আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আমের গুদাম

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৪৩ পিএম, ১২ জুন ২০২১ শনিবার

আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আমের গুদাম

‘সরকার পরিচালনায় বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। আর সেই আওয়ামীলীগের কার্যালয় নাকি মৌসুমি আমের গোডাউন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয়ে এখন মজুদ করে রাখা হয়েছে মৌসুমি আম দিয়ে।’

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে আম রাখার ভিডিও ভাইরাল হয়ে উঠে। কয়েকজন তরুণের করা ভিডিওতে দেখা যায়, ‘বাইরে থেকে বড় করে সাইনবোর্ড লেখা আছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ আর নিচে ছোট করে বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয়। কিন্তু ভেতরে আম ব্যবসায়ী সারিবদ্ধ াবে আম সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তার উপরে টানানো আছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি। কিন্তু নিচে নেই চেয়ার টেবিল কিংবা অন্য কোন কিছু। ওইসময় কয়েকজন তরুন যুবক গিয়ে ভিডিও করেন এবং আমগুলো বের করতে বলেন। কিন্তু ব্যবসায়ী আম বের করতে অনিহা প্রকাশ করেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করার পরপরই বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিটিং মিছিল, সমাবেশ, কমিটির সভা ইত্যাদি হয়ে আসছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে এ কার্যালয়টি পরিত্যক্ত হিসেবে রয়েছে। সেখানে বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামলীগের সভাপতি শহীদুল্লাহ নিজেও যান না। ৩ থেকে ৪ বছর আগেও স্থানীয় যুবকেরা সেখানে বসে আড্ডা দেওয়া ও লুডু সহ অন্যান ঘরোয়া খেলাধুলা করলেও পরবর্তীতে স্থানীয় নেতারা সেটা বন্ধ করে দেন। তারপর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে।’

স্থানীয়রা বলেন, ‘আওয়ামীলীগের কার্যালয় হলেও ৩ থেকে ৪ বছর ধরে এটি বন্ধ পরে আছে। আওয়ামীলীগ বা তার সহযোগি সংগঠনের কোন নেতাকর্মী আসতে দেখা যায় না। দীর্ঘদিন কার্যালয় তালাবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি সপ্তাহ দুয়েক আগে একজন আওয়ামীলীগ নেতার আত্মীয় আম রাখতে শুরু করেছে। এখানে আমরা রেখে ব্যবসা করে আসছে। আর কার্যালয়ের ভেতরে যত টেবিল চেয়ার ছিল ভাঙাগুলো বাইরে ফেলে দিয়েছে। আর ভালোগুলো কে যেন নিয়ে গেছে।’

ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘আওয়ামীলীগ কার্যালয় তাই কি হয় কে কি করে সে বিষয়ে আমরা কখনো খোঁজ নিতে যাই না। কারণ আমি রাজনীতি করি না। তাই দূরে থাকি। যে আম রেখেছে তাকে চিনি না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামীলীগের তৃণমূল পর্যায়ে এক নেতা বলেন, ‘বন্দরে এখন আওয়ামীলীগ নেই। যা আছে সবাই এখনও এমপি সেলিম ওসমানের পার্টি। এমপি সাহেব যা বলে তাই করে। এমপি সাহেব জাতীয় পার্টির তাই সবাই জাতীয় পার্টি। যদি জাতীয় পার্টি না হয়ে অন্য পার্টি হতো সবাই সেটাই হয়ে যেতো। কারণ আওয়ামীলীগের নেতা হলেও এমপি যা বলে সবাই তাই নিয়ে দৌড়ায়। গত ১০ বছরে এ কার্যালয়ে আওয়ামীলীগের একটি কর্মসূচিও করতে দেখিনি। কিন্তু এমপি সাহেব যা বলবে তাতেই দৌড় দেয় সবাই।’

তিনি বলেন, ‘বন্দরে আওয়ামীলীগের যেসব নেতারা আছে রশিদ সাহেব (বন্দর আওয়ামী লীগের সভাপতি) থেকে শুরু করে সবাই এমপি সাহেবের লোক। তারা শুধু নামে আওয়ামীলীগ। না হলে নির্বাচন ছাড়া বন্দরে কোন আওয়ামীলীগের বড় কর্মসূচি আছে। কেউ একটা নিজের উদ্যোগে আওয়ামীলীগের কর্মকা- করে। সবাই শুধু এমপি সাহেবের পেছনে দৌড়ায়।’

বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি মো. শহিদুল্লাহর মোবাইলে যোগাযোগ করে বন্ধ পাওয়া যায়।

শহিদুল্লাহর ছেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাবা অসুস্থ। করোনা সহ বয়স হওয়ায় আমরা এখন বাইরে যেতে দেই না। তাছাড়া অসুস্থতার জন্য এখনও ঠিকভাবে কথা বলতেও পারেন না।’

বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ কার্যালয় ‘আমের গোডাউন’ বিষয়টি জানেন? জবাবে তিনি বলেন,‘বৃহস্পতিবার ভিডিওটি ভাইরাল হলেও আজকে বিকেলেই আমি ফেসবুকে দেখতে পাই। স্থানীয় এক ছাত্রলীগের কর্মী ভিডিওটি প্রকাশ করেছে। বিষয়টি জানার পরই আমি সেখানে গিয়ে খোঁজ খবর নিতে যেতাম কিন্তু বৃষ্টির কারণে সম্ভব হয়নি। তবে শনিবার আমি সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নিবো।’

কে আম রেখেছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বাবার বয়স ৭৫ এর বেশি। তিনি আগের মতো রাজনীতিতে সক্রিয় না। ফলে কার্যালয়ে যাওয়া আশা নেই। কে বা কারা আম রেখেছে সেটা বলতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বাবা ২০০৪ সালে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি হওয়ার পর কার্যালয়টি সক্রিয় ছিল। এখানে চেয়ার টেবিল, টিভি সহ অনেক কিছু আমার বাবার টাকায় কেনা। তাছাড়া অনেক কিছু অন্যান্য নেতাকর্মীরাও দিয়েছে। কিন্তু বাবা বয়স হওয়ায় রাজনীতিতে আগের মতো সক্রিয় না থাকায় কারা এখন কার্যালয় পরিচালনা করছেন সেটা বলতে পারছি না।’

আওয়ামীলীগ কার্যালয় আমের গোডাউন হওয়ার কারণ কি? জবাবে তিনি বলেন, ‘আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ঝিমিয়ে পড়েছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সম্মেলন হচ্ছে না। ফলে আওয়ামীলীগের কোন কর্মসূচিও পালন করছে না। প্রবীণদের পরবর্তী নতুনদের সুযোগ দিলে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠবে। এ বিষয়ে সিনিয়র নেতাকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে।’

বন্দর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী মো. কবির হোসেন পনির প্রথমে অস্বীকার করেন তাদের নিজেদের কোন কার্যালয় নেই। এমনকি তাদের কার্যালয় কোথায় আছে সেটাও ঠিকানা ওনাকে দিতে হয়। পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন একটি কার্যালয় আছে।

তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় হওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় যুবলীগের নেতারা সেটা দেখাশোনা করেন। তবে সেটা আমের গোডাউন হয়েছে আমি জানি না। শনিবার সকালে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও