বিএনপিতে হঠাৎ করেই টাকা বিলানো নেতাদের আবির্ভাব ঘটে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:৩৬ এএম, ১৮ জুলাই ২০২১ রবিবার

বিএনপিতে হঠাৎ করেই টাকা বিলানো নেতাদের আবির্ভাব ঘটে

নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপিতে টাকা খরচ করতে পারে এমন নেতাদের কদর কমে না। যতদিন তারা টাকা খরচ করতে পারে ততদিন মূল্যায়িত হয়। আর কর্মীরাও দল বেধে ছুটে চলেন ওইসব নেতাদের পেছনে। গত কয়েক দশকে নারায়ণগঞ্জ এমনভাবে নিয়স্ত্রন করেছেন বেশ কয়েকজন নেতা। কিছুদিন পর পর এসব নেতার আবির্ভাব ঘটে।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আলোচিত হয়ে উঠেন রোকনউদ্দিন মোল্লা। বাড়ি আড়াইহাজারে। তিনি ছিলেন বিএনপির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক। নারায়ণগঞ্জের নেতারা নিয়মিত ছিলেন তার এখানে যাতায়াত। কিন্তু তিনি জনপ্রতিনিধি হতে পারেনি।

ওই সময়েই নারায়ণগঞ্জের বিএনপির একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে নেন শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী। নারায়ণগঞ্জে একের পর এক নেতার উত্থান ঘটতে থাকে তার হাত ধরে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনেও তিনি ছিলেন এমপি। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাত্র ১৭ দিনে আগে গিয়াসউদ্দিনকে বিএনপিতে জয়েন করিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করে আলোচনার চূড়ায় উঠেন মোহাম্মদ আলী। বনে যান কিং মেকার। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই এর নির্বাচনেও কুশীলব হিসেবে কাজ করেন তিনি। দুই হাতে টাকা খরচ করতে থাকেন তিনি।
জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৬ জুন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচনে ওসমান পরিবারের সদস্য সেলিম ওসমানের পক্ষে সরাসরি মাঠে নামেন মোহাম্মদ আলী এবং বিএনপির ভোটারদের ও নেতাকর্মীদেরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামীলীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে বিএনপির এই সাবেক সাংসদ কাজ করে গেছেন। একই সাথে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন সেলিম ওসমান। ওই নির্বাচনেও অনেক পর্দার আড়ালের কাজটি করেন মোহাম্মদ আলী। বিএনপির নেতাকর্মীরাও তখন তাঁর এখানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করে। বিনিময়ে নেতারা কামিয়ে নেন অঢেল টাকা। কিন্তু এখন সেই ধারা থেকে সরে এসেছেন তিনি। সম্প্রতি ছিলেন অসুস্থ। এখন আর বিএনপির লোকজন তার এখানে খুব একটা যান না। মোহাম্মদ আলীর হাত ধরে এসেছিলেন শিল্পপতি সফর আলী ভূইয়া। কিন্তু তিনি নিজেও বেশীদিন টিকতে পারেনি।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ওসমান পরিবারের দুই সদস্য যথাক্রমে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের পক্ষে মাঠে নামেন মোহাম্মদ আলী। অনেকটা আড়ালে থেকেই ওসমান পরিবারের এই দুই সংসদকে জয়ী করার পক্ষে কাজ করেন তিনি। কখনও কখনও প্রত্যক্ষভাবেও কাজ করেছেন। ফলশ্রুতিতে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে জয়ী হয় তাদের।
২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নির্বাচন করতে এসেছিলেন শিল্পপতি জামালউদ্দিন। কিন্তু বিএনপি তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে শুরুতে তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচুর টাকা খরচ করেন।
২০০৮ নির্বাচনে আরেক ডিম পাড়া হাসের জন্ম হয় বিএনপিতে। যদিও এর আগে ২০০৭ সালের ওয়ান এলেভেনের পর থেকে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসার চেষ্টা করেন ফতুল্লার জনপ্রিয় জালালউদ্দিন আহম্মেদ এর ছেলে শাহআলম। ওই বছরের তৃতীয় ধারার কিছু রাজনৈতিক দল গঠন হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন শাহআলম। তিনি তখন নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে একটি ইফতার মাহফিলে মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিমকে অতিথি করেন। এ অনুষ্ঠানে অতিথিরা দেশের দুই দলের দুই নেত্রীর তীব্র ভর্ৎসনা করেন। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে একটি মিলনায়তনে কিংস পার্টি খ্যাত কল্যাণ পার্টির প্রকাশ ঘটে। এ অনুষ্ঠানে লোকজন নিয়ে শাহআলম উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দিয়ে কল্যাণ পার্টির জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেন। কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম সেদিন তার বক্তব্যে শাহআলমের উপর দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রদান করেন। শুরু হয় শাহ আলমের রাজনীতি। তখন শাহআলম মোটা অঙ্কের টাকা কল্যাণ পার্টিকে অনুদান দেন।

কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে বিএনপির মনোনয়ন পান শাহআলম। এ নির্বাচন নিয়েও অনেক নাটকীয়তা হয়। নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গে পরাজিত হয়। এর পরেই বিএনপিতে টাকা খরচ শুরু করেন শাহআলম। নেতাকর্মীদের ভিড় করান নিজ গ্রুপে। দুই হাতে টাকা খরচ করতে থাকেন। জেলা বিএনপির কমিটি, ফতুল্লা থানা কমিটি নিজ কব্জায় রাখেন। যাকে খুশী দলে যুক্ত করেন দিয়ে দিতেন বড় পড়। এক সময়ে তার অনুগামীরা দাবী করতো গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ের মাসের একটি বড় অংশের টাকার যোগান দেন শাহআলম। এখন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় নাই। কিন্তু নিয়ন্ত্রন নিজের হাতেই রেখেছেন।
একই সময়ে আবির্ভাব ঘটে নজরুল ইসলাম আজাদের। আড়াইহাজারের এ নেতা শুরু থেকে রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে বসে নেতাকর্মীদের নিয়স্ত্রন শুরু করেন। খালেদা জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে ছড়ি ঘুরাতে থাকেন। বিগত বিএনপির সেক্রেটারী মামুন মাহমুদকে শুরুতেই কিনে দেন ২৫ লাখ টাকা দামের গাড়ি। নেতাকর্মীদের মাস শেষে টাকা বিলাতে শুরু করেন। এখন কিছুটা গুটিয়ে নিলেও রাজনীতিতে পর্দার আড়ালে রয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি আরেক নেতার আবির্ভাব ঘটেছে। নাম নাসিরউদ্দিন। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক। সবশেষ তিনি আলোচনায় এসেছেন রূপগঞ্জে একটি মারামারির ঘটনায়। নিজ দলের লোকজনদের হাতেই তিনি পিটুনীর শিকার হয়েছেন।

জানা গেছে, গত ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হয় তারাবো পৌরসভার নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নাসির উদ্দিন ও আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমানের হাবিবের মনোনায়ন মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তবে এই বাতিলের পিছনে নাসির উদ্দিন ও হাবিবুর রহমান হাবিবের নাটক হিসেবে উল্লেখ করেন তারাবো পৌরসভাবাসী। তারা দুইজন ইচ্ছা করেই সমঝোতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী হাসিনা গাজীকে সুযোগ করে দিয়েছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলাপ আলোচনা সরগরম রয়েছে।

মনোনয়ত পত্র যাচাই-বাচাই শেষে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নাসির উদ্দিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুবর রহমান হাবিবের প্রস্তাবকারী একই ব্যক্তি হওয়ায় তাদের প্রার্থীতা বাতিল করা হয়। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কারণ হিসেবে রিটার্নিং অফিসার মতিয়ুর রহমান জানান, কোন ভোটার প্রস্তাবকারী হিসেবে অথবা সমর্থনকারী হিসেবে মেয়র অথবা সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর বা সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট পদে একটির অধিক মনোনয়নপত্রে তার নাম ব্যবহার করলে ওই মনোনয়নপত্রটি বাতিল বলে গন্য হবে। সেই হিসেবে নাসির উদ্দিন ও হাবিবুর রহমান হাবিবের প্রস্তাবকারী একই ব্যক্তি হওয়ায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

কিন্তু বাতিল হওয়া এই দুইজনের মনোনয়নের প্রস্তাবকারী একই ব্যক্তি হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নাসিরউদ্দিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুবর রহমান হাবিব ইচ্ছা করেই একই ব্যক্তিকে দুইজনের প্রস্তাবকারী রেখেছেন। সাধারণত প্রস্তাবকারীর নাম গোপন থাকে। কিন্তু নাসির উদ্দিনের প্রস্তাবকারী ব্যক্তির নাম প্রকাশ হলো কিভাবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এছাড়াও নাসির উদ্দিন তার ঘনিষ্ট কাউকে প্রস্তাবকারী বানাতে পারতেন। কিন্তু হাবিবুর রহমানের হাবিবের প্রস্তাবকারী ব্যক্তিকে কেন নাসিরের প্রস্তাবকারী বানাতে হবে।

এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে সকলেরই জানা, স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিব নিজেই আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী হাসিনা গাজীর মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। সেই সাথে তিনি তারাবো ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি পদে দায়িত্বও পালন করেছিলেন। তাকে প্রায় সবসময় নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীর সাথে দেখা যায়। পাশাপাশি হাসিনা গাজীর মনোনয়ন ফরম জমা দেয়ার দিনেও উপস্থিত ছিলেন হাবিব।

আর সেই হাবিবুর রহমান হাবিবের প্রস্তাবকারী ব্যক্তিকেই বিএনপির প্রার্থী নাসির উদ্দিনের পক্ষে প্রস্তাবকারী করা হয়েছে। সেই সাথে ওইদিন নাসির উদ্দিন নমিনেশনও আনতে যায় নাই। আর এসকল বিষয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন নাসির উদ্দিন ইচ্ছা করেই আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী হাসিনা গাজীকে সুযোগ করে দিয়েছেন। আর এই সুযোগ করে দিতে গিয়ে নাসির উদ্দিন আর হাবিবুর রহমান হাবিব মনোনয়নপত্র নিয়ে নাটক সাজিয়েছেন।

নাসির উদ্দিনের ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানা যুবদলের আহবায়ক দেলোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, নাসিরউদ্দিন স্থানীয় আওয়ামীলীগের সাথে আঁতাত করে দলকে সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গত তারাব পৌর নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়েও আওয়ামীলীগের প্রস্তাবকারী রেখে মনোনয়ন বাতিলের মাধ্যমে বিনা ভোটে আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে নির্বাচিত হতে সুযোগ তৈরী করে দেন নাসির। বিএনপির অনুষ্ঠান বানচালের উদ্দেশ্য সে পরিকল্পিতভাবে এই ন্যাক্কারজনক সংঘাত করিয়েছেন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও