পোড় খাওয়া অগ্নিকন্যা নেই ৫ বছর

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০৯ পিএম, ১৯ আগস্ট ২০২১ বৃহস্পতিবার

পোড় খাওয়া অগ্নিকন্যা নেই ৫ বছর

নারায়ণগঞ্জের অগ্নিকন্যা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন নাজমা রহমান। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি। ২০ আগস্ট তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের এই দিনে তিনি আমেরিকার আরিজোনায় ইন্তেকাল করেন।

১৯৬৮ সালে শহরের মর্গ্যান উচ্চবালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৭২ সালে একই কলেজ থেকে বিএ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন নাজমা রহমান। স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যোগ দেন। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মে জড়িত হন। দেশ স্বাধীনের পর নারায়ণগঞ্জে ‘শাপলা’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা হলে তিনি এর সঙ্গে যুক্ত হন।

রাজনীতির হাতেখড়ি পান স্বামী বিশিষ্ট সাংবাদিক মুজিবুর রহমান বাদলের কাছ থেকে। ১৯৬৭ সালে দু’জনের বিয়ে হয় । ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনকালীন ন্যাপের (মোজাফফর) কর্মী হিসেবে ছিলেন সক্রিয়। মুক্তি সংগ্রাম ও স্বাধীনতার আন্দোলনে তার নিত্যদিনের কর্মকান্ড ছিল লক্ষনীয় ।

মুজিবুর রহমান বাদল সত্তর দশকের মধ্যভাগে দৈনিক সংবাদের চিফ রিপোর্টার ছিলেন। আশির দশকের শেষদিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সকাল বার্তা’র সম্পাদক ছিলেন তিনি ।নাজমা রহমান সত্তর দশকে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। ইত্তেফাক ভবনের ‘সাপ্তাহিক পূর্বাণী’ পত্রিকায় তিনি সাংবাদিকা শুরু করেন। সকাল বার্তায়ও সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলেন।

নাজমা রহমান ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগে যোগদানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। পৌর নির্বাচনের পর আলী আহমেদ চুনকাসহ নেতাদের ও দলীয় সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে নাজমা রহমানকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে কমিশনার নির্বাচিত করা হয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদে দেশব্যাপী যে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির দানা বাঁধে এর প্রতিরোধে নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড শুরু হয়।

এসব কর্মকান্ডের অগ্রভাগে যারা ছিলেন নাজমা রহমান তাদের অন্যতম। প্রতিটি সভা-সমাবেশে জ্বালাময়ী ভাষণে সংগ্রামের পথকে শক্তিশালী করেন। ১৯৮২ সালে স্বৈরাচার এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দলের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন নিত্যদিন মাঠের একজন সক্রিয় নেতা।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনে দলীয়ভাবে নাজমা রহমানকে সদর-বন্দর আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম ওসমান ও তার ভাই জাতীয় পার্টির মনোনীত নাসিম ওসমানের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে শামীম ওসমানের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় নাজমা রহমানের। শহরের উত্তর-দক্ষিণের রাজনীতি নাজমা রহমানের মাধ্যমে জিইয়ে থাকে অনেক দিন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও তাকে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্বাচনেও তিনি পরাজিত হন।

১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তার আগে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কেন্দ্রের রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, নাজমা রহমান ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেই তিনি বীরের মূর্তি ধারন করে রাজপথের লড়াইকে জীবনসঙ্গী করে নেন। জিয়ার আমলে অসংখ্য নির্যাতন সহ্য করেন এই নেত্রী। দমেননি কখনো। এরশাদ আমলে এমন কোন জুলুম নেই যা তিনি সহ্য করেননি। শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয় ঢাকার রাজপথেও ছিলেন সন্মুখ সমরে। এরশাদ সরকারের পুলিশ কাঁদানি গ্যাস মারে তাঁকে লক্ষ্য করে। একটি সেল এসে তাঁর মাথার উপর আঘাত করে। সেই আঘাত তাঁর জীবন প্রদীপকে আস্তে আস্তে ধ্বংস করতে থাকে। এরই মধ্যে তিনি আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে জাতীয় নেতার সন্মান অর্জন করেন। ২০০৪ সালে জাতির পিতার কন্যাকে হত্যা করার জন্য তারেক, বাবর, খালেদা জিয়ার পিশাচরা যে গ্রেনেড হামলা করে, সেই হামলায় তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় একুশটি স্প্রিন্টার। সেই আঘাত হতে তিনি আর আরোগ্য লাভ করতে পারেননি। তিলে তিলে সেই আঘাতের পাশবিকতা আর আমাদের অবহেলায় তিনি আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি কখনো। ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট তিনি আমেরিকাতে মারা যান।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও