা করলেও তার অনুসারীরা সরাসরিই সমালোচনা করেন মেয়র আইভীর। কিন্তু নিজ নেতার এলাকায় যেই করুন দশা তা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়না তাদের। সকল দোষ যেন সিটি করপোরেশনেই।

ফতুল্লার প্রবীন বাসিন্দা ও মুক্তিযোদ্ধা আবিদ হোসেন বলেন, ফতুল্লায় সমস্যার অন্ত নেই। অত্র থানার অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরী হয়। এছাড়া ফতুল্লার আশেপাশের প্রধান প্রধান সড়কে যানজট নিত্যদিনের সঙ্গী। ফতুল্লার পুলিশ লাইন্স, বিসিক, পঞ্চবটি, পোস্ট অফিস, পাগলা, আলীগঞ্জ, কাঠেরপুল, শিবু মার্কেটের সড়কগুলো সপ্তাহের ৭ দিনেই যানজটে পরিপূর্ন থাকে। এই এলাকার মানুষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনও অনিশ্চিত ভাবে চলছে। এনজিওর মাধ্যমে বর্জ্য ১ দিন সংগ্রহ করলে ৩ দিন বন্ধ থাকে। মানুষ বাড়ির আশেপাশে খোলা স্থানে ফেলে দিতে বাধ্য হয়।

তিনি আরও বলেন, নাগরিক সুবিধাতেও ভয়াবহ রকম ত্রুটি। প্রধান প্রধান সড়কে নেই আলোর ব্যবস্থা। দোকান কিংবা বাসাবাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখা লাইট একমাত্র আলোর উৎস। এছাড়া পাড়া মহল্লায় কিশোর গ্যাং এর উৎপাত তো আছেই। কোন না কোন ভাবে এদেরকেও দেখা যায় সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারী নেতাদের মিছিলে অংশ নিতে। সেই ছবি প্রকাশ করে এলাকাগুলোতে দাপিয়ে বেড়ায় উঠতি গ্যাং সদস্যরা। ক্রমাগত এমন পরিস্থিতির মুখে পরে অনেক ভদ্র পরিবার ফতুল্লা ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

ফতুল্লায় এই ধরনের সমস্যা নতুন কিছু নয়। বিএনপির শাসনামলে যখন গিয়াসউদ্দিন এমপি ছিলেন তখন ফতুল্লা ছিলো অবহেলিত। গিয়াসউদ্দিনের বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জে হওয়ায় সকল উন্নয়ন কেবল সিদ্ধিরগঞ্জবাসীই পেয়েছেন। আর ফতুল্লা ছিল অবহেলিত এক জনপদ। প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে নাকাল হলেও জনপ্রতিনিধিরা মুখ ফিরিয়ে তাকান না বাসিন্দাদের দিকে। নির্বাচনের ভোটে সেই ফতুল্লার বাসিন্দারা কবরী, শামীম ওসমানকে নির্বাচিত করলেও আশু উত্তরন ঘটেনি। কেবল গালভরা উন্নয়ন বুলি আর পত্রিকার পাতায় অমুক অমুক উন্নয়নের বরাদ্দের খবর পড়েছে। ২০ বছর পূর্বের দুর্ভোগ থেকে গেছে স্ব স্ব স্থানে।

ফতুল্লার এমন বেহাল দশা থেকে উত্তরনের জন্য ফতুল্লা, এনায়েতনগর, কুতুবপুরের বাসিন্দারা দাবী তুলেছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভেতর নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে। কিন্তু তখন একদল ব্যক্তি এর বিরোধীতা শুরু করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এর বিরুদ্ধে চিঠি প্রদান করেন। কারল হিসেবে উল্লেখ করেন সিটির ট্যাক্স দেয়ার মত সাধ্য এই এলাকার বাসিন্দাদের নেই। অথচ বাস্তবে পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। হাস্যকর এসব কারন তোলার পেছনে সাংসদ শামীম ওসমানের অনুসারীদের হাত রয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিনিয়ত উন্নয়নের গল্প শোনানো এবং স্মার্ট সিটির স্বপ্ন বাহক শামীম ওসমান তার নিজ এলাকা ফতুল্লায় কি দিয়েছেন তার একটি হিসাব বের করে আনা দরকার। যেখানে তার অনুগামীরা প্রতিনিয়ত মেয়র আইভীর সমালোচনা করে যাচ্ছেন সেখানে তাদের নেতা নিজ এলাকার বাসিন্দাদের কতটা দুর্ভোগমুক্ত রাখতে পেরেছেন তা উঠে আসা প্রয়োজন। আর এতেই প্রমান হবে গত ২০ বছরে কতটা উন্নয়ন সুবিধা ভোগ করেছে ফতুল্লাবাসী।

নারায়ণগঞ্জে জলাবদ্ধতা এবং ফতুল্লার নাম একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। সামান্য বৃষ্টিতে জেলার অন্য কোথাও জলাবদ্ধতা না হলেও ফতুল্লায় নিশ্চিন্তে জলাবদ্ধতা তৈরী হয়েছে তা চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারেন বাসিন্দারা। কোথায় হাটু পানি আর কোথায় গোড়ালি পানি জমেছে তাও মুখস্থ সকলের। রিক্সাওয়ালারাও যাত্রীদের গন্তব্যের নাম শুনে দাম হাঁকান ইচ্ছেমত। মাসের শুরু থেকেই জলাবদ্ধতা বাড়তে থাকে। অত্র ফতুল্লার মাসদাইর, বিসিক, ইসদাইর, উত্তর ইসদাইর, আল আমিন নগর, পৌষারপুকুর পাড়, লালপুর, দাপা ইদ্রাকপুর, ফতুল্লা স্টেশন রোড, হাজী বাড়ি রোড, উকিলবাড়ি, লালখা, শিয়াচর, সস্তাপুর, রামারবাগ, কাঠেরপুল এলাকার বাসিন্দারা পানিতে বন্দি হয়ে আছেন। কোথাও হাটু পানি আবার কোথাও গোড়ালি সমান পানি। এমন পরিস্থিতিতে পানি মাড়িয়ে প্রতিদিন লাখো শ্রমজীবী মানুষ নিজ কর্মস্থলে আসা যাওয়া করেন। গত কয়েক বছর ধরে এমন ভোগান্তি অব্যহত থাকলেও সমাধান করতে পারেননি সাংসদ শামীম ওসমান। প্রতিবারই ডিএনডি প্রজেক্টের উপর দায় চাপিয়ে দিলেও একাধিকবার খরচ বাড়িয়েও এর কাজ সমাপ্ত হয়নি। আদৌও এই সমস্যা সমাধান সম্ভব কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও